নেত্রকোনার মদন উপজেলায় প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র (সাবেক ‘মুজিব কিল্লা’) দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে আশ্রয়কেন্দ্র দুটি এখন মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। কেন এসব কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে এবং কী কাজে ব্যবহৃত হবে, সে বিষয়ে অনেক এলাকাবাসীই জানেন না।
জানা গেছে, গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের বড্ডা এলাকায় ২ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৪ টাকা এবং একই ইউনিয়নের মনিকা গ্রামের সামনে ২ কোটি ২১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯৮ টাকা ব্যয়ে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এগুলো ‘মুজিব কিল্লা’ নামে পরিচিত থাকলেও পরে নাম পরিবর্তন করে দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র রাখা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই বছর আগে নির্মাণ শেষ হলেও কেন্দ্র দুটি এখনো কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। বিশাল ভবনগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে এবং ভবনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের ভেতরে ময়লা-আবর্জনা জমে রয়েছে। নিয়মিত ব্যবহার বা তদারকি না থাকায় কেন্দ্রগুলো অযত্নে পড়ে আছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ জানান, শুনেছেন বন্যার সময় মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়ের জন্য এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যালয়েই ইতোমধ্যে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র থাকায় এসব ভবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
জেলা ত্রাণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। ২০২২ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো পুরো প্রকল্প হস্তান্তর হয়নি। বড্ডা আশ্রয়কেন্দ্রের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। বন্যাকালে গবাদিপশুর আশ্রয় এবং অন্যান্য সময়ে সামাজিক কাজে ব্যবহারের লক্ষ্যেই কেন্দ্র দুটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নির্মাণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানো হয়নি। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে এগুলো কোনো কাজে ব্যবহার না হওয়ায় সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গোবিন্দশ্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাইদুল ইসলাম খান মামুন বলেন, “আশ্রয়কেন্দ্র দুটি ইউনিয়ন পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হলে নিরাপত্তার জন্য গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়া যেত। আমি শুনেছি বড্ডা আশ্রয়কেন্দ্রে মাদকসেবন ও জুয়া হয়।”
নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আবু হানিফ বলেন, “বড্ডা আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ প্রায় দুই বছর আগে শেষ হলেও এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটি গ্রহণ করেনি।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, “মনিকা আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ শেষ হয়েছে। তবে বড্ডা আশ্রয়কেন্দ্রের কিছু কাজ বাকি থাকায় এখনো কোনো কেন্দ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি। কেন্দ্রগুলো ব্যবহার নিশ্চিত করতে পাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সেখানে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করছি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে আগে অবগত ছিলাম না। জেলা প্রশাসক ও জেলা ত্রাণ কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাওরাঞ্চলের জন্য দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মুহাম্মদ রহুল আমিন বলেন, “আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর তদারকির দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার। দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয় নেওয়ার জন্যই এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো মাদকসেবন বা জুয়া খেলার জন্য নয়। স্থানীয়দেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘মুজিব কিল্লা’র নাম পরিবর্তন করে দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র করেছে।
মদন (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি 



















