জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৯তম প্রয়াণবার্ষিকীতে স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ধূমকেতু’ হল ধুলো, বরফ ও গ্যাসের তৈরি এক ধরনের মহাজাগতিক বস্তু, যা উজ্জ্বল ‘আগুনের ঝ্যাঁটা’র মতো প্রবল গতিতে আছড়ে পড়ে, চিহ্ন রেখে যায় ধরাভূমে। নজরুলের ধূমকেতু-র সঙ্গে এর যেন খুব মিল। নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’র আয়ুস্কাল ছিল মাত্র পাঁচমাস মাস ষোল দিন। প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১১ আগস্ট, ২৪ শ্রাবণ ১৩২৯; শেষ সংখ্যা ২৭ জানুয়ারি ১৯২৩, ১৩ মাঘ ১৩২৯।
‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু,/আঁধারে বাঁধ্ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা/ রাতের ভালে হোক্ না লেখা,
জাগিয়ে দেরে চমক্ মেরে,/আছে যারা অর্ধচেতন!’
রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখার হুবহু প্রতিলিপি হিসেবে এই আশীর্বাণী প্রকাশিত হতো ‘ধূমকেতু’তে,- যা ষষ্ঠ সংখ্যা পর্যন্ত প্রথম পৃষ্ঠায় এবং সপ্তম সংখ্যা থেকে তৃতীয় পৃষ্ঠায় ছাপা হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিপ্লবী বারীন ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পরীসুন্দরী ঘোষ, বীরজাসুন্দরী সেনগুপ্ত, কবি শেখর কালিদাস রায়, শরৎচন্দ্র পন্ডিত, সরোজিনী নায়ডুর মতো মানুষেরদের আশীর্বাণী নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘ধূমকেতু’র পথ চলা।
‘ধূমকেতু’ ছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম আরও অনেক পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু অন্য কোনো পত্রিকা ‘ধূমকেতু’র মতো এতোটা সাড়া জাগাতে পারেনি। স্বল্পায়ু হলেও অখ- বাংলা তো বটেই, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ‘ধূমকেতু’। এমনকি এই পত্রিকার জন্য নজরুলকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল-এতে প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা এবং এগারো বছরের বালিকা লীলা মৈত্র’র লেখা ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ প্রবন্ধ প্রকাশের জন্যে। লীলা মৈত্র নজরুলের ঘনিষ্টজন অধ্যাপক সাতকড়ি মিত্রের ছোট বোন। লেখা দু’টি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বরের ‘ধুমকেতু’ সংখ্যায়। তখন নজরুলের বয়স মাত্র তেইশ বছর। রাজদ্রোহের অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধির ‘১২৪ এ’ ধারা অনুসারে কবিকে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। পুলিশ তাঁকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে নভেম্বর কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে এবং একই দিনে তাঁর ‘যুগবাণী’ প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়। ‘ধুমকেতু’তে কি এমন ছিল যে, ব্রিটিশ শাসকরা এতো ক্ষেপে গিয়েছিল!
প্রথম সংখ্যাতে ‘সারথির পথের খবর’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তে নজরুল ঘোষণা করেন ‘ধূমকেতু’র লক্ষ্য ও পথ: ‘মাভৈ: বাণীর ভরসা নিয়ে’ ‘জয় প্রলংকর’ বলে ‘ধূমকেতু’-কে রথ করে আমার আজ নতুন পথে যাত্রা শুরু হল। আমার কর্ণধার আমি। আমায় পথ দেখাবে আমার সত্য। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি-নমস্কার করছি আমার সত্যকে।’
‘এ দেশের নাড়ীতে অস্থিমজ্জায় যে পচন ধরেছে তাতে এর একেবারে ধ্বংস না হলে নতুন জাত গড়ে উঠবে না—-দেশের যারা শত্রু, দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি, মেকি তা সব দূর করতে ধূমকেতু হবে আগুনের সম্মার্জনী।’
‘ধূমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মানুষ ধর্মই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। হিন্দু মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।’ একই সঙ্গে এই সংখ্যাতেই নজরুল লিখেছিলেন তাঁর ‘ধূমকেতু’ শিরোনামের অগ্নিগর্ভ কবিতাটিঃ
আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহা বিপ্লব হেতু, এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।
আমি জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি সৃষ্টির ঐ চাতুরি, তাই বিধি ও নিয়ন্তে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি। আমি জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা হয়নি হবে তাও। তাই বিপ্লব আনি, বিদ্রোহ, করি।
