প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপরই একজন গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধানের সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা। তাই নিরাপত্তার ঘেরাটোপ যেন সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়। তিনি এ বিষয়ে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সকে (এসএসএফ) বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে এসএসএফের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ থেকে ৪০ বছর আগে সময়ের প্রয়োজনে এই বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তন করে ‘এসএসএফ’ নামে বাহিনীটির যাত্রা শুরু হয়। একই সঙ্গে এর দায়িত্বের পরিধিও বাড়ে।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন কিংবা বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের সবাইকে তিনি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানান।
তারেক রহমান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিভিন্ন মেয়াদে সরকারপ্রধান থাকাকালে এবং জীবনের শেষ সময়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এসএসএফ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জানাজার নামাজ আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে এসএসএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এজন্য তিনি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে এসএসএফকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি জানান, সরকারপ্রধান হিসেবে বর্তমানে প্রতিদিন ও প্রতি মুহূর্তে তিনি এসএসএফের কার্যক্রম সরাসরি প্রত্যক্ষ করছেন। তবে এসএসএফের কার্যক্রমের সঙ্গে তার পরিচয় নতুন নয়। খালেদা জিয়া যখন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন থেকেই অর্থাৎ তার তরুণ বয়স থেকেই তিনি এসএসএফের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত।
তিনি আরও বলেন, এসএসএফ প্রতিষ্ঠার সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের অনেক পার্থক্য রয়েছে। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকাশের ফলে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা জরুরি। একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে সাহস, দক্ষতা, কৌশল ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে এসএসএফের পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিএনপি জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব পালন করছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী সরকারপ্রধানের জন্য এসএসএফ সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে জনগণের দুর্ভোগ লাঘব এবং সড়কে যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আমি নিজের গাড়িবহরের আকার সীমিত করেছি। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে এসএসএফকে দক্ষতা ও নিরাপত্তা কৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। এ দায়িত্ব তারা সুন্দরভাবে পালন করছে।
তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে রাজধানী ঢাকা ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন জনসভা ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়। ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিছুটা জটিল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখার পাশাপাশি নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার মধ্যেও ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ও সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে এসএসএফের কর্মদক্ষতা প্রতিভাত হয়ে ওঠে।
এসএসএফের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে নিজের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারপ্রধান হিসেবে জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপরই তার সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা। তাই নিরাপত্তার কারণে সরকারপ্রধান যেন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়েন, সে বিষয়ে একটি পরিশীলিত বাহিনী হিসেবে এসএসএফকে বিশেষভাবে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি বলেন, কিছুক্ষণ আগেই তিনি এসএসএফের নবনির্মিত অত্যাধুনিক ফায়ারিং রেঞ্জ উদ্বোধন করেছেন এবং উদ্বোধনী মহড়াও প্রত্যক্ষ করেছেন। পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে এই ফায়ারিং রেঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন এবং পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে এই স্থাপনার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০২ সালের পর এসএসএফের ‘রেড বুক’ সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পুনরায় সংস্কার করে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করা হয়েছে। এই ‘রেড বুক’ এসএসএফের কার্যপদ্ধতি ও কর্মপদ্ধতির নীতিমালা প্রদানের পাশাপাশি আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছে।
তিনি সদস্যদের ‘রেড বুক’-এ উল্লেখিত নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, এসএসএফের মতো বিশেষায়িত বাহিনীর জন্য আধুনিক নিরাপত্তা কৌশল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্যের সাহস, সততা, বিশ্বস্ততা, সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, নিয়মানুবর্তিতা এবং সর্বোপরি ‘চেইন অব কমান্ড’ কঠোরভাবে অনুসরণ করা অপরিহার্য।
রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং দেশে-বিদেশে রাষ্ট্রঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে দেশের অন্যান্য নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই এসএসএফকে নিরাপত্তা কৌশল নিশ্চিত করতে হয়। সমন্বয় যত দক্ষতার সঙ্গে করা যায়, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও তত বেশি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের বাছাই করে এসএসএফ গঠন করা হয়। এরপর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বিষয়ে দেশে-বিদেশে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএসএফকে আরও কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জনগণ যেন কোনো ধরনের দুর্ব্যবহারের শিকার না হয়, সেদিকেও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি ।

স্টাফ রিপোর্টার 























