বাংলাদেশে বিদ্যুতের সংকট দেখা দিলেই তার জন্য কোনো একটি দৃশ্যমান খাতকে দায়ী করার প্রবণতা নতুন নয়। কখনো শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, কখনো সেচ, কখনো শিল্পকারখানা আর এবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও ইজিবাইক। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, এসব যানবাহন বিশেষত রাতের বেলায় চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণও হচ্ছে, মধ্যরাতের পর যে পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়ার কথা, তা আগের মতো কমছে না। এ পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার। তবে একই সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–দেশে কতটি ব্যাটারিচালিত যান আছে, এগুলো প্রতিদিন মোট কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, কোথায় এবং কোন সময়ে চার্জ হয়, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য কি আমাদের হাতে আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কোথাও বলা হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ, কোথাও আবার প্রায় ৬০ লাখ। বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনুমানেও বড় ব্যবধান আছে। কোনো একটি খাতকে জাতীয় বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাই সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত বাস্তব তথ্য সংগ্রহ। কতগুলো গাড়ি বৈধভাবে চার্জ হয়, কতগুলো অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে, চার্জিংয়ের সময়ভিত্তিক লোড কত এবং কোন অঞ্চলে এই চাপ বেশি–এসব না জেনে শুধু সামগ্রিক অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে তা নীতিনির্ধারণকে সহজ করার বদলে আরও বিভ্রান্ত করতে পারে।
এই আলোচনায় বিদ্যুতের একক নিয়েও কিছু বিভ্রান্তি দেখা যায়। মেগাওয়াট কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে বিদ্যুতের ক্ষমতা বা লোড নির্দেশ করে, আর মেগাওয়াট-ঘণ্টা নির্দেশ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ। ফলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব করতে হলে শুধু গাড়ির সংখ্যা বা ব্যাটারির ধারণক্ষমতা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি গাড়ি প্রতিদিন কত দূর চলে, ব্যাটারি কতটা ডিসচার্জ হয়, ব্যাটারির বয়স কত, চার্জারের দক্ষতা কেমন এবং চার্জিংয়ে কত ক্ষয় হয়–এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়। নামমাত্র ব্যাটারি ধারণক্ষমতাকে সরাসরি গাড়ির সংখ্যা দিয়ে গুণ করলেই প্রকৃত জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার বেরিয়ে আসে না।
তবে এটাও সত্য যে অটোরিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহারকে একেবারে তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই। যদি লাখ লাখ গাড়ি একই সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে রাত ১০টা বা ১১টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চার্জে বসে, তাহলে মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টায় তা উল্লেখযোগ্য লোড তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এখানে শুধু কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কখন ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের সময়ভিত্তিক চাপ বাস্তব সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এখান থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না যে দেশের বর্তমান লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণই অটোরিকশা।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের কাঠামোগত কারণ অনেক গভীর। দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রকৃত সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হলেও সেই সক্ষমতার সবটুকু প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা যায় না। কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে গ্যাস, কয়লা, তেল বা অন্যান্য জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানি করা জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট উৎপাদনকে প্রভাবিত করেছে। ফলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা মানেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল থাকলে উৎপাদনক্ষমতার বড় অংশ কাগজে থেকে যেতে পারে।
