ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার ঘোগা গ্রামের আরফিনার জীবন একসময় ছিল আর দশজন সাধারণ নারীর মতোই। পরিবার, সংসার আর ভবিষ্যৎ ঘিরে তাঁরও ছিল ছোট ছোট স্বপ্ন। স্বাভাবিক জীবনযাপন, পরিবারের সঙ্গে ভালোভাবে থাকা এবং নিজের মতো করে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে একদিন মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় তাঁর জীবনের পুরো চিত্র। ২০০৩ সালে স্বামীর ছোড়া এসিড শুধু তাঁর শরীরকেই ঝলসে দেয়নি, গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল তাঁর মন, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্নেও।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন আরফিনা। খুব বেশি দূর লেখাপড়া করার সুযোগ না হলেও একটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবন গড়ার আশা ছিল তাঁর। বিয়ের পরও তিনি ভেবেছিলেন সংসারকে ঘিরেই হয়তো গড়ে উঠবে তাঁর ভবিষ্যৎ। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সংসারেই শুরু হয় যৌতুকের চাপ। স্বামীর পক্ষ থেকে যৌতুকের দাবি ওঠে। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত থাকায় সেই দাবি পূরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। যৌতুক দিতে না পারার বিষয়টি একসময় তাঁর জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। ২০০৩ সালে তাঁর স্বামী আরফিনার ওপর এসিড নিক্ষেপ করেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর পরিচিত পৃথিবীটি যেন বদলে যায়। এসিডে তাঁর মুখ, বুক, পিঠ ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ গুরুতরভাবে ঝলসে যায়। তীব্র যন্ত্রণা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
হামলার পর দ্রুত তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ)-এর সহায়তায় তিনি আরও চিকিৎসাসেবা পান। তাঁর চোখে জটিল অস্ত্রোপচারও করতে হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার পথে এগিয়ে যান আরফিনা। তবে শরীরের ক্ষত শুকিয়ে এলেও মনের ক্ষত সহজে শুকায়নি। শরীরে থেকে যাওয়া এসিডের দাগ প্রতিনিয়ত তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছে সেই ভয়াবহ দিনের কথা। আয়নায় নিজের পরিবর্তিত চেহারা দেখা, মানুষের দৃষ্টির মুখোমুখি হওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা—সবকিছুই তাঁর জন্য ছিল কঠিন।
এসিড হামলার পর শুধু শারীরিক যন্ত্রণাই নয়, নানা ধরনের মানসিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যেও পড়তে হয় তাঁকে। একদিকে ছিল দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে ছিল ভয়, দুশ্চিন্তা, হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। মানুষের আচরণও তাঁকে অনেক সময় কষ্ট দিয়েছে। সামাজিক অবহেলা, বৈষম্য এবং সহানুভূতির বদলে কৌতূহলী দৃষ্টি তাঁর জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। এসবের পাশাপাশি আর্থিক সমস্যাও ছিল বড় একটি চ্যালেঞ্জ। শারীরিক অবস্থার কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা কিংবা আয় করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। নিজের প্রয়োজন মেটানো থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাঁকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে এসিড হামলার প্রভাব তাঁর জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক সময় এমন পরিস্থিতি একজন মানুষকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারে। আরফিনার জীবনেও হতাশা এসেছে, ভয় এসেছে, একাকিত্ব এসেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে তিনি ধীরে ধীরে আবার সামনে তাকাতে শিখেছেন। তাঁর জীবনে নতুন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয় যখন তিনি মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবিকা সহায়তার আওতায় আসেন। প্রকল্পের মাধ্যমে পাওয়া মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও কাউন্সেলিং আরফিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজের ভেতরে জমে থাকা কষ্ট, ভয় এবং হতাশার কথা বলার সুযোগ পান তিনি। কাউন্সেলিং তাঁকে অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার প্রভাব সামলাতে এবং নিজের বর্তমান জীবনকে নতুনভাবে দেখার শক্তি জোগায়।
