১০:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতির তদন্তে নান্দাইলে শিক্ষা কর্মকর্তা, স্কুল ফাঁকি দিয়ে ডাকা হলো পছন্দের শিক্ষকদের

 

ময়মনসিংহের নান্দাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নছার দুর্নীতির তদন্ত প্রভাবিত করতে স্কুল চলাকালীন শিক্ষকদের ডেকে এনে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে অর্থ আত্মসাৎসহ একাধিক অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

 

তদন্ত চলাকালীন সময়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে শিক্ষক নেতারা ছাড়াও উপস্থিত রয়েছেন খোদ অভিযুক্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছা।

 

এ সময় কক্ষের ভেতরে শিক্ষকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়। সেখানে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, খোদ অভিযুক্ত কর্মকর্তার সামনে বসে লিখিত অভিযোগের বিপরীতে জবানবন্দি দিতে হচ্ছে। অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা নিজে উপস্থিত থেকে দেখছেন কে কী জবাব দিচ্ছেন! এমন পরিস্থিতিতে সাক্ষীরা চরম অস্বস্তি ও ভীতিতে ভুগছেন এবং স্বাধীনভাবে সত্য কথা বলতে ইতস্তত করছেন।

 

অনেকেই তদন্ত কর্মকর্তার সামনেই সাদা কাগজে লিখিত জবাব দিচ্ছেন, যা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন খোদ অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা। ফলে এই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

সকাল থেকেই নান্দাইল উপজেলা শিক্ষা অফিসের ভেতরে ও বাইরে শতাধিক শিক্ষকের ভিড় জমতে দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নছার মৌখিক নির্দেশে তাঁর অনুসারী ও পছন্দের শিক্ষকরা বিদ্যালয় চালু রেখেই সদরে ছুটে আসেন। বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত শিক্ষকদের এই জটলা ও ভিড় লক্ষ করা গেছে।

 

কয়েকজন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “টিও (শিক্ষা কর্মকর্তা) স্যার আমাদের আসতে বলেছেন, তাই আসতে হয়েছে। স্যারের বিরুদ্ধে যে তদন্ত হচ্ছে, আমরা তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। তিনি খুব ভালো মানুষ, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।”

 

চলমান স্কুল রেখে এভাবে চলে আসায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এক প্রধান শিক্ষক অজুহাত দেখিয়ে বলেন, “যেহেতু মাস শেষ, তাই সদরের ব্যাংক থেকে বেতন তুলতে এসেছি। সেই সঙ্গে অফিসেও আসা হলো।”

 

তবে সচেতন মহল ও অভিভাবকদের দাবি, তদন্তের দিনে এভাবে দল বেঁধে এসে শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে সাফাই গাওয়া এবং স্কুল ফাঁকি দেওয়া সম্পূর্ণ নীতিবহির্ভূত।

 

নান্দাইল উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম আনজু বলেন, “এভাবে শিক্ষকরা দল বেঁধে আসা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। যতদূর জানতে পেরেছি, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তকে প্রভাবিত ও আড়াল করতেই নিজের পছন্দের শিক্ষকদের ডেকে এনে এই মহড়ার আয়োজন করেছেন।”

 

অন্য এক শিক্ষক নেতা জাকির আহম্মেদ তুহিন জানান, শিক্ষা কর্মকর্তা নিজে তাঁকে একটু আসার জন্য অনুরোধ করায় তিনি এসেছিলেন। তবে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি চলে যাচ্ছেন (বিকেল পৌনে ৩টা)।

 

তদন্তকারী কর্মকর্তা মজিব আলমের কাছে স্কুল চলাকালীন শিক্ষকদের এই জমায়েত এবং তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, সকল তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখে অধিদপ্তরে দ্রুতই নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তাছাড়া আমার তদন্তে শুধু প্রয়োজন ছিল ১৫টি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের। বাকিরা কেন এসেছেন, তা জানা নেই!

 

যা ছিল অভিযোগে: গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জারি করা এক অফিস বিজ্ঞপ্তির সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নগর কচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আজিজুন্নাহার বাদী হয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নছার বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

 

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দের মেরামত ও সংস্কার খাতের টাকা আত্মসাৎ, উপজেলা শিক্ষা অফিসের মেরামত ও আসবাবপত্র সরবরাহ বাবদ বরাদ্দ থেকে অর্থ লোপাট, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে টাকা আত্মসাৎ, উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে আঁতাত করে অবৈধ বিল উত্তোলন, বদলি নীতিমালার বাইরে শিক্ষক বদলি এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের সাময়িক সংযুক্তি প্রদান। এছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষা অফিসারের কক্ষে এসি লাগানোসহ আরও বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে।

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

ময়মনসিংহে যাত্রীবাহী দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত ৩

সরিষাবাড়ীতে দুদকের সততা স্টোর উদ্বোধন ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

