০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে মুক্তমঞ্চ ভেঙে তোপের মুখে প্রশাসন

  • ইলিয়াস আহমেদ
  • পোষ্টের সময় : ১০:০৭:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫
  • ৩৯৪ ভিউ :

ময়মনসিংহে সাহিত্য সংসদের মুক্তমঞ্চ আকস্মিক উচ্ছেদ অভিযানে ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

 

উচ্ছেদের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন নমনীয়তা দেখালেও আন্দোলনকারীরা বলছেন, দুঃখ প্রকাশ করে পুনঃনির্মাণ করতে হবে মুক্তমঞ্চ।

 

বুধবার (৩০ এপ্রিল) মুক্তমঞ্চ ভাঙার পর পাশেই নির্মাণাধীন আরেকটি অসম্পন্ন একতলা স্থাপনা ভাঙতে গেলে কবি ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে উচ্ছেদ অভিযান থেকে সরে যান ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার সকালে এ নিয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে কথা, গান, কবিতায় প্রতিবাদ জানায় সাহিত্য সংসদের একটি অংশ। চারপাশে অনেক অবৈধ দখলদার থাকতে মুক্তমঞ্চ ভেঙে দেয়ার কারণ জানতে চায় কবি-সাহিত্যিকরা।

 

কবি মুশাররাফ করিমের হাত ধরে ১৯৮০ সালের ২১ মে ময়মনসিংহে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত সাহিত্য সংসদ যাত্রা শুরু করে। নগরের জয়নাল আবেদিন উদ্যান এলাকায় ১৯৯২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ম শফিউল আলম সাড়ে ছয় শতক জমি সাহিত্য সংসদকে লিখিতভাবে বরাদ্দ দেন। সেই লিখিত চিঠি মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়। ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসক এ এস এম মতিউর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সাহিত্য সংসদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর থেকেই সেখানে সাহিত্য সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল।

 

১৯৮৩ সাল থেকে সাহিত্য সংসদের নিয়মিত পাঠচক্র বীক্ষণ আসর শুরু হলেও জয়নাল আবেদিন উদ্যানে ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে আসরটি হয়ে আসছে। শুক্রবার (২ মে) বীক্ষণের ২ হাজার ১৪৬তম আসর হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়াও সাহিত্য সংসদের আয়োজনে নাট্যপ্রকল্প, আবৃত্তিপ্রকল্প এবং পুরুষ্কার প্রকল্প পরিচালিত হতো।

 

বীক্ষণ আসরে ইতিহাসবিদ, লেখক বদরুদ্দীন মোহাম্মদ উমর, কবি আল মাহমুদ, কবি শামসুর রাহমান, কবি আল মুজাহিদী, কবি ও গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দ, কবি হেলাল হাফিজ, কবি আবু করিম, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি শহিদ কাদরী, ছড়াকার আবু সালেহ, কবি মাহবুব সাদিক, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীসহ আরো অনেক প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল।

 

সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, সাহিত্য সংসদটি কবি, লেখক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। ২০১৪ সালের দিকে সংগঠনটির সভাপতি কবি ফরিদ আহমেদ দুলাল এবং সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। এরই জেরে ২০১৯ সালে দুটি গ্রুপ সাহিত্য সংসদের পৃথক পৃথক কমিটি গঠন করেন। ইয়াজদানী কোরায়শী কাজলের গ্রুপের কবি আনোয়ারা সুলতানাকে সভাপতি এবং কবি স্বাধীন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ফরিদ আহমেদ দুলালের গ্রুপের কবি শামসুল ফয়েজকে সভাপতি এবং কবি মাহমুদ আল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এরপর থেকে সাহিত্য সংসদের বীক্ষণ আসরটি কবি ফরিদ আহমেদ দুলাল গ্রুপের অনুসারীরা জয়নুল আবেদিন উদ্যানের মুক্তমঞ্চে এবং ইয়াজদানী কোরায়শী কাজলের অনুসারীরা যুবলীঘাট চেতনামঞ্চে করে আসছেন।

 