মানসিক সহায়তার পাশাপাশি জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন সুযোগও তাঁর সামনে আসে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, রেফারেল এবং অন্যান্য সহায়তা তাঁকে ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। আগে যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মধ্যে অনিশ্চয়তা বেশি ছিল, সেখানে সহায়তা পাওয়ার পর নিজের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন তিনি। আরফিনার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে তাঁর মানসিকতায়। একসময় যে ভয়, কষ্ট ও হতাশা তাঁকে ঘিরে রেখেছিল, এখন তার জায়গায় ধীরে ধীরে ফিরে এসেছে আত্মবিশ্বাস ও আশাবাদ। তিনি বুঝতে শুরু করেছেন, অতীতের ঘটনা তাঁর জীবনের একটি অংশ হলেও সেটিই তাঁর পুরো পরিচয় নয়। তিনি একজন এসিড-সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া নারী, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি একজন মানুষ, যাঁর নিজের ইচ্ছা, সক্ষমতা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ রয়েছে।
পরিবার ও সমাজের মানুষের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন অনুভব করছেন আরফিনা। একসময় যে সামাজিক অবহেলা ও বৈষম্য তাঁকে কষ্ট দিত, এখন সেগুলো পেরিয়ে নিজের জীবনকে আরও ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করছেন তিনি। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা, নিজের প্রয়োজনের কথা বলা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রেও তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। নিজের বর্তমান জীবন নিয়ে আরফিনা বলেন, “বর্তমানে আমি আনন্দের সঙ্গে জীবনযাপন করছি।”
এই ছোট একটি বাক্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের সংগ্রাম। রয়েছে হাসপাতালের বিছানায় কাটানো সময়, অস্ত্রোপচারের ভয়, শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা, সামাজিক অবহেলা, মানসিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। সেই সবকিছু পেরিয়ে আজ নিজের জীবনকে নিয়ে আনন্দের কথা বলতে পারা তাঁর জন্য একটি বড় অর্জন। তবে আরফিনার যাত্রা এখানেই থেমে নেই। এখন তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নিজের একটি ছোট ব্যবসা শুরু করা। তিনি চান নিজের একটি আয়ের উৎস তৈরি করতে, যাতে নিজের প্রয়োজন নিজে মেটাতে পারেন। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছাই এখন তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করছে।
ছোট ব্যবসাটি হয়তো আকারে খুব বড় হবে না, কিন্তু আরফিনার কাছে এর অর্থ অনেক বড়। নিজের আয় মানে শুধু অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য নয়; এটি তাঁর কাছে আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার শক্তি। নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করে জীবন পরিচালনা করতে পারলে দীর্ঘদিনের অসহায়ত্বের জায়গায় তৈরি হবে নতুন আত্মবিশ্বাস। আরফিনার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সহিংসতার প্রভাব কেবল একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে একজন নারীর শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক অবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর। একই সঙ্গে তাঁর গল্প এটিও দেখায় যে সঠিক চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, জীবিকার সুযোগ এবং সামাজিক সহযোগিতা পেলে একজন সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া নারী আবারও নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারেন।
আরফিনার গল্প তাই শুধু এসিড হামলার ভয়াবহতার গল্প নয়। এটি ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। এটি দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট পেরিয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি বহন করেও ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সাহস হারাননি। একসময় স্বামীর ছোড়া এসিড তাঁর শরীরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। সেই ক্ষত ও দাগ আজও তাঁর শরীরে রয়ে গেছে। কিন্তু দাগগুলো এখন আর শুধু ভয়াবহ অতীতের স্মৃতি নয়; এগুলো তাঁর দীর্ঘ লড়াই ও টিকে থাকার সাক্ষীও।
আজ আরফিনা সামনে তাকাচ্ছেন নতুন একটি স্বপ্ন নিয়ে—নিজের ছোট একটি ব্যবসা, নিজের আয়, নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো একটি স্বাবলম্বী জীবন। অতীত তাঁকে আহত করেছে, কিন্তু তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারেনি। দীর্ঘ অন্ধকার পথ পেরিয়ে আরফিনা এখন সেই ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে যেতে চান, যেখানে তাঁর পরিচয় হবে কেবল সহিংসতার শিকার একজন নারী হিসেবে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী, কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে।
স্টাফ রিপোর্টার 



