01 September 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

দুর্নীতির তদন্তে নান্দাইলে শিক্ষা কর্মকর্তা, স্কুল ফাঁকি দিয়ে ডাকা হলো পছন্দের শিক্ষকদের

পোষ্টের সময় : ০৭:০৯:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

ময়মনসিংহের নান্দাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নছার দুর্নীতির তদন্ত প্রভাবিত করতে স্কুল চলাকালীন শিক্ষকদের ডেকে এনে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে অর্থ আত্মসাৎসহ একাধিক অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

 

তদন্ত চলাকালীন সময়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে শিক্ষক নেতারা ছাড়াও উপস্থিত রয়েছেন খোদ অভিযুক্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছা।

 

এ সময় কক্ষের ভেতরে শিক্ষকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়। সেখানে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, খোদ অভিযুক্ত কর্মকর্তার সামনে বসে লিখিত অভিযোগের বিপরীতে জবানবন্দি দিতে হচ্ছে। অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা নিজে উপস্থিত থেকে দেখছেন কে কী জবাব দিচ্ছেন! এমন পরিস্থিতিতে সাক্ষীরা চরম অস্বস্তি ও ভীতিতে ভুগছেন এবং স্বাধীনভাবে সত্য কথা বলতে ইতস্তত করছেন।

 

অনেকেই তদন্ত কর্মকর্তার সামনেই সাদা কাগজে লিখিত জবাব দিচ্ছেন, যা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন খোদ অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা। ফলে এই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

সকাল থেকেই নান্দাইল উপজেলা শিক্ষা অফিসের ভেতরে ও বাইরে শতাধিক শিক্ষকের ভিড় জমতে দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নছার মৌখিক নির্দেশে তাঁর অনুসারী ও পছন্দের শিক্ষকরা বিদ্যালয় চালু রেখেই সদরে ছুটে আসেন। বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত শিক্ষকদের এই জটলা ও ভিড় লক্ষ করা গেছে।

 

কয়েকজন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “টিও (শিক্ষা কর্মকর্তা) স্যার আমাদের আসতে বলেছেন, তাই আসতে হয়েছে। স্যারের বিরুদ্ধে যে তদন্ত হচ্ছে, আমরা তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। তিনি খুব ভালো মানুষ, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।”

 

চলমান স্কুল রেখে এভাবে চলে আসায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এক প্রধান শিক্ষক অজুহাত দেখিয়ে বলেন, “যেহেতু মাস শেষ, তাই সদরের ব্যাংক থেকে বেতন তুলতে এসেছি। সেই সঙ্গে অফিসেও আসা হলো।”

 

তবে সচেতন মহল ও অভিভাবকদের দাবি, তদন্তের দিনে এভাবে দল বেঁধে এসে শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে সাফাই গাওয়া এবং স্কুল ফাঁকি দেওয়া সম্পূর্ণ নীতিবহির্ভূত।

 

নান্দাইল উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম আনজু বলেন, “এভাবে শিক্ষকরা দল বেঁধে আসা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। যতদূর জানতে পেরেছি, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তকে প্রভাবিত ও আড়াল করতেই নিজের পছন্দের শিক্ষকদের ডেকে এনে এই মহড়ার আয়োজন করেছেন।”

 

অন্য এক শিক্ষক নেতা জাকির আহম্মেদ তুহিন জানান, শিক্ষা কর্মকর্তা নিজে তাঁকে একটু আসার জন্য অনুরোধ করায় তিনি এসেছিলেন। তবে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি চলে যাচ্ছেন (বিকেল পৌনে ৩টা)।

 

তদন্তকারী কর্মকর্তা মজিব আলমের কাছে স্কুল চলাকালীন শিক্ষকদের এই জমায়েত এবং তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, সকল তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখে অধিদপ্তরে দ্রুতই নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তাছাড়া আমার তদন্তে শুধু প্রয়োজন ছিল ১৫টি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের। বাকিরা কেন এসেছেন, তা জানা নেই!

 

যা ছিল অভিযোগে: গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জারি করা এক অফিস বিজ্ঞপ্তির সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নগর কচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আজিজুন্নাহার বাদী হয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নছার বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

 

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দের মেরামত ও সংস্কার খাতের টাকা আত্মসাৎ, উপজেলা শিক্ষা অফিসের মেরামত ও আসবাবপত্র সরবরাহ বাবদ বরাদ্দ থেকে অর্থ লোপাট, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে টাকা আত্মসাৎ, উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে আঁতাত করে অবৈধ বিল উত্তোলন, বদলি নীতিমালার বাইরে শিক্ষক বদলি এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের সাময়িক সংযুক্তি প্রদান। এছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষা অফিসারের কক্ষে এসি লাগানোসহ আরও বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে।

 

Share this news as a Photo Card