বুধবার সকাল ১১টার দিকে কাচারিঘাট এলাকায় হিমু আড্ডার খানিকটা সামনের ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের অসম্পন্ন একতলা ভবন ভাঙার চেষ্টা করে ভ্রাম্যমান আদালত। সেটি ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে পাশেই স্থাপিত মুক্তমঞ্চ ভেঙে দেন তারা। তারপর আবার একতলা ভবন ভাঙার চেষ্টা করলে বাধা হয়ে দাঁড়ান কবি,সাহিত্যিকরা। পরে ব্যর্থ হয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক কর্মকর্তা মো.সিরাজুল ইসলাম এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম রাফসান রাব্বি বৈশাখী মঞ্চের উল্টোদিকে গড়ে ওঠা বিজয়ী পিঠা বাড়ী নামে একটি স্থাপনাসহ পাঁচটি স্থাপনা উচ্ছেদ করেন।

 

মুক্তমঞ্চ উচ্ছেদ অভিযান থেকে রক্ষা করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন কবি শামীম আশরাফ। এ সময় তিনি ভ্রাম্যমান আদালতের কর্মকর্তাদের সাথেও তর্কে জড়ান।

 

কবি শামীম আশরাফ বলেন, ‘‘কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের মুক্তমঞ্চটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় হৃদয়ে বারবার রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি সরকার কোনো সময় এত বড় সাহস করেনি, যা করে দেখিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসন। এর পিছনে কোনো বড় ইন্ধন আছে বলে আমি মনে করি। আমাদের হাতে প্রশাসনের মতো অস্ত্র নেই, তাই আমরা গান-বাজনার বাদ্য যন্ত্র নিয়েই জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে কথা, গান, কবিতায় প্রতিবাদ করেছি। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বরেণ্য কবি আশরাফ মীর, সামশুল ফয়েজ এবং কথা সাহিত্যিক সালিম হাসানসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। দুইদিনের আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে প্রশাসনকে৷ এরমধ্যে দুঃখপ্রকাশ করে যদি মুক্তমঞ্চটি পুনঃনির্মাণ না করে দেয়, তাহলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

 

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বরেণ্য কবি আশরাফ মীর বলেন, ‘‘আমরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই প্রায় ৪৩ বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। হঠাৎ করে প্রশাসন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে যা করেছে, তা মোটেই কাম্য হয়নি। এটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জন্য একটা হুমকি বলে আমরা মনে করছি। আমরা চাই, আপনারা আপনাদের ভুল-ত্রুটি শুধরে অক্ষত মঞ্চ পুনারায় ফিরিয়ে দিন। মুক্ত-মঞ্চের আশপাশে অনেক অবৈধ দখলদার থাকতেও কোন কারণে আমাদের অস্তিতের জায়গায় হাত দেয়া হয়েছে?”

 

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল নাকিব বলেন, ‘‘মুক্তমঞ্চের পাশেই ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় নামে-বেনামে প্রতিনিয়ত দখল হচ্ছে। গত ৬ মাস ধরে বাণিজ্য মেলার প্যান্ডেল করে নদের জায়গা দখল করা হয়েছে। তা না সরিয়ে কবি, সাহিত্যিকদের সাহিত্যচর্চায় আঘাত হেনেছে। কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন আপনারা। টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করছেন কবি, সাহিত্যিকদের। এই অঞ্চলের মানুষ তা কখনো মেনে নেবে না।”

 

সাহিত্য সংসদের সাবেক সভাপতি কবি ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘‘যখন চিঠির মাধ্যমে সাড়ে ছয় শতাংশ জায়গা সাহিত্য সংসদের নামে বুঝিয়ে দেয়া হয়, তখন আমি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তখন থেকে জায়গাটি সাহিত্য সংসদের কিনা তা নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি। সরকার, কিংবা প্রশাসনও এ নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন তোলেননি। কিন্তু কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়া মুক্তমঞ্চটি গুঁড়িয়ে দেওয়ায় আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও যেতে শক্তি পাইনি। কেন এমনটা হলো তার কারণ খুঁজেও পাচ্ছি না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সারাদেশে এমন হচ্ছে। কোথাও কেউ মন খুলে গান-বাজনা এবং সাহিত্য চর্চা করতে পারছে না। এটা আমাদের সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি।”

 

