দ্বাদশ পর্ব
বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে দ্বিতীয় চিঠি
কাজী নজরুলের সমাধি ফলকে লিখিত কাব্যাংশের এই পত্রে কবি কাল-এর চিরন্তন রূপ ও প্রেমের প্রবিধ রূপের বর্ণনা দিয়েছেন। এখানে সংগীত বিষয়ে রয়েছে অতৃপ্ত বাসনার বিবৃতি। এবং সবশেষে নজেরুলের স্বভাবজাত প্রকৃতি প্রেমের অপার নিদর্শন। দূর প্রবাসে বা বন্দি অবস্থায় থেকে চেনা মানুষ, পরিবার ও শৈশবের প্রকৃতির প্রতি তীব্র ব্যাকুলতা। এটি একাধারে প্রিয়জনের প্রতি নিখাদ স্নেহ-উদ্বেগ, কলকাতার যান্ত্রিক জীবনের বিপরীতে গ্রামীণ প্রকৃতির রূপ আস্বাদন এবং জীবনের শেষ অধ্যায়ের এক গভীর আত্মোপলব্ধির চমৎকার উপস্থাপনা। পত্রটি ৪-২-৯ তারিখে তথা ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯ সালে লিখিত।
81 Pan Bagan Lane
Calcutta
4-2-9
চিরআয়ুষ্মতীসু!
ভাই নাহার! কাল ঠাকুরগাঁ (দিনাজপুর) থেকে এসে তোমার চিঠি পেলাম। পেয়ে যেমন খুশি হলাম, তেমনি একটু অবাকও হলাম। খুশি হলাম তার কারণ, আমি তোমায় চিঠি দিইনি এসে, দিয়েছি বাহারকে। অসম্ভাবিতের দেখা সকলের মনেই একটু দোলা দেয় বই-কি! অবাক হলাম, আমাদের দেশে, বিশেষ করে আমাদের সমাজের কোন কোন বিবাহিতা মেয়ে একজন অনাত্মীয়কে (আমি রক্তের সম্পর্কের কথা বলছি ভাই, রেগো না যেন এ কথাটাতে) চিঠি লিখতে সাহস করে, তা সে যতো সহজ চিঠিই হোক। তাছাড়া, তুমি স্বভাবতই একটু অতিরিক্তshy বা timid।
সত্যি বলতে কি, তোমার চিঠি পেয়ে বড্ড বেশি আনন্দিত হয়েছি। সলিম কি ফিরেছে? ওরা অর্থাৎ বাহার, সলিম কখন আসবে কলকাতায়?
সাতই তারিখে চিঠি দিয়েছ এবং লিখেছ ‘কালই কবিতাগুলো পাঠাব’। আজ চৌদ্দ তারিখ। আমার মনে হয় তোমার ‘কাল’ হয়তো কোন অনাগত দিনকে লক্ষ করে লিখিত হয়েছিল, যার কোন বাঁধা-ধরা তারিখ নেই!
