প্রতিদিন ভোরে উঠে অফিসে ছুটে যাওয়া মানুষগুলোকে কি দেখেছেন কখনও? হাতে পুরনো ব্যাগ, কাঁধে দায়িত্বের ভার, চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া-তারা আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় পরিশ্রমী শ্রেণি: আউটসোর্সিং কর্মচারী।
অফিসে ঢোকে, কাজ করে, রিপোর্ট জমা দেয়, বসের নির্দেশ পালন করে-কিন্তু দিনের শেষে তাদের পরিচয় শুধু এই: “আপনি তো আমাদের কর্মী নন, আপনি তো কনট্রাক্টরের লোক।” এক বাক্য তাদের সমস্ত অবদানকে মুছে দেয় মুহূর্তে।
কাজে পরিশ্রম, তবু পরিচয়ে বঞ্চনা আউটসোর্সিং কর্মচারীরা ফ্রন্ট ডেস্ক সামলায়, কাস্টমার কেয়ার চালায়, ডেটা এন্ট্রি করে, অফিস ফাইল ঘাঁটে-সব কাজই তাদের হাতে ঘোরে। কিন্তু প্রণোদনা, বোনাস বা প্রমোশনের কথা এলে তারা যেন অচেনা মানুষ। একই টেবিলে বসা দুই সহকর্মীর মধ্যে একজন স্থায়ী, আরেকজন আউটসোর্সড। কাজের চাপ এক, কিন্তু বেতন, সুযোগ, সম্মান-সব আলাদা। এ যেন এক অদৃশ্য দেয়াল, যা প্রতিদিন তাদের মনে কাঁটার মতো লাগে।
অস্থিরতার নামেই বেঁচে থাকা পরের মাসে চাকরি থাকবে কি না-এটাই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। চুক্তি শেষ হলে নতুন করে কন্ট্রাক্ট হবে কিনা, সেটা নিয়েই দুশ্চিন্তা। কেউ কেউ তিন বা পাঁচ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও জানে না-আগামী সপ্তাহে হয়তো কার্ড বন্ধ হয়ে যাবে। চাকরিটা হারালে শুধু বেকারত্ব নয়, নিজের অস্তিত্ব হারানোর ভয়।
ঠিকাদারের লাভ, কর্মচারীর কান্না এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে লাভবান হয় ঠিকাদার। প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আসে, কর্মচারীর হাতে পৌঁছায় অর্ধেক বা তারও কম। ঘামের দাম, পরিশ্রমের মর্যাদা, প্রাপ্য সম্মান-সব হারিয়ে যায় মাঝপথে। প্রতিবাদ করতে পারেন না, কারণ চাকরি যাওয়ার ভয়ে মুখ বন্ধ থাকে। এ এক নিঃশব্দ শোষণ, যার আওয়াজ বোর্ডরুমেও, সংবাদেও শুনা যায় না।
প্রতিষ্ঠানের স্বস্তি, কর্মচারীর বেদনা আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বপ্নের সমাধান। না দিতে হয় বোনাস, না নিতে হয় দায়। কাজ বেশি হলে কর্মী বাড়ানো হয়, কম হলে ছাঁটাই-একটি কাগজের নোটিশেই শেষ গল্প। কিন্তু এই স্বস্তির পেছনে হাজার মানুষের নিঃশব্দ বেদনা লুকিয়ে আছে। অফিসে আসে ঠিক সময়মতো, কিন্তু জানে-এই অফিস কখনও তাদের হবে না। চেয়ার আছে, কিন্তু তাদের নামে নয়।
তবু তারা লড়ে যায় অদ্ভুত বিষয় হলো-এরা হারে না। স্থায়িত্ব নেই, তবু প্রতিদিন নতুন করে শুরু করে। প্রমোশন হবে না, তবু নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে। স্বপ্ন খুব ছোট-সময়মতো বেতন, একটু সম্মান, আর একটি স্থায়ী ঠিকানা। এরা সমাজের অবহেলিত নায়ক-নিজের স্বপ্ন ছেড়ে অন্যের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে। প্রমাণ করে, চাকরি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু মানবিক দায়িত্ব কখনও সাময়িক নয়।
পরিবর্তনের সময় এখনই আউটসোর্সিং নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়-এটি আধুনিক শ্রমবাজারের অংশ। কিন্তু এটি মানবিক করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সচেতনতা। সরকার চাইলে আইন করে ন্যূনতম বেতন, ছুটি, চিকিৎসা ভাতা ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। প্রতিষ্ঠান চাইলে “বাইরের লোক” না ভেবে “দলের অংশ” হিসেবে মর্যাদা দিতে পারে। এবং সমাজ চাইলে তাদের প্রতি সেই সম্মান দেখাতে পারে, যা প্রত্যেক পরিশ্রমী মানুষের প্রাপ্য।
ইদানীং আমরা দেখছি ঢাকা শহরে আউটসোর্সিং কর্মচারীরা আন্দোলন করছে, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এটি শুধু শ্রমিকদের স্বার্থ নয়, এটি সামাজিক ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। সরকারের অবশ্যই তাদের কথা শোনা উচিত। কারণ মানুষ শুধু সংখ্যার হিসাব নয়-তাদেরও পরিবার, সন্তান, স্বপ্ন আছে। তারা চায় বিলাসিতা নয়, চায় নিরাপত্তা ও সম্মান।
একদিন নিশ্চয়ই সেই দিন আসবে, যখন কোনো আউটসোর্সিং কর্মচারী ভয়ে নয়, গর্বে বলবে- “আমি কাজ করি, তাই আমি আছি।” আর তখনই আমরা সত্যিকারের মানবিক সমাজের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাব।
লেখকঃ নজরুল ইসলাম কাজল



























