শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির পথপ্রদর্শক ও প্রথম র্যাংলার আনন্দমোহন বসু। শিক্ষার নগর ময়মনসিংহে শত বছরের অধিককাল ধরে আলো ছড়ানো প্রধান প্রতিষ্ঠানের নাম আনন্দমোহন কলেজ। এই কলেজটির সাথে জ্বলজ্বল করছে যে মানুষটির নাম, তিনি আনন্দমোহন বসু। আনন্দমোহন বসু কেবল শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বলেই তাঁর নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমনটি ভাবলে তাঁর কর্মকে শুধু খাটো করা হবেনা, ইতিহাসের অনেককিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং আমাদের অজানা থেকে যাবে ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং নিজেদেরকে বঞ্চিত করবো এক কীর্তিমান আলোকময় মানুষের দীপ্তি থেকে। উনি শিক্ষায় অসামান্য অবদান রাখার পাশাপাশি সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি এবং নারীর অগ্রযাত্রায় রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
১৯০৬ সালের ২০ আগস্ট (বাংলা ১৩১৩ সনের ৪ ভাদ্র) সোমবার সূর্যাস্তের সময় কলকাতার আপার সার্কুলার রোডস্থ পরমাত্মীয় আচার্য বিজ্ঞানী জগদ্বীশ চন্দ্র বসু’র বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই ক্ষণজন্মা মানুষটি।
আনন্দমোহন বসু’র প্রয়াণ দিবসে আমাদের অতল শ্রদ্ধা। আমরা এও জানি, ‘ইতিহাস হলো মানুষের আত্ম-আবিষ্কারের ইতিকথা’। তাই নিজেকে আবিস্কারের পর্যায়ক্রমিক ধারায় আরো একটু এগিয়ে নিতে এই মানুষটি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন বলে মনে করি। এই কীর্তিমান মানুষ সম্পর্কে আরও বেশি জানতে আগ্রহী ব্যক্তিগণ পড়তে পারেন, ‘আনন্দমোহন বসুঃ ইতিহাসের অপ্রকাশিত অধ্যায়’ বইটি। সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ভাষাচিত্র’ কর্তৃক ২০১৯ সালের বাংলা একাডেমির একুশে বই মেলায় এটি প্রকাশিত হয়েছে।
গ্রন্থটি প্রণয়নে অনুপ্রেরণা বলি আর জোর তাগিদই বলি, তা পেয়েছি অধ্যাপক যতীন সরকারের নিকট থেকে। কৃতি মানুষদের, বিশেষত আমাদের অঞ্চলের অনেক কৃতি মানুষের জীবনী প্রণয়ন করেছেন তিনি। স্যার শুধু তাগাদা দিয়েই থেমে থাকেননি, প্রয়োজনীয় তথ্যের (অনেক আগে প্রকাশিত ইংরেজি জীবনী গ্রন্থসহ) অনেককিছুরই যোগান দিয়েছেন। এছাড়াও প্রণয়নকালীন নিয়মিত খোঁজখবর রেখেছেন, সময়ে সময়ে অগ্রগতি দেখেছেন, প্রয়োজনীয় সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছেন এবং সর্বোপরি চার পৃষ্ঠার একটা ভূমিকাও লিখেছেন তিনি।
সেই ভূমিকার কিছু অংশ নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:
আনন্দমোহন বসুর (১৮৪৭-১৯০৬) জীবন ও কৃতি সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের প্রায় সবাই অনবহিত। ময়মনসিংহ শহরে তার নামে প্রতিষ্ঠিত আনন্দমোহন কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও এই মনীষী সম্পর্কে তেমন একটা সচেতন নয়। তাদের ভিতর সেই সচেতনতা সৃষ্টির কাজে প্রবীণরাও কি এগিয়ে এসেছেন? মনে তো হয় না। কলকাতা নগরীকে কেন্দ্র করেই যে এই উপমহাদেশে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন ঘটে, সে বিষয়টি বিতর্কাতীত সত্য অবশ্যই। কিন্তু আমরা মনে রাখি না যে, কলকাতা নগরীর সীমানা ছাড়িয়ে সেই শিক্ষার আলো যদি দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে না পড়ত, বিভিন্ন মফস্বল শহরে এবং কিছু কিছু গ্রামগঞ্জেও যদি সেই শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত অনেক মনীষীর অভ্যুদয় না-ঘটত, তাহলে সে শিক্ষা দেশের কোনো কাজেই লাগত না।
সত্যনিষ্ঠা, মুক্তচিন্তা, গণতন্ত্র ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ঘনিষ্ঠ অনুসারী রূপেই আনন্দমোহন তার সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মতান্ত্রিক ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করে গেছেন। কোথাও কোনোক্রমেই কোনোরূপ অন্ধতা বা স্বার্থ চিন্তাকে প্রশ্রয় দেননি বা প্রবলের প্রতাপের সামনে নতি স্বীকার করেননি। শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৮৭৯ সালে কলকাতায় তিনি ‘সিটি কলেজ’ নামে যে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন তারই শাখা খোলা হয় ময়মনসিংহ শহরে তার নিজের বাসাবাড়িতে। আনন্দমোহনের মৃত্যুর পর ১৯০৬ সালে সেই কলেজটি উঠে যায়। এর দু’বছর পর ১৯০৮ সালে ময়মনসিংহের শিক্ষানুরাগী সুধীবৃন্দের তৎপরতায় এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ব্ল্যাকউডের বিশেষ উৎসাহে কলেজটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে এর নামকরণ করা হয় ‘আনন্দমোহন কলেজ’। আনন্দমোহন বসুর নিজ বাসায় স্থাপিত বিদ্যালয়টি ‘সিটি কলেজিয়েট স্কুল’ নামে এখনো বিদ্যমান।
বাংলা ভাষায় আনন্দমোহনের কোনো পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ নেই। ইংরেজিতে লিখিত ও হেমচন্দ্র সরকার প্রণীত A life of Ananda Mohan Bose বইটি কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৯ সালে। হেমচন্দ্র সরকারের ঐ ইংরেজি বইটির অনুসরণেই স্বপন পাল ও মৃন্ময় পাল সংলাপ-এই দু’জনে মিলে লিখেছেন, ‘‘আনন্দমোহন বসু: ইতিহাসের অপ্রকাশিত অধ্যায়’’। এসময়ে এরকম একটি বইয়ের প্রকাশ খুব জরুরী হয়ে দেখা দিয়েছে। আনন্দমোহন বসুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও তাঁর অবদান সম্পর্কে এ যুগের তরুণ-তরুণীদের পরিচিত করে তোলার এই প্রয়াসকে অবশ্যই একটি মহৎ প্রয়াস বলতে হবে। সেরকম প্রয়াস গ্রহণের জন্য লেখকদ্বযের নিকট আমাদের অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
লেখক : স্বপন পাল, প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী।

স্বপন পাল 

