পত্রিকাটির মোট ৩২টি সংখ্যা বের হয়েছিল। প্রথম সংখ্যা ছিল ১৬ পৃষ্ঠার। প্রতি সংখ্যার দাম ছিল ১ আনা। বার্ষিক গ্রাহক চাঁদা ৫ টাকা। পত্রিকার সম্পাদক, সারথি ও স্বত্বাধিকারী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম থেকে সপ্তম সংখ্যা পর্যন্ত সম্পাদক হিসেবে, অষ্টম সংখ্যা থেকে সারথি হিসেবে এবং ছাব্বিশ সংখ্যা থেকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নজরুলের নাম মুদ্রিত হয়। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটি সপ্তাহে দু’বার বের হতো, পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় উপরে লেখা থাকতো-‘সপ্তাহে দুইবার করিয়া বাহির হইবে’। সাধারণত শুক্রবার এবং মঙ্গলবারে প্রকাশিত হতো, তবে দুয়েকটি সংখ্যা শনিবারেও বের হয়েছিল।
দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় তখন একটা নিরুত্তাপ ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা যে ঠিকই ছিল, তা বোঝা গেল ‘ধূমকেতু’ প্রকাশিত হবার পর। ‘ধূমকেতু’র মধ্যে তারা দেখতে পেলেন জমিয়ে রাখা বিক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ, যা এতোদিন তাদের মধ্যে দমিত ছিল। এজন্য প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে ‘ধূমকেতু’কে তারা নিজেদের হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। গ্রহণের ধরণ কতোটা প্রবল ছিল, এর একটা রূপ দেখতে পাওয়া যায় নীচে উল্লেখিত পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় এবং অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত’র বয়ান থেকে। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় বলেনঃ
‘বিক্রিত সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলে, কাগজ বেরোবার আগেই হকার আগাম দাদন দিয়ে চলে যায়। কাগজ বেরোবার ক্ষণটুকু মোড়ে মোড়ে তরুণের দল জটলা করে, দাঁড়িয়ে থাকে- হকার কতক্ষণে নিয়ে আসে ‘ধূমকেতু’র বা-িল। তারপর হুড়োহুড়ি, কাড়াকাড়িতে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা নিঃশেষ হয়ে যায়। এক কপি কাগজ নিয়ে চায়ের দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা গরম বক্তৃতা চলে। জাতির অচলায়তন মনকে অহর্নিষি এমন করে ধাক্কা মেরে চলে ধূমকেতু যে রাজশক্তি প্রমাদ গোনে।’
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেনঃ
‘—আমিও ফার্স্টইয়ারের ছাত্র। সপ্তাহান্তে বিকেল বেলা আরো অনেকের সঙ্গে জগুবাবুর বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি, হকার কতক্ষণে ‘ধূমকেতু’র বান্ডিল নিয়ে আসে। হুড়োহুড়ি কাড়াকাড়ি পড়ে যায় কাগজের জন্যে। কালির বদলে রক্তে ডুবিয়ে ডুবিয়ে লেখা সেই-সব সম্পাদকীয় প্রবন্ধ। শুনেছি স্বদেশী যুগের ‘সন্ধ্যা’-তে ব্রহ্মবান্ধব এমনি ভাষাতেই লিখতেন। সে কী কশা, কী দাহ। একবার পড়ে বা শুধু একজনকে পড়িয়ে শান্ত করবার মত সে লেখা নয়। যেমন গদ্য তেমনি কবিতা। সব ভাঙার গান, প্রলয়-বিলয়ের মঙ্গলাচরণ।’
‘ধূমকেতু’তে প্রকাশিত লেখাসমূহে, এর সম্পাদকীয়তে, বিশেষতঃ নজরুলের কবিতায় যেন আগুন ঝরতো। ব্রিটিশ শাসন শোষণে নিপীড়িত মানুষ এর মধ্য দিয়ে যেমন তাদের মনের কথার যথার্থ প্রতিফলন দেখতে পেতো, পাশাপাশি মুক্তির নিঃশ্বাস নেবার একটা আঙিনা খুঁজে পেতো। ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার আবির্ভাব এবং কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিকতাকে অভিনন্দন জানিয়ে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ আগস্ট তৎকালীন প্রভাবশালী পত্রিকা ‘অমৃতবাজার’-এ লেখা হয়,-
“Dhumketu” We cordially welcome the advent of our new Bengali contemporary “Dhumketu” a bi-weekly edited by Habilder Kazi Nazrul Islam published from 32, College Street, Calcutta. The editor has already made his mark as a powerful poet and some of his recent poems, particularly the ‘Bidrohi’ are among the most well known in the Bengali literature. The articles from the editorial pen in the ‘Dhumketu’ fully sustain the reputation of the soldier poet and the collections he has been able to make one in tune with the fine and energy of his own writings. There is something novel, something enthralling in this new venture. We hope, the ‘Dhumketu’ or comet will not simply be an emblem of distribution in the hands of the soldier-poet but will create something that is beautiful something that is abiding and holy.