আমি জানি তোমার শরীর কি রকম ভেঙে গেছে, এর ওপর যদি ওসব রাবিশের তোমাকেই নকল-নবিশ হতে হয় তা হলে আমার দুঃখের আর অবধি থাকবে না। একটু পড়তেই তোমার মাথা ধরে, আর লিখতে গেলে মাথা হাত-পা সবগুলো হয়তো conspiracy করে ধরবে। আমার অগতির গতি মেতু মিয়া তো আছেন। তাঁকে দিয়েই না হয় কপি করিয়ে পাঠিয়ে দাও। নইলে ফাল্গুনের কাগজে দেওয়া যাবে না।
কপি প্রেসে দিতে পারছি না লেখাগুলোর জন্যে। বাহারকে আর বলব না। আশা করি তোমায় এ-ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকব। তুমি একটু আদেশ দিয়ে মেতু মিয়া, হুক্কা মিয়া অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে এটা করিয়ে নিও।
দুপুরটা তোমার বাচ্চা-ই-সাক্কাওর জন্যে কেমন যেন উদাস ঠেকে। ঐ সময়টুকু এক মুহূর্তের জন্য সে আমায় সব ভুলিয়ে দিত। ওকে আদর জানিয়ো আমার।
নানী আম্মার কান্নার কানায় ভাটির জলের দাগ পড়েছে হয়তো এতোদিনে। ওঁকে বলো আবার জোয়ারের জন্য প্রতীক্ষা করতে। আমার সাম্পানের সব গান আজো লেখা হয়নি। আমার খেয়াপারের শেষ গান হয়তো তিনি শুনে যাবেন।
কলকাতার ঘেরা-টোপে খাঁচায় বন্দি হয়ে নব ফাল্গুনের উৎসব দেখতে পাচ্ছিনে চোখ দিয়ে, কিন্তু মন দিয়ে অনুভব করছি। নীল আকাশ তার মুখচোখ বোধ হয় একটু অতিরিক্ত ধোয়া-মোছা করছে, কেননা তার মুখে যখন তখন সাবানের ফেনা-সাদা মেঘ ফেঁপে উঠতে দেখছি। তার ফিরোজা উড়নি বনে বনে লুটিয়ে পড়ছে। মাধবি লতায় পুষ্পিত বেণী উড়ন্ত ভ্রমরের সারিতে আঁখি-পল্লব, পায়ের কাছে দিঘিভরা পদ্ম। সমস্ত মন খুশিতে বেদনায় টলমল করছে।
রোজায় বোধ হয় আর কোথাও যাচ্ছিনে। তবে বলতেও পারিনে ঠিক করে।
আম্মা কখন নোয়াখালি যাচ্ছেন হবু বউ দেখতে? ভালো দিনখন দেখে পাঠিও। মহী খুব গলা সাধছে, না? অর্থাৎ আমি চলে এলেও আমার ভূত এখনও চড়াও করে আছে?
আমার বন্ধু সিন্ধু, কর্ণফুলীর খবর তো তুমি দিতে পারবে না, তবে ‘গুবাক তরুর সারি’র খবর নিশ্চয় দিতে পারবে। ওরা যেন কত শুকিয়ে গেছে, ওদের আঁখি-পল্লবে হয়তো আজকাল একটু অতিরিক্ত শিশির ঝরে, বাতাসে হয়তো একটু বেশি করে শ্বাস ফেলে। মনের চক্ষে ওদের আমি দেখি আর কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে উঠি। তোমাদের পাড়ার ফাল্গুনী কোকিলরা হয়তো ভোরে তেমনি কোলাহল করে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। এতোদিনে হয়তো আমের শাখাগুলি মুকুলে মুকুলে নুয়ে পড়েছে, গন্ধে তোমাদের আঙিনা ভারাতুর হয়ে উঠেছে। আমি যেন এখান থেকে তার মদগন্ধ পাচ্ছি।
আমার বুক-ভরা স্নেহাশিস নাও। নানীআম্মা, আম্মা প্রভৃতিকে সালাম; অন্য সকলকে ভালোবাসা, শুভাশিস দিও। ইতি-
তোমার
‘নূরুদা’