তিনি আরর বলেন, ‘‘আমাদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে পদ-পদবি নিয়ে মত-দ্বিমত আছে। এ কারণে আমি সংগঠন নিয়ে অনেকটা নীরব ভূমিকায় রয়েছি। দুর্দিনে আমাদের এক হওয়ার একটা সুযোগ ছিল। তা-ও আমরা হচ্ছি না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে প্রশাসন। চারদিকে কতশত অবৈধ দখলদার, কেউ তো তাদের কিছু বলছে না বা উচ্ছেদও করছে না। এখানে তো সাহিত্য চর্চা ছাড়া আর কিছু হয় না। তাহলে এই জায়গায় আঘাত কেন? আমরা জাতি হিসেবে পিছিয়ে পড়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছি।”

 

সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল বলেন, ‘‘আমাদের মধ্যে বিরোধ থাকলেও তার মানে এই নয়, আমরা প্রশাসনের উচ্ছেদকে সমর্থন দিচ্ছি। আমরাও এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অচিরেই প্রশাসনের সঙ্গে বসে সুন্দর একটি সমাধানের চেষ্টা করবো। বিগত সরকারের আমলে সাহিত্য সংসদকে ফ্যাসিবাদ সংসদে একটি পক্ষ রূপান্তর করেছিল, যার কারণে হয়তো দুটি গ্রুপ হওয়ায় প্রশাসন সুযোগ নিয়েছে। আমরা চাই সাহিত্য সংসদটি কবি, সাহিত্যিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক।”

 

মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, ‘‘বীক্ষণের আসরে একদিন আমাকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তখন দেখেছি, তাদের একটি একতলা অসম্পন্ন ভবন রয়েছে। সেটির কাজ সম্পন্ন হয়নি। তখন মনে হয়েছে, জায়গাটি নিয়ে হয়তো কোনো সমস্যা আছে। আর জেলা প্রশাসন যেটি করেছে, তাদের যদি কোনো কাগজ-পত্র না থেকে থাকে, তাহলে ঠিকই করেছে। কোনো ধরনের কাগজপত্র থাকলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে নোটিশ করার প্রয়োজন ছিল। কথা উঠছে আশে-পাশে অনেকে অবৈধ ভাবে বিভিন্ন জায়গা-জমি দখল করে রাখছে, সে বিষয়ে প্রশাসন কেন পদক্ষেপ নিচ্ছে না৷ আমি বলবো, আগে নিজে সঠিক পন্থায় থেকে অন্যের দোষ-ত্রুটি ধরুন।”

 

উচ্ছেদ অভিযান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলমের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

 

সিটি কর্পোরেশনের সচিব সুমনা আল মজীদ বলেন, ‘‘নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। যদি তাদের কোনো বৈধ কাগজপত্র থাকে, তাহলে আমাদের দেখালে আমরা মঞ্চটি পুনরায় নির্মাণ করে দেবো। সেখানে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসতো- এমন অভিযোগও আমাদের কাছে ছিল।”

 

আশেপাশে অবৈধভাবে অনেক দখলদার আছে, সেখানে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আগামীতে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে। পার্ক কোলাহলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান চলবে। আপনাদের আরো কোনো প্রশ্ন থাকলে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে জানতে পারেন।”

 

সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার মো.মোখতার আহমেদ বলেন, ‘‘বিষয়টি নজরে আসার পর জেলা প্রশাসককে বলেছি কেন সাহিত্য সংসদের মুক্তমঞ্চ ভাঙা হলো। সেটি না ভাঙলেও তো হতো। আসলে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে অন্য স্থাপনার সাথে সেটি ভাঙা হয়েছে। জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, ভালো একটু জায়গা দেখে সাহিত্য সংসদের নামে একটি স্থাপনা বৈধভাবে করে দেওয়ার জন্য।”

 

তিনি দাবি করেন, ‘‘তারা যে দীর্ঘদিন সেখানে আছেন, সেটির কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। তাদের সংগঠনেরও অভ্যন্তরীণ অনেক সমস্যা রয়েছে, যার কারণে একটি পক্ষ সংগঠন থেকে বেরিয়ে গেছে। জয়নুল আবেদিন উদ্যান হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষের ফুঁসফুঁস৷ আমরা চাই সেখানে মানুষ মুক্তভাবে চলাফেরা করুক।”

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :

দল বা প্রশাসনের কেউ অপরাধে জড়ালে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে: প্রিন্স

সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি, 'মাশরেকী' পদক পেলেন ঈশ্বরগঞ্জের মুজিবুর রহমান

30 September 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

ময়মনসিংহে মুক্তমঞ্চ ভেঙে তোপের মুখে প্রশাসন

পোষ্টের সময় : ১০:০৭:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫

ময়মনসিংহে সাহিত্য সংসদের মুক্তমঞ্চ আকস্মিক উচ্ছেদ অভিযানে ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

 

উচ্ছেদের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন নমনীয়তা দেখালেও আন্দোলনকারীরা বলছেন, দুঃখ প্রকাশ করে পুনঃনির্মাণ করতে হবে মুক্তমঞ্চ।

 

বুধবার (৩০ এপ্রিল) মুক্তমঞ্চ ভাঙার পর পাশেই নির্মাণাধীন আরেকটি অসম্পন্ন একতলা স্থাপনা ভাঙতে গেলে কবি ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে উচ্ছেদ অভিযান থেকে সরে যান ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার সকালে এ নিয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে কথা, গান, কবিতায় প্রতিবাদ জানায় সাহিত্য সংসদের একটি অংশ। চারপাশে অনেক অবৈধ দখলদার থাকতে মুক্তমঞ্চ ভেঙে দেয়ার কারণ জানতে চায় কবি-সাহিত্যিকরা।

 

কবি মুশাররাফ করিমের হাত ধরে ১৯৮০ সালের ২১ মে ময়মনসিংহে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত সাহিত্য সংসদ যাত্রা শুরু করে। নগরের জয়নাল আবেদিন উদ্যান এলাকায় ১৯৯২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ম শফিউল আলম সাড়ে ছয় শতক জমি সাহিত্য সংসদকে লিখিতভাবে বরাদ্দ দেন। সেই লিখিত চিঠি মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়। ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসক এ এস এম মতিউর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সাহিত্য সংসদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর থেকেই সেখানে সাহিত্য সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল।

 

১৯৮৩ সাল থেকে সাহিত্য সংসদের নিয়মিত পাঠচক্র বীক্ষণ আসর শুরু হলেও জয়নাল আবেদিন উদ্যানে ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে আসরটি হয়ে আসছে। শুক্রবার (২ মে) বীক্ষণের ২ হাজার ১৪৬তম আসর হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়াও সাহিত্য সংসদের আয়োজনে নাট্যপ্রকল্প, আবৃত্তিপ্রকল্প এবং পুরুষ্কার প্রকল্প পরিচালিত হতো।

 

বীক্ষণ আসরে ইতিহাসবিদ, লেখক বদরুদ্দীন মোহাম্মদ উমর, কবি আল মাহমুদ, কবি শামসুর রাহমান, কবি আল মুজাহিদী, কবি ও গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দ, কবি হেলাল হাফিজ, কবি আবু করিম, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি শহিদ কাদরী, ছড়াকার আবু সালেহ, কবি মাহবুব সাদিক, কবি আসাদ চৌধুরী, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীসহ আরো অনেক প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল।

 

সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, সাহিত্য সংসদটি কবি, লেখক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। ২০১৪ সালের দিকে সংগঠনটির সভাপতি কবি ফরিদ আহমেদ দুলাল এবং সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। এরই জেরে ২০১৯ সালে দুটি গ্রুপ সাহিত্য সংসদের পৃথক পৃথক কমিটি গঠন করেন। ইয়াজদানী কোরায়শী কাজলের গ্রুপের কবি আনোয়ারা সুলতানাকে সভাপতি এবং কবি স্বাধীন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ফরিদ আহমেদ দুলালের গ্রুপের কবি শামসুল ফয়েজকে সভাপতি এবং কবি মাহমুদ আল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এরপর থেকে সাহিত্য সংসদের বীক্ষণ আসরটি কবি ফরিদ আহমেদ দুলাল গ্রুপের অনুসারীরা জয়নুল আবেদিন উদ্যানের মুক্তমঞ্চে এবং ইয়াজদানী কোরায়শী কাজলের অনুসারীরা যুবলীঘাট চেতনামঞ্চে করে আসছেন।

 

