ভরা মৌসুমে ভালুকার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলিতে খাল বিলে মিলছেনা দেশীয় প্রজাতির কোন প্রকার মাছ। ফলে এক সময়ের মাছে ভাতে বাঙ্গালী এ অঞ্চলের মধ্য বিত্ত ও নি¤œবিত্ত মানুষদের খাদ্য তালিকায় শাক সবজি,কচুর লতি,আলু ভর্তা,মশুর ডাল ইত্যাদি প্রাধান্য পেয়েছে। সব গ্রামে খাল বিলে মাছ ধরার জন্য প্রত্যেক বাড়ীতে মাটির দেয়ালে খাড়া থাকতো বাঁশের তৈরী তিন কাঠির হাত জালি ও মাছ রাখার খালই (ডোলা)।
বাড়ীর পাশের বিল খাল ডোবায় কিছু সময় হাত জালি দিয়ে মাছ ধরলে দেশীয় প্রজাতির শিং, মাগুর, কৈ, টাকি, পুটি, টেংরা, চাটা, মলা, বেদাইরা, চান্দা ইত্যাদি ছোট মাছে ডোলা ভরে বাড়ী ফিরতেন গ্রামের গৃহস্ত লোকেরা। নিজের ক্ষেতে উৎপাদিত বেগুন, ঝিংগা, বরবটি, শসা, কুমড়া, রেগা, কচু ইত্যাদি সবজি দিয়ে আমিষ জাতীয় তরকারী পাক করে পরিবারের ছেলে মেয়েদের নিয়ে তৃপ্তি সহ দু’বেলা খাবার খেতেন।
মিল ফ্যাক্টরী হতে বর্জ মিশ্রিত বিষাক্ত কালো পানি খীরু নদী সহ বিভিন্ন খাল বিলে ছড়িয়ে যাওয়ায় দেশীয় প্রায় ৫০ প্রজাতির মাছ সম্পুর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অপরদিকে প্রভাবশালীরা ছোট বড় খাস ও মালিকানাধীন খাল বিল জলাশয়ে অপরিকল্পিত ভাবে রুই কাতল ও পাঙ্গাস মাছের চাষ করায় দেশীয় মাছের বিলুপ্তি ঘটছে। খাল বিল পুকুরে মাছ চাষ করার সময় ক্ষতিকর পোকা মাকড় নিধনের জন্য জলাশয় গুলিতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিষ প্রয়োগ করে থাকে। যে কারনে দেশীয় প্রজাতির মাছ সম্পুর্ণ রুপে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে এলাকার মানুষ প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ হারিয়ে আমিষ জাতীয় খাদ্য হতে বঞ্চিত হচ্ছে। অপরদিকে মুক্ত জলাশয়ে মাছ শিকারের সাথে জড়িত পেশাজীবি জেলেরাও আয় রোজগারের পথ হারিয়ে অন্য পেশার দিকে ছুটতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছারা শুকনা মৌসুমে উপজেলার ভালুকা, ভরাডোবা ও হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া ও কাশর এলাকার অসংখ্য ডাইং মিল থেকে বিরামহীন দুর্গন্ধযুক্ত ঘন কালোপানি লাউতি ও বেতিয়া হাঙ্গুন খাল দিয়ে খীরু নদীতে নামায় পানি বিষাক্ত হয়ে মাছ সহ সকল রকম পোকা মাকর মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানায় নদীর কিনার সহ মাটি আলকাতরার মত কিচকিচে কালো হয়ে গেছে। এসব কালো পানিতে নামলে শরীরে চুলকানি সহ নানা রকম চর্ম রোগের সৃষ্টি হয়।
অভিজ্ঞজনের মতে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে মিল ফ্যক্টরীর বর্জ পানির সাথে খাল বিল ও প্লাবন ভূমিতে বাঁধ দিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় মৎস্য চাষ, খীরু নদীর সাথে খাল বিলের সংযোগ স্থলে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহের গতিপথ অবরুদ্ধ করা বিলের কচুরিপানা ও ঘাস পরিষ্কার করে মাছের প্রজনন ও আবাস স্থল নষ্ট করে ফেলা উল্লেখযোগ্য কারন। গ্রাম এলাকার খাল বিল ও প্লাবন ভূমিগুলি ব্যক্তি মালিকানায় মৎস্য চাষ হওয়ার কারনে দেশীয় প্রজাতির মাছগুলি আর জন্মাতে পারছেনা। ফলে সারা বছর মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ ধরা হতে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার জন সাধারণ।