উদ্ধৃত পত্রটি বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব সৃষ্টি। এর ভাষা, উপমা, রস ও আবেগের মেলবন্ধন সার্থক পত্র-সাহিত্যের (ঊঢ়রংঃড়ষধৎু খরঃবৎধঃঁৎব) উত্তম উদাহরণ। পত্রটি শিল্পসম্মত। সাহিত্যিক মানে উত্তীর্ণ। পত্রটির ভাষা সাবলীল, প্রাঞ্জল, ঋজুগতির। আবেগী হৃদয়ের প্রবল আকুতি পত্রটির বিশেষত্ব দিয়েছে। চিঠিটির সাহিত্যিক মান ও নান্দনিক দিক বেশ উল্লেখযোগ্য।
কাব্যিক ও চিত্ররূপময় ভাষা
নজরুল গদ্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তা পড়ার সময় চোখের সামনে ছবি ভেসে ওঠে। চিত্রকল্প অসাধারণ মানের। এই পত্রেও কবি প্রকৃতির যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত চাক্ষুষ এবং কাব্যিক। যেমন: ‘নীল আকাশ তার মুখচোখ বোধ হয় একটু অতিরিক্ত ধোয়া-মোছা করছে, কেননা তার মুখে যখন তখন সাবানের ফেনা-সাদা মেঘ ফেঁপে উঠতে দেখছি। তার ফিরোজা উড়নি বনে বনে লুটিয়ে পড়ছে। মাধবিলতায় পুষ্পিত বেণী উড়ন্ত ভ্রমরের সারিতে আঁখি-পল্লব, পায়ের কাছে দিঘিভরা পদ্ম। সমস্ত মন খুশিতে বেদনায় টলমল করছে।’
এখানে মেঘকে ‘সাবানের ফেনা’ কিংবা আকাশের নীলিমাকে ‘ফিরোজা উড়নি’র সাথে তুলনা করার মধ্যে কবির চিরপরিচিত রোমান্টিক মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বসন্তের প্রকৃতি, আমের মুকুলের গন্ধ আর কোকিলের ডাকের বর্ণনায় চিঠিটি চমৎকার গদ্য-কবিতায় রূপ নিয়েছে।
গভীর মানবিক আবেগ ও স্নেহের বহিঃপ্রকাশ
চিঠিটিতে প্রাপক ‘নাহার’ [বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ]-এর প্রতি কবির সুগভীর, অকৃত্রিম ও নিষ্কলুষ স্নেহ প্রকাশ পেয়েছে। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের প্রেক্ষাপটে একজন অনাত্মীয় বিবাহিতা নারীর চিঠি লেখার সাহসকে কবি যেমন প্রশংসা করেছেন, তেমনি তার অসুস্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ‘বাচ্চা-ই-সাক্কাও’ (সম্ভবত কোনো শিশু বা প্রিয়জন) এর প্রতি ভালোবাসা, নানী আম্মার কান্নার সান্ত্বনা, সব মিলিয়ে কবির সংবেদনশীল ও দরদী হৃদয়ের পরিচয় পাওয়া যায়।
উপমা ও রূপকের সার্থক ব্যবহার
নজরুল তার এই পত্রে রূপক ও প্রতীকের দারুণ ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে নিজের জীবন সায়াহ্ন বা নিয়তির ইঙ্গিত দিতে গিয়ে লিখেছেন: ‘আমার সাম্পানের সব গান আজো লেখা হয়নি। আমার খেয়াপারের শেষ গান হয়তো তিনি শুনে যাবেন।’
এখানে ‘সাম্পান’ বা ‘খেয়াপার’ শব্দগুলো জীবনের শেষ অধ্যায়ের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা অত্যন্ত উচ্চমানের সাহিত্যিক গাম্ভীর্য বহন করে। আবার বন্ধুদের প্রতীক হিসেবে ‘সিন্ধু’, ‘কর্ণফুলী’ কিংবা প্রকৃতির অঙ্গ হিসেবে ‘গুবাক তরুর সারি’ (সুপারি গাছ)-এর উল্লেখও মনোমুগ্ধকর। পরবর্তীতে কবি নজরুল ‘গুবাক তরুর সারি’ নামে একটি কবিতা লেখেন। এই কবিতায় তিনি পার্থিব ক্ষণকালীন ও পৃথিবী থেকে চিরকালীন বিদায়ের অসাধারণ দার্শনিক সত্য তুলে ধরেছেন। এমনকি এই কবিতার বিশেষ কয়েকটি চরণ তার সমাধি ফলকে লিখিত আছে। তা হলো-‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না।/ কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না।/– নিশ্চল নিশ্চুপ/ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।’
সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ ও রসবোধ (Wit and Humor)
চিঠির সাহিত্যিক মানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে কবির চিরচেনা রসবোধ ও হালকা রসিকতা। প্রাপকের চিঠি দিতে দেরি হওয়াকে কটাক্ষ করে লিখেছেন: ‘আমার মনে হয় তোমার ‘কাল’ হয়তো কোন অনাগত দিনকে লক্ষ্য করে লিখিত হয়েছিল, যার কোন বাঁধা-ধরা তারিখ নেই!’ কিংবা ‘মেতু মিয়া, হুক্কা মিয়া অ্যান্ড কোম্পানি’র মতো কাল্পনিক বা লৌকিক নাম ব্যবহার করে গুরুগম্ভীর পরিবেশকে কবি সহজ ও সাবলীল করে তুলেছেন।
গীতিময়তা ও সাবলীল ছন্দ
চিঠিটির বাক্যগঠন এবং শব্দের বিন্যাস অত্যন্ত সুসংহত। পড়ার সময় এর ভেতরে একটি অন্তর্নিহিত সুর বা গীতিময়তা লক্ষ্য করা যায়। কলকাতার বন্দিজীবন বনাম মফস্বল বা গ্রামের প্রকৃতির মুক্ত আবহ, এই দুই বৈপরীত্যকে কবি যেভাবে ভাষার বন্ধনে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা কেবল কাজী নজরুল ইসলামের মতো উঁচুদরের সাহিত্যিকের পক্ষেই সম্ভব।
সংক্ষেপে বলা যায়, ‘নূরুদা’ (কাজী নজরুল ইসলাম) স্বাক্ষরিত এই পত্রটি কেবল সমকালীন পারিবারিক বা সামাজিক খবরাখবরের তথ্যোৎস নয়। বরং এটি কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির এমন শৈল্পিক প্রকাশ, যা প্রকাশের লালিত্যে, স্নেহ ও আন্তরিকতায়, ভাষার ঐশ্বর্যে এবং ভাবের গভীরতায় বাংলা পত্র-সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্থায়ী ও গৌরবময় আসনের দাবিদার। এই পত্রটির সাহিত্যিক মান অত্যন্ত উচ্চ। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের পত্রের ঊর্ধ্বে। এবং বাংলা গদ্যসাহিত্যের চিঠিপত্র-ধারার একটি উৎকৃষ্ট নমুনা। লেখক যে বন্দে আলী মিয়া বা জসীমউদ্দীন-ধারার পল্লী জীবনঘনিষ্ঠ আবেগময় গদ্যের উত্তরাধিকারী, তা ভাষা ও চিত্রকল্পে স্পষ্ট। পত্রটিতে ফাল্গুনের প্রকৃতির যে বর্ণনা এসেছে তা প্রায় কবিতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। যেমন-‘আমের শাখাগুলি মুকুলে মুকুলে নুয়ে পড়েছে, গন্ধে তোমাদের আঙিনা ভারাতুর হয়ে উঠেছে।’ এখানে দৃশ্য, গন্ধ ও অনুভূতি, এই তিনটি গুণই একত্র হয়েছে। এমন জীবন্ত বর্ণনায় পাঠক চিত্রকল্পের সাথে একীভূত হয়ে শুধু দেখে না, গন্ধও অনুভব করে। আর এসব বর্ণনায় গদ্য হয়ে ওঠে পদ্য। রবীন্দ্রনাথ পদ্য ও গদ্যের পার্থক্য করতে গিয়ে বলেছেন-