বুধবার সকাল ১১টার দিকে কাচারিঘাট এলাকায় হিমু আড্ডার খানিকটা সামনের ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের অসম্পন্ন একতলা ভবন ভাঙার চেষ্টা করে ভ্রাম্যমান আদালত। সেটি ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে পাশেই স্থাপিত মুক্তমঞ্চ ভেঙে দেন তারা। তারপর আবার একতলা ভবন ভাঙার চেষ্টা করলে বাধা হয়ে দাঁড়ান কবি,সাহিত্যিকরা। পরে ব্যর্থ হয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক কর্মকর্তা মো.সিরাজুল ইসলাম এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম রাফসান রাব্বি বৈশাখী মঞ্চের উল্টোদিকে গড়ে ওঠা বিজয়ী পিঠা বাড়ী নামে একটি স্থাপনাসহ পাঁচটি স্থাপনা উচ্ছেদ করেন।

 

মুক্তমঞ্চ উচ্ছেদ অভিযান থেকে রক্ষা করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন কবি শামীম আশরাফ। এ সময় তিনি ভ্রাম্যমান আদালতের কর্মকর্তাদের সাথেও তর্কে জড়ান।

 

কবি শামীম আশরাফ বলেন, ‘‘কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের মুক্তমঞ্চটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় হৃদয়ে বারবার রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি সরকার কোনো সময় এত বড় সাহস করেনি, যা করে দেখিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসন। এর পিছনে কোনো বড় ইন্ধন আছে বলে আমি মনে করি। আমাদের হাতে প্রশাসনের মতো অস্ত্র নেই, তাই আমরা গান-বাজনার বাদ্য যন্ত্র নিয়েই জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে কথা, গান, কবিতায় প্রতিবাদ করেছি। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বরেণ্য কবি আশরাফ মীর, সামশুল ফয়েজ এবং কথা সাহিত্যিক সালিম হাসানসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। দুইদিনের আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে প্রশাসনকে৷ এরমধ্যে দুঃখপ্রকাশ করে যদি মুক্তমঞ্চটি পুনঃনির্মাণ না করে দেয়, তাহলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

 

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বরেণ্য কবি আশরাফ মীর বলেন, ‘‘আমরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই প্রায় ৪৩ বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। হঠাৎ করে প্রশাসন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে যা করেছে, তা মোটেই কাম্য হয়নি। এটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জন্য একটা হুমকি বলে আমরা মনে করছি। আমরা চাই, আপনারা আপনাদের ভুল-ত্রুটি শুধরে অক্ষত মঞ্চ পুনারায় ফিরিয়ে দিন। মুক্ত-মঞ্চের আশপাশে অনেক অবৈধ দখলদার থাকতেও কোন কারণে আমাদের অস্তিতের জায়গায় হাত দেয়া হয়েছে?”

 

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল নাকিব বলেন, ‘‘মুক্তমঞ্চের পাশেই ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় নামে-বেনামে প্রতিনিয়ত দখল হচ্ছে। গত ৬ মাস ধরে বাণিজ্য মেলার প্যান্ডেল করে নদের জায়গা দখল করা হয়েছে। তা না সরিয়ে কবি, সাহিত্যিকদের সাহিত্যচর্চায় আঘাত হেনেছে। কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন আপনারা। টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করছেন কবি, সাহিত্যিকদের। এই অঞ্চলের মানুষ তা কখনো মেনে নেবে না।”

 

সাহিত্য সংসদের সাবেক সভাপতি কবি ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘‘যখন চিঠির মাধ্যমে সাড়ে ছয় শতাংশ জায়গা সাহিত্য সংসদের নামে বুঝিয়ে দেয়া হয়, তখন আমি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তখন থেকে জায়গাটি সাহিত্য সংসদের কিনা তা নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি। সরকার, কিংবা প্রশাসনও এ নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন তোলেননি। কিন্তু কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়া মুক্তমঞ্চটি গুঁড়িয়ে দেওয়ায় আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও যেতে শক্তি পাইনি। কেন এমনটা হলো তার কারণ খুঁজেও পাচ্ছি না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সারাদেশে এমন হচ্ছে। কোথাও কেউ মন খুলে গান-বাজনা এবং সাহিত্য চর্চা করতে পারছে না। এটা আমাদের সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি।”

 