এক সময় বর্ষা এলে খীরু নদীর মিঠা পানিতে পাওয়া যেত অনেক প্রজাতির সুস্বাদু দেশীয় মাছ। যেমন রুই, কাতল, বাউস, কালি বাউস,বোয়াল, গোলসা, টেংরা, কাচকি, চাপিলা, পাবদা, বাইলা, বড় বাইন, তারা বাইন, মলা, ঢেলা, ছেলা, বাঘাই, আইড়, বাছা, বড়চিংড়ি, বাইলা, কাইক্কা আরো অনেক প্রজাতির মাছ। বর্ষা চলে যাওয়ার সাথে সাথে এসব মাছ প্রচুর ধরা পরতো জেলেদের জালে। এলাকার সব মানুষ ইচ্ছে মত মাছ ধরায় মেতে উঠতো। শুকনা মৌসুমে ডোবা খাল বিলে পাওয়া যেত শিং, মাগুর, কৈ, শোল, গজার, টাকি, ফইলা, খৈলা, ভেদা, ছোট চিংড়ি, পুটি, টেংরা, গুলসা ইত্যাদি। গ্রামাঞ্চলের যেখানেই ছোট বড় জলাশয় চোখে পরতো সেখানেই এসব মাছ পাওয়া যেতো। অথচ ওইসব জলাশয় প্রভাবশালীরা কৌশলে নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে পোকা মাকড় মারার অজুহাতে বিষঢেলে দেশীয় প্রজাতির মাছ ধ্বংস করে তাতে থাই পাঙ্গাসের চাষ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অপরদিকে মলা ঢেলা শিং মাগুর ও কৈ মাছের মত আমিষ জাতীয় খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার নারী শিশু সহ সর্ব সাধারণ। প্রসূতিপর মায়েদের শরীর স্বাস্থ্য পুনঃ গঠনে শিং মাছ ও কাঁচা কলার ঝোল রান্না করে খাওয়ানো একটি উত্তম সেবার মধ্যে থাকতো। শিশুদের চোখের জ্যোতি বাড়াতে মলা ঢেলা মাছ খাওয়ানোর জন্য ডাক্তার পরামর্শ দিতেন। এক কথায় প্রাকৃতিক উপায়ে এসব মাছ এখন আর পাওয়া যাচ্ছেনা।
মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্ভাবিদ কয়েক প্রজাতির মাছ বিভিন্ন খামারে চাষ হলেও চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। তাছারা অধিক মূল্যের কারনে এসব মাছ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। হাওর এলাকা থেকে আমদানী করা স্থানীয় বাজারে ৬০০ টাকা কেজি শিং, ৬০০ টাকা কেজি টেংরা, ৮০০ টাকা কেজি পাবদা, ৮০০ টাকা দেশী ছোট চিংড়ি,৬০০ টাকা কেজি মলা মাছ কিনে খাওয়া এখন গরীব ও মধ্যবিত্তদের জন্য দুঃস্বপ্নের মত। উপজেলার ভরাডোবা গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি জিন্নত আলী (৬০) জানান বৈশাখ জৈষ্ঠ মাসে যখন বৃষ্টি হতো তখন বিলের দাম ও কচুরি পানার নীচ থেকে শিং, মাগুর, কৈ, মাছ পানির ঢল পেয়ে ডাঙ্গায় উঠতে শুরু করলে ছেলে বুড়ো সবাই মেতে উঠতেন উজাই মাছ ধরায়। গ্রামের প্রচলিত ভাষায় যাকে বলা হতো উজাই মাছ ধরা। আবার অতি বৃষ্টি হলে খাল নালা দিয়ে পানি নামার সময় তিন কাঠির হাত জাল, ঝাকি জাল, শিবজাল ও হাত বরশি দিয়ে মাছ ধরায় মেতে উঠতো সকলে। গ্রামের খালে বিলে বর্ষার নতুন পানিতে বরশি দিয়ে লাল টেংড়া, পুটি পাবদা, শিং কৈ মাছ ধরা যেন উৎসবে পরিণত হতো। অথচ বর্ষার ভরা মৌসুমে নদী খালে পানি থাকলেও এখন আর মাছ ধরার দৃশ্য চোখে পরেনা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্য সচিব ভালুকা প্রেসক্লাব সভাপতি কামরুল হাসান পাঠান কামাল জানান খীরু নদী হতে অসংখ্য সংযোগ খাল দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বিল ও ডোবায় পানি প্রবাহিত হয়। দেশীয় প্রজাতির মাছের আবাস ও প্রজনন স্থল খীরু নদীতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য ডাইং মিল হতে দূষিত বর্জ মিশ্রিত কালো পানি নামার কারনে ডিম ওয়ালা মা মাছ সহ সব ধরনের মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান মিল কারখানা হতে ইটিপির মাধ্যমে বর্জ পানি পরিশোধন করে নদীতে ফেললে দেশীয় প্রজাতির মাছ গুলি ফিরে পাওয়া সম্ভব। সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি সচেতন মহলের দাবী দেশীয় মাছের অভয়ারণ্য প্রজনন স্থল সরকারি জল মহাল ও প্লাবন ভূমি মুক্ত জলাশয় গুলি প্রভাবশালীদের হাত থেকে উদ্ধার করে উন্মুক্ত রাখা ও মিল কারখানার বর্জপানি নদীখালে ফেলা বন্ধ হলে পুনরায় নানা প্রজাতির দেশীয় মাছে ভরে উঠবে নদী নালা খাল বিল।
আতাউর রহমান তরফদার, ভালুকা : 