‘কিন্তু বিশ্বাস করাইয়া দেওয়া এক, আর উদ্রেক করাইয়া দেওয়া স্বতন্ত্র। বিশ্বাসের শিকড় মাথায়, আর উদ্রেকের শিকড় হৃদয়ে। এইজন্য বিশ্বাস করাইবার জন্য যে ভাষা, উদ্রেক করাইবার জন্য সে ভাষা নহে। যুক্তির ভাষা গদ্য আমাদের বিশ্বাস করায়, আর কবিতার ভাষা আমাদের উদ্রেক করায়। যে-সকল কথায় যুক্তি খাটে তাহা অন্যকে বুঝানো অতিশয় সহজ; কিন্তু যাহাতে যুক্তি খাটে না, যাহা যুক্তির আইনকানুনের মধ্যে ধরা দেয় না, তাহাকে বুঝানো সহজ ব্যাপার নহে।’ সূত্র: সংগীত চিন্তা, পৃ.১৫
অর্থাৎ, ‘যুক্তির আইনকানুনের মধ্যে ধরা দেয় না’ এবং ‘কবিতার ভাষা আমাদের উদ্রেক করায়’। এই উদ্রেক করানোটাই কবিতা। তাহলে কাজী নজরুলের এই পত্রের বর্ণনা পাঠকের মনে প্রেম-প্রণয় ও চিত্রকল্পের উদ্রেক করায় সফলতার সাথে। তাই এই ধরনের পত্র নিঃসন্দেহে কাব্যিক।
স্মৃতি ও বিচ্ছেদের আবেগ
পুরো চিঠিতে এক ধরনের নস্টালজিয়া বা স্বদেশ-বিরহ কাজ করছে। ‘আমার বন্ধু সিন্ধু, কর্ণফুলীর খবর…’ ‘মনের চক্ষে ওদের আমি দেখি আর কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে উঠি।’ নদী, গাছ, কোকিল, আমের মুকুল, সবই লেখকের কাছে স্মৃতির প্রতীক। কলকাতায় অবস্থান করেও তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়-ঝর্ণা, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির মধ্যে মানসিকভাবে বাস করছেন।
বিশেষ ভাষাশৈলী ও সীমাবদ্ধতা
ভাষা একদিকে সাধুভাষার প্রভাবযুক্ত, অন্যদিকে অত্যন্ত কথ্য ও সহজ। যেমন: ‘পেয়েছি’, ‘খুশি হলাম’ ধরনের সহজ ব্যবহার। আবার ‘চিরআয়ুষ্মতীসু’, ‘স্নেহাশিস’, ‘ভারাতুর’ প্রভৃতি সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ। এই মিশ্রণ ভাষাকে একই সংগে মার্জিত ও প্রাণবন্ত করেছে। তবে ভাষাগত এই মিশ্রণবিশেষত্ব ছাড়াও সাহিত্যিক বিচারে একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো, চিঠির কিছু অংশ ব্যক্তিগত প্রসংগনির্ভর। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পরিবেশ সম্পর্কে না জানলে কিছু ইংগিত (যেমন ‘মেতু মিয়া’, ‘হুক্কা মিয়া’, ‘বাচ্চা-ই-সাক্কাও’ সলিম কি ফিরেছে?) পুরোপুরি অনুধাবন করা কঠিন। তবে ব্যক্তিগত চিঠির ক্ষেত্রে এটিকে পুরোপুরি ত্রুটি বলা যায় না।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
এই পত্রটি ব্যক্তিগত চিঠি, স্মৃতিকথামূলক গদ্য এবং কাব্যিক প্রকৃতিবর্ণনার অনন্য সংমিশ্রণ। এর প্রধান শক্তি হলো, আন্তরিক মানবিকতা, সূক্ষ্ম রসবোধ, স্বদেশ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর মমতা, এবং অসাধারণ কাব্যিক গদ্যভাষা। সাহিত্যিক মানের বিচারে এটিকে উচ্চমানের পত্রসাহিত্য বলা যায়। বিশেষ করে ফাল্গুনের প্রকৃতিবর্ণনা ও স্বদেশস্মৃতির অংশগুলো বাংলা গদ্যের শ্রেষ্ঠ কাব্যিক চিঠিগুলোর সংগে তুলনা করার মতো শক্তিশালী। [চলবে]
লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক
ড. হাফিজ রহমান 






