এখানেই অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ককে বৃহত্তর জ্বালানি নীতির সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। যদি সত্যিই অটোরিকশা চার্জিং রাতের বিদ্যুৎ চাহিদায় উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করে, তাহলে তার সমাধান হতে পারে চার্জিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু একটি বৃহত্তর জ্বালানি সংকটকে অটোরিকশার ওপর চাপিয়ে দিলে মূল সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা এবং দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো। এসব প্রশ্নের সমাধান না করে কেবল ব্যাটারিচালিত যান কমিয়ে দিলে সামগ্রিক সংকটের খুব সামান্য অংশই হয়তো মোকাবিলা করা যাবে।
অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে শুধু বিদ্যুতের ভোক্তা হিসেবে দেখলেও পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। এই যানগুলো বাংলাদেশের শহর, মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকার পরিবহন কাঠামোর একটি বড় শূন্যস্থান পূরণ করেছে। বহু জায়গায় পর্যাপ্ত বাস নেই, নির্ভরযোগ্য স্থানীয় গণপরিবহন নেই, প্রধান সড়ক থেকে পাড়া-মহল্লা বা গ্রামের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাতায়াতের কোনো সংগঠিত ব্যবস্থা নেই। এই শূন্যতার মধ্যে সাধারণ মানুষই নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বাজার তৈরি করেছে। ফলে এটি নিছক একটি যানবাহনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জীবিকা, যাতায়াত, স্থানীয় অর্থনীতি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন গতিশীলতা জড়িত।
লাখ লাখ মানুষ এই খাতে চালক, মালিক, মেকানিক, ব্যাটারি ব্যবসায়ী, গ্যারেজকর্মী বা যন্ত্রাংশ বিক্রেতা হিসেবে কাজ করছেন। আরও বড় একটি জনগোষ্ঠী প্রতিদিন এসব যান ব্যবহার করে কর্মস্থল, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াত করে। তাই কোনো বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি না করে হঠাৎ করে এই যানবাহন বন্ধ করার নীতি বাস্তবসম্মত হবে না। শহর ও মফস্বলে যেখানে বৃহৎ গণপরিবহন পৌঁছায় না, সেখানে এই যানগুলোকে ‘ফিডার ট্রান্সপোর্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রধান সড়কে বাস বা অন্য উচ্চক্ষমতার গণপরিবহন চলবে, আর স্থানীয় রাস্তায় কম গতির বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান মানুষকে প্রধান পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে। নীতি যদি এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে একটি বিশৃঙ্খল খাতকে কার্যকর নগর ও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থার অংশে রূপ দেওয়া সম্ভব।
তবে অটোরিকশার সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে এর ঝুঁকিগুলো অস্বীকার করতে হবে। দেশে চলাচলকারী অনেক ব্যাটারিচালিত রিকশা এমন কাঠামোর ওপর তৈরি, যা মূলত প্যাডেলচালিত রিকশার জন্য নকশা করা হয়েছিল। পরে তাতে মোটর ও ভারী ব্যাটারি বসানো হয়েছে। ফলে গাড়ির ওজন ও গতি বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ব্রেকিং ব্যবস্থা, চাকা, সাসপেনশন বা কাঠামোগত স্থিতিশীলতা সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি। প্রশিক্ষণবিহীন চালক, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনির্ধারিত রুট এবং মহাসড়কে ধীরগতির গাড়ির চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলো বাস্তব সমস্যা এবং এগুলোর সমাধান অবশ্যই প্রয়োজন।