‘ধূমকেতু’- হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত এবং ৩২, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা থেকে প্রকাশিত সমসাময়িক নতুন বাংলা দ্বি-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার আবির্ভাবকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। সম্পাদক ইতিমধ্যেই একজন শক্তিশালী কবি হিসেবে নিজের খ্যাতি তৈরি করেছেন এবং তাঁর সাম্প্রতিক কিছু কবিতা, বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী’ বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক পরিচিত। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখা সৈনিক কবি’র খ্যাতি যথাযথভাবে বজায় রেখেছে এবং এতে সংকলিত প্রবন্ধসমূহ তাঁর নিজস্ব লেখার সূক্ষ্মতা ও শক্তির সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই নতুন উদ্যোগে কিছু অভিনব, কিছু আকর্ষণীয় বিষয় আছে। আমরা আশা করি, ‘ধূমকেতু’ বা ধূমকেতু কেবল সৈনিক-কবির হাতে বিতরণের প্রতীক হয়ে থাকবে না বরং এটি একটি সুন্দর, স্থায়ী এবং পবিত্র কিছু তৈরি করবে।
‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রকাশের শুভলগ্নে রবীন্দ্রনাথের কাছে আর্শীবাদ প্রার্থনা প্রসঙ্গে অচিত্যকুমার সেনগুপ্ত ‘কল্লোল যুগ’-এ লিখেছেন- ‘‘নজরুল শেষ মুহূর্তে তাঁকে টেলিগ্রাম করেছিল। রবীন্দ্রনাথ কবে কাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন? এ নজরুল, যার কবিতায় পেয়েছেন তিনি তপ্ত প্রাণের নতুন সজীবতা। শুধু নামে আর টেলিগ্রামে তিনি বুঝতে পারলেন ‘ধূমকেতু’র মর্মকথা কি। যৌবনকে ‘চিরজীবী’ আখ্যা দিয়ে ‘বলাকা’য় তিনি ঘা মেরে বাঁচতে বলেছিলেন, সেটাতে রাজনীতি ছিল না, কিন্তু, এবার ‘ধূমকেতু’কে তিনি যা লিখে পাঠালেন তা সুষ্ঠু রাজনীতি, প্রত্যক্ষ জাগরণের সংকেত।’’
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১৩ অক্টোবর কাজী নজরুল ইসলাম ’ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা’ চেয়ে ‘ধূমকেতু’তে লিখেন, ‘সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লী অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশান ভূমিতে পরিণত করেছেন তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে বোঁচকা পুটুলি বেঁধে সাগর পাড়ে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন-নিবেদন করলে তারা শুনবেন না। তাদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদের এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষে করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।’ এর সাথে এও তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে।’ কিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সেটাও তিনি বলেছেন পরিস্কার করে, ‘সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।’ এখানেই নজরুল অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা। যখন তিনি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলেছেন, তখন পর্যন্ত এমন স্পষ্ট করে কেউ বলেনি, এ ছাড়াও যে বিদ্রোহের কথা তিনি বলেছেন, তেমন করে বিদ্রোহ করতে না পারলে যে প্রত্যাশিত স্বাধীনতা সম্ভব নয়, সেটিও বলে দিয়েছেন। সেই বাঁধন-শৃঙ্খল যে আমাদের মানসিকও, সেটা থেকেও বের হয়ে আসার উপর জোর দিয়েছেন নজরুল। এখনও যা আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। এটিকে আমাদের বোঝাপড়ার মধ্যে আনতে হবে এবং এর জন্যে নজরুলের সাথে যোগযোগ সজীব রাখতে প্রয়োজন নিরন্তর নজরুল অধ্যয়ন।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ ধারায় কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয় এবং তিনি এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন ‘ধূমকেতু’তে নিজের কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ এবং লীলা মিত্রের লেখা ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ ছাপানোর জন্যে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি মূলত দেবী দুর্গার আবাহনমূলক। কবিতাটি দেবী আবাহনের হলেও দেবীকে উদ্দেশ্যে করে নজরুল লিখেছিলেনঃ
আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল,
দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা,-আসবি কখন সর্বনাশী?
