ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া প্রদেশের একটি স্কুলভবনে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত এবং ৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ। নিখোঁজ ব্যক্তিরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হামলার সময় ভবনটি বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয়কেন্দ্র ও মানবিক সহায়তা বিতরণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে প্রদেশটির কোমাইশুভাখা গ্রামে এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, রুশ বাহিনী ভবনটি লক্ষ্য করে অন্তত নয়টি বোমা নিক্ষেপ করেছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এটিকে অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
স্থানীয় গভর্নর মাইখাইলো সেমিকিনের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্কুলটিতে নিয়মিত পাঠদান বন্ধ ছিল। ভবনটি স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্রয়, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং মানবিক সহায়তা বিতরণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
হামলার সময় সেখানে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিরা ভবনের ভূগর্ভস্থ একটি সুরক্ষিত কক্ষে অবস্থান করছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে নির্মিত কক্ষটি বোমা হামলা প্রতিরোধের উপযোগী করে তৈরি করা হলেও একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণে কংক্রিটের কাঠামো ধসে পড়ে। পরে সেখানে আগুন ধরে যায়।
ইউক্রেনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক বিবৃতিতে জানায়, হামলার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা মানবিক সহায়তা সংগ্রহের জন্য ভবনটিতে জড়ো হয়েছিলেন।
মিশনের প্রধান ড্যানিয়েল বেল বলেন, মানবিক সহায়তা বিতরণের স্থান ও সময় সম্পর্কে আগে থেকেই প্রচার করা হয়েছিল। ফলে সেখানে বেসামরিক নাগরিকদের উপস্থিতির বিষয়টি রুশ বাহিনীর জানা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, হামলার আগে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তাঁর মতে, হামলার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এদিকে স্কুলভবনে হামলার পর ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে রাশিয়া ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, শত শত ড্রোনের পাশাপাশি ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিস শমিহাল জানিয়েছেন, খমেলনিৎস্কি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র লক্ষ্য করে তিনটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ইউরোপের পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস নির্বাচনের দিনেই রাশিয়ার এমন হামলা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ সম্প্রতি নরওয়েতে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে সেন্ট পিটার্সবার্গ সফর করেন তিনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের অধিকৃত ওলেশকি শহরে সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কয়েক শ বেসামরিক নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ চললেও ইউক্রেনের বেসামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্কুলভবনে প্রাণহানির ঘটনায় বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 




