কিন্তু এখানেও নিষেধাজ্ঞার চেয়ে মান নিয়ন্ত্রণ বেশি কার্যকর হতে পারে। প্রতিটি গাড়ির জন্য নিরাপদ জাতীয় নকশা নির্ধারণ করা দরকার। সর্বোচ্চ গতি, ব্রেকিং সক্ষমতা, গাড়ির প্রস্থ, ওজন, যাত্রী ধারণক্ষমতা, আলো, সংকেতব্যবস্থা এবং ব্যাটারি বসানোর পদ্ধতি নিয়ে বাধ্যতামূলক মান থাকতে হবে। চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স থাকতে হবে। মহাসড়ক ও দ্রুতগতির প্রধান সড়কে এসব গাড়ির চলাচল সীমিত করা যেতে পারে, কিন্তু স্থানীয় ও ফিডার রুট আইনগতভাবে নির্ধারণ করা উচিত। এতে একদিকে দুর্ঘটনা কমবে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় একটি পরিবহনব্যবস্থাও টিকে থাকবে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি অটোরিকশা খাতের পরিবেশগত ঝুঁকিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। দেশে অধিকাংশ ইজিবাইকে এখনো লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। এসব ব্যাটারির অনিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ থেকে সীসা দূষণ মাটি, পানি এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করতে পারে। ফলে ব্যাটারিচালিত যান চলাচলের সময় ধোঁয়া না ছাড়লেও তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবেশবান্ধব বলা যায় না। যদি ব্যবহৃত ব্যাটারি অনানুষ্ঠানিক কারখানায় ভেঙে সীসা পুনরুদ্ধার করা হয়, তাহলে সেই পরিবেশগত মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই দিতে হয়।
এই কারণে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাকে অটোরিকশা নীতির একটি কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে। যে কোম্পানি ব্যাটারি উৎপাদন বা আমদানি করবে, ব্যবহারের শেষে সেই ব্যাটারি সংগ্রহ ও নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বও তার ওপর দেওয়া যেতে পারে। নিবন্ধিত রিসাইক্লিং কেন্দ্র তৈরি করতে হবে এবং অনিরাপদ লিড গলানোর কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর ও নিরাপদ ব্যাটারি প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য কর, শুল্ক ও অর্থায়নে নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তর যেন বর্তমান চালকদের ওপর এমন ব্যয় চাপিয়ে না দেয়, যা তাদের জীবিকা হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অটোরিকশাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা অবশ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেই। লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত যানকে কেবল অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা হিসেবে না দেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি সম্ভাব্য বাজার হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। অথচ অধিকাংশ অটোরিকশা রাতে গ্রিড থেকে চার্জ নেয়। চার্জিং স্টেশনগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং এবং স্মার্ট চার্জিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এই চিত্র বদলাতে পারে।
বড় গ্যারেজ, পেট্রলপাম্প, এলপিজি স্টেশন, বাস টার্মিনাল, পৌরসভা, বাজার বা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই বিদ্যুতের একটি অংশ সরাসরি ব্যাটারি চার্জে ব্যবহার হতে পারে, আর অতিরিক্ত অংশ গ্রিডে দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ ট্যারিফ চালু হলে চার্জিংয়ের বড় অংশ অফ-পিক সময়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। স্মার্ট মিটার ব্যবহার করলে কোথায় কত বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কখন যাচ্ছে এবং কোনো এলাকায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে কি না–তা বিদ্যুৎ বিভাগ সরাসরি জানতে পারবে।
এটি অবৈধ সংযোগের সমস্যাও অনেকটাই কমাতে পারে। বর্তমানে বহু অটোরিকশা গ্যারেজের চার্জিং ব্যবস্থা অনানুষ্ঠানিক বা অনিয়ন্ত্রিত। কিন্তু যদি সরকার সহজ শর্তে বৈধ বাণিজ্যিক চার্জিং সংযোগ দেয়, আলাদা ট্যারিফ নির্ধারণ করে এবং নিবন্ধিত গ্যারেজকে স্মার্ট মিটারের আওতায় আনে, তাহলে বিদ্যুৎ চুরির প্রণোদনা কমবে। একই সঙ্গে কোন খাত কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে অনুমানের বদলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। তখন অটোরিকশা সত্যিই বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কতটা চাপ তৈরি করছে, সেটিও নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব হবে।
