দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। সোমবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তায় এ ঘোষণা দেন আর্জেন্টাইন এই মহাতারকা।
অবসরের ঘোষণা দিয়ে মেসি জানান, জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্তটি তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। দীর্ঘ সময় ভেবেচিন্তে তিনি মনে করছেন, এখনই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়। জাতীয় দলের জার্সির জন্য ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মেসি বলেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং একেকটি অধ্যায়ের শেষ হয়। জাতীয় দলের অংশ হতে তিনি সবসময় ভালোবেসেছেন এবং ভবিষ্যতেও এই ভালোবাসা থাকবে। তবে এখন তার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের বেশ কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্য বলেও জানান তিনি।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির অভিষেক হয় ২০০৫ সালে। এরপর দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে দলটির হয়ে ২০৭ ম্যাচ খেলেছেন তিনি, করেছেন ১২৫ গোল। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোল—দুই রেকর্ডই এখন মেসির দখলে।
তবে শুরুটা ছিল কঠিন। দীর্ঘ সময় আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে না পারায় মেসিকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ও ২০১৫ এবং ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর ২০১৬ সালে একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জাতীয় দলে ফিরে আসেন।
ফিরে এসে বদলে দেন আর্জেন্টিনার ইতিহাস। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেন মেসি। এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা জয়ের পর কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা শিরোপা জেতেন তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুললেও সেখানে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১–০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় দলটি। ওই ম্যাচটিই আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়ে থাকল।
মেসি জানিয়েছেন, অবসরের কথাগুলো তিনি প্রথম লিখেছিলেন ২১ জুলাই—বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর। আগস্টে তার বাবা জর্জ মেসির মৃত্যুর পর এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি আরও দৃঢ় হন।
বিদায়ী বার্তায় আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান মেসি। গত ২০ বছর ধরে পাওয়া ভালোবাসা ও সমর্থনের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, মাঠের ভেতর থেকে সমর্থকদের কণ্ঠ তিনি খুব মিস করবেন। তবে ভবিষ্যতে মাঠের বাইরে থেকে একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে আর্জেন্টিনা দলের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
পরিবার, সতীর্থ, কোচ ও কর্মকর্তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। জাতীয় দলের হয়ে সতীর্থদের সঙ্গে পাওয়া স্মৃতি ও অর্জনগুলোকে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এই আর্জেন্টাইন তারকা।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটল রেকর্ড ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোল নিয়ে। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জয়ের পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছেন দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রতীক।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ক্লাব ফুটবলে মেসির পথচলা এখনো অব্যাহত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন তিনি এবং তার চুক্তি ২০২৮ মৌসুম পর্যন্ত রয়েছে।
দীর্ঘ অপেক্ষা, হতাশা, সমালোচনা আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপসহ একাধিক আন্তর্জাতিক শিরোপা—সব মিলিয়ে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলো এক বর্ণাঢ্য ফুটবলযাত্রার মধ্য দিয়ে।
স্পোর্টস ডেস্ক 