কথাগুলো দেবীর উদ্দেশ্যে বলা হলেও, মূল লক্ষ্য ভারতের ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকার। স্বর্গসম মাতৃভূমিতে তারা ঔপনিবেশিক শাসন-শোষন কায়েম করেছে, তাদেরকে তিনি ‘অত্যাচারী চাঁড়াল শক্তি’ বলেছেন। একই সাথে স্বাধীনতাকামীদের তিনি ‘দেবশিশু’ বলেছেন। ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকার সেই দেবশিশুদের নিপীড়ণ করছে, ফাঁসি দিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে ভারতকে কসাইখানায় পরিণত করেছে। এই কবিতার রাজনৈতিক অভিঘাত এখানেই যে, তৎকালীন ভারতবষের্র শাসন পরিস্থিতির বিষয়টি বেরিয়ে আসছে মিথের আড়াল থেকে। ‘বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি’ উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে বেরিয়ে আসে ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসির বিষয়টিও। সমকালীন জীবন-বাস্তবতার সাথে মিথ চরিত্রের মিথস্ক্রিয়া করেছেন নজরুল আর এভাবেই তৈরি হয়েছে নতুন পাঠ, রাজনীতি এসেছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞানে।
জানা যায়, এই কবিতাটি লেখা হয়েছিল ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ পত্রিকার দুর্গাপূজার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশের জন্য, তাদেরই অনুরোধে। কিন্তু ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ কর্তৃপক্ষ কবিতাটি ছাপতে সাহস পায়নি। তাই নিজের কাগজ ‘ধূমকেতু’তেই এটা প্রকাশ করেন নজরুল। এই অপরাধে তাঁর বিচারও হয়। কিন্তু নজরুল ঔপনিবেশিক সরকারের ওই বিচার মানেননি, মানতে রাজি ছিলেন না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের কাছে তিনি ‘অপরাধী’ হলেও এই কবিতা তৎকালীন ভারতবাসীকে যেমন উদ্দীপিত করেছে স্বাধীনতা সংগ্রামে সামিল হতে, তেমনি এখনো যে কোন অত্যাচার, নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস দেয় এবং যে কোন মুক্তির লড়াইয়ে এই কবিতা আমাদের প্রেরণা যুগিয়ে যাবে চিরকাল।
অভিযুক্ত রাজবিদ্রোহী হিসেবে নজরুল বলেন, ‘আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না। এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো―এ কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এতদিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চক্ষুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষরূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায়-শাসন-ক্লিষ্ট বন্দি সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই কি আমি রাজদ্রোহী? এ ক্রন্দন কি একা আমার? না―এ আমার কণ্ঠে ঐ উৎপীড়িত নিখিল-নীরব ক্রন্দসীর সম্মিলিত সরব প্রকাশ? আমি জানি, আমার কণ্ঠের ঐ প্রলয়-হুঙ্কার একা আমার নয়, সে যে নিখিল আত্মার যন্ত্রণা-চিৎকার। আমায় ভয় দেখিয়ে মেরে এ ক্রন্দন থামানো যাবে না। হঠাৎ কখন আমার কণ্ঠের এই হারাবাণীই তাদের আরেক জনের কণ্ঠে গর্জন করে উঠবে।’
‘ধূমকেতু’ তাই শৃঙ্খল ভাঙার ডাক দিয়ে যাবে কাল থেকে কালে আর এভাবেই নজরুল সাহসী চেতনার উৎস হয়ে থাকবেন কালোত্তীর্ণ মাত্রায়।
লেখক : স্বপন পাল, প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী।

স্বপন পাল 


