‘অবৈধ অটোরিকশা’ কথাটিও তাই কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। যদি বছরের পর বছর লাখ লাখ যান বাজারে চলতে পারে, তাদের মোটর, কন্ট্রোলার ও ব্যাটারি আমদানি ও বিক্রি হয়, গ্যারেজ গড়ে ওঠে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের চোখের সামনেই পুরো অর্থনীতি বিস্তৃত হয়, তাহলে এর দায় শুধু চালকের ওপর চাপানো যায় না। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, গ্যারেজ মালিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ভূমিকাও বিবেচনায় নিতে হবে। রাষ্ট্র কোনো খাতকে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে দিলে পরে সেই খাতের সবচেয়ে দরিদ্র অংশকে ‘অবৈধ’ বলে সরিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নীতি হতে পারে না।
তাই এখন প্রয়োজন নিষেধের বদলে রূপান্তরের নীতি। প্রথমে একটি জাতীয় ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে কত গাড়ি আছে, কোথায় চলে, কার মালিকানায়, কোন ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করে এবং কোথায় চার্জ হয়—এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এরপর নিরাপদ নকশা, রুট পারমিট, চালকের লাইসেন্স, ফিটনেস পরীক্ষা এবং বৈধ চার্জিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বড় চার্জিং স্টেশনে স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক করা হলে কয়েক মাসের মধ্যেই জাতীয় অটোরিকশা চার্জিং লোডের বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে। তার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট এলাকায় চার্জিং সময় ভাগ করে দেওয়া, অফ-পিক ট্যারিফ চালু করা বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের শর্ত নির্ধারণ করা সম্ভব।
এই প্রক্রিয়ায় অটোরিকশা খাতকে কর ও আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায়ও আনা যাবে। বর্তমানে একটি বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেকটাই অনানুষ্ঠানিকভাবে চলছে। নিবন্ধন, লাইসেন্স ও বৈধ চার্জিংয়ের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব পেতে পারে, চালক ও মালিক আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন এবং যাত্রীরাও অধিক নিরাপদ পরিবহন সেবা পেতে পারেন। একই সঙ্গে পরিবহন পরিকল্পনাকারীদের হাতে প্রকৃত ডেটা থাকবে–কোন এলাকায় কত গাড়ি প্রয়োজন, কোথায় বাসের ঘাটতি বেশি এবং কোথায় বিকল্প গণপরিবহন বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কোনো সুপরিকল্পিত পরিবহন নীতির ফল নয়। বরং বহু বছরের গণপরিবহন ঘাটতি, স্বল্প আয়ের মানুষের চলাচলের প্রয়োজন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ মিলিয়ে এটি তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যে বিশৃঙ্খলা আছে, নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার আছে এবং ব্যাটারি দূষণের ভয়াবহ সম্ভাবনাও আছে। একই সঙ্গে এর মধ্যে কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী পরিবহন, বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের বিস্তার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগও রয়েছে।
নীতির কাজ হওয়া উচিত এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে দেখা। সমস্যার জন্য শুধু দরিদ্র চালককে দায়ী করলে বিদ্যুৎ সংকট কমবে না, সড়কও নিরাপদ হবে না। বরং অটোরিকশাকে নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ রুট, বৈধ মিটার, সময়ভিত্তিক চার্জিং, সৌরবিদ্যুৎ এবং পরিবেশসম্মত ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ সংকটের গভীর কারণ জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানিনির্ভরতা, উৎপাদন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ধীর অগ্রগতি–এসব নিয়েও সমান গুরুত্বে কাজ করতে হবে।
অটোরিকশাকে বিদ্যুৎ সংকটের প্রতীক বানানো সহজ। কিন্তু একটি জটিল জ্বালানি ও পরিবহন সংকটের সহজ শত্রু তৈরি করলে নীতিগত সমাধান পাওয়া যায় না। বরং এই অনিয়ন্ত্রিত খাতটিকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন বৈদ্যুতিক পরিবহনের অংশে রূপান্তর করার সুযোগ এখনো আমাদের হাতে আছে। রাষ্ট্র যদি সেই সুযোগ নেয়, তাহলে আজ যে অটোরিকশাকে সমস্যার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই বাংলাদেশের স্থানীয় গণপরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: রেবেকা সুলতানা, নির্বাহী পরিচালক, অন্যচিত্র ফাউন্ডেশন ও সদস্য, বিডাব্লিউজিইডি
রেবেকা সুলতানা 

