তিনি আরর বলেন, ‘‘আমাদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে পদ-পদবি নিয়ে মত-দ্বিমত আছে। এ কারণে আমি সংগঠন নিয়ে অনেকটা নীরব ভূমিকায় রয়েছি। দুর্দিনে আমাদের এক হওয়ার একটা সুযোগ ছিল। তা-ও আমরা হচ্ছি না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে প্রশাসন। চারদিকে কতশত অবৈধ দখলদার, কেউ তো তাদের কিছু বলছে না বা উচ্ছেদও করছে না। এখানে তো সাহিত্য চর্চা ছাড়া আর কিছু হয় না। তাহলে এই জায়গায় আঘাত কেন? আমরা জাতি হিসেবে পিছিয়ে পড়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছি।”

 

সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল বলেন, ‘‘আমাদের মধ্যে বিরোধ থাকলেও তার মানে এই নয়, আমরা প্রশাসনের উচ্ছেদকে সমর্থন দিচ্ছি। আমরাও এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অচিরেই প্রশাসনের সঙ্গে বসে সুন্দর একটি সমাধানের চেষ্টা করবো। বিগত সরকারের আমলে সাহিত্য সংসদকে ফ্যাসিবাদ সংসদে একটি পক্ষ রূপান্তর করেছিল, যার কারণে হয়তো দুটি গ্রুপ হওয়ায় প্রশাসন সুযোগ নিয়েছে। আমরা চাই সাহিত্য সংসদটি কবি, সাহিত্যিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক।”

 

মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, ‘‘বীক্ষণের আসরে একদিন আমাকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তখন দেখেছি, তাদের একটি একতলা অসম্পন্ন ভবন রয়েছে। সেটির কাজ সম্পন্ন হয়নি। তখন মনে হয়েছে, জায়গাটি নিয়ে হয়তো কোনো সমস্যা আছে। আর জেলা প্রশাসন যেটি করেছে, তাদের যদি কোনো কাগজ-পত্র না থেকে থাকে, তাহলে ঠিকই করেছে। কোনো ধরনের কাগজপত্র থাকলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে নোটিশ করার প্রয়োজন ছিল। কথা উঠছে আশে-পাশে অনেকে অবৈধ ভাবে বিভিন্ন জায়গা-জমি দখল করে রাখছে, সে বিষয়ে প্রশাসন কেন পদক্ষেপ নিচ্ছে না৷ আমি বলবো, আগে নিজে সঠিক পন্থায় থেকে অন্যের দোষ-ত্রুটি ধরুন।”

 

উচ্ছেদ অভিযান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলমের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

 

সিটি কর্পোরেশনের সচিব সুমনা আল মজীদ বলেন, ‘‘নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। যদি তাদের কোনো বৈধ কাগজপত্র থাকে, তাহলে আমাদের দেখালে আমরা মঞ্চটি পুনরায় নির্মাণ করে দেবো। সেখানে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসতো- এমন অভিযোগও আমাদের কাছে ছিল।”

 

আশেপাশে অবৈধভাবে অনেক দখলদার আছে, সেখানে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আগামীতে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে। পার্ক কোলাহলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান চলবে। আপনাদের আরো কোনো প্রশ্ন থাকলে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে জানতে পারেন।”

 

সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার মো.মোখতার আহমেদ বলেন, ‘‘বিষয়টি নজরে আসার পর জেলা প্রশাসককে বলেছি কেন সাহিত্য সংসদের মুক্তমঞ্চ ভাঙা হলো। সেটি না ভাঙলেও তো হতো। আসলে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে অন্য স্থাপনার সাথে সেটি ভাঙা হয়েছে। জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, ভালো একটু জায়গা দেখে সাহিত্য সংসদের নামে একটি স্থাপনা বৈধভাবে করে দেওয়ার জন্য।”

 

তিনি দাবি করেন, ‘‘তারা যে দীর্ঘদিন সেখানে আছেন, সেটির কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। তাদের সংগঠনেরও অভ্যন্তরীণ অনেক সমস্যা রয়েছে, যার কারণে একটি পক্ষ সংগঠন থেকে বেরিয়ে গেছে। জয়নুল আবেদিন উদ্যান হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষের ফুঁসফুঁস৷ আমরা চাই সেখানে মানুষ মুক্তভাবে চলাফেরা করুক।”

Share this news as a Photo Card