০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এনসিপির ‘শাপলা’ বিতর্ক: কৌশল নাকি অন্যকিছু?

  • উবায়দুল হক
  • পোষ্টের সময় : ১০:৪৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪৯৭ ভিউ :

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী প্রতীক কখনো কেবল প্রশাসনিক চিহ্ন নয়—এটি দলের আত্মপরিচয়, আবেগ এবং ভোটারদের মানসিক সংযোগের প্রতিফলন। ‘ধানের শীষ’, ‘দাঁড়িপাল্লা’ কিংবা ‘শাপলা’,— এসব প্রতীক কাগজে মুদ্রিত একটি চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি। প্রতীক হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ, যার মাধ্যমে একটি দল নিজেদের দর্শন, ইতিহাস ও জনআবেগের সঙ্গে একাত্মতা তৈরি করে। ফলে প্রতীক পাওয়া মানে শুধু নির্বাচনী সুবিধা নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও মানসিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।

 

শাপলা প্রতীকের বিতর্ক ও নতুন ধাঁধা :

সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘শাপলা’ প্রতীক নিয়ে যে বিতর্কে জড়িয়েছে, তা নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলটির নেতারা দাবি করে আসছেন—আইনগত কোনো বাধা নেই, তাই শাপলা প্রতীক আমাদের প্রাপ্য। অপরদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলে আসছে—বর্তমান বিধিমালায় এ প্রতীক বরাদ্দের সুযোগ নেই। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ইসি নতুন প্রতীক তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ‘শাপলা’ নয়, বরং ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এনসিপি। তাদের অভিযোগ, শাপলা প্রতীক বাদ দিয়ে ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা প্রতারণামূলক আচরণ।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলামোটরে যুবশক্তির এক সেমিনারে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, শাপলা কলি যদি দেওয়া যায়, তাহলে শাপলাও দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু কমিশন বুঝিয়ে দিল—তোমরা এখনো মূলধারার দল নও। এই মানসিকতা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ছায়া, যা ইসিতেও বিদ্যমান।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ইচ্ছায় প্রতীকের তালিকায় ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হয়েছে, কারও নেয়া বা না নেয়াটা ব্যাপার নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে শাপলা কলি প্রতীক যুক্ত করার বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মনে করেছে, প্রতীকে শাপলা কলি রাখা যেতে পারে। তাই যুক্ত করা হয়েছে। এটা কারো দাবির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক না। এনসিপি শাপলা প্রতীক চেয়েছে। তবে শাপলা কলির সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে।’

অর্থাৎ, প্রতীক তালিকায় শাপলা কলি যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘শাপলা বিতর্ক’ আরও জটিল মোড় নিয়েছে। এখন প্রশ্ন—এটি কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল?

 

বিতর্কের মধ্যেই প্রচারণা কৌশল:

বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় প্রচারণা মানেই দৃশ্যমানতা, আর দৃশ্যমানতা মানেই আলোচনায় থাকা। বিতর্কিত বা আলোচিত দলগুলো সবসময় মিডিয়ার নজরে থাকে—যা ছোট দলের জন্য অমূল্য প্রচারসুবিধা। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এনসিপি হয়তো ‘শাপলা বিতর্ক’কে ব্যবহার করছে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচিতি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে। ইসির সঙ্গে বাক-সংঘাত, সংবাদ শিরোনামে থাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেওয়া—সব মিলিয়ে শাপলা এখন মানুষের মুখে মুখে।

 

প্রতীক মানেই ব্র্যান্ড:

বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীক জাতীয়তাবাদের প্রতীক, যা গণআন্দোলনের সঙ্গে জনগণের সংযোগের প্রতিফলন। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাদের পুরনো ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক ফিরে পায়। এ প্রতীকটি ‘ন্যায়বিচার’ ও ‘ভারসাম্য’-এর প্রতীক হিসেবে জামায়াতের দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে—প্রতীক কেবল ভোটের চিহ্ন নয়, বরং একটি দলের দর্শন, অতীত ও ভবিষ্যতের ধারক।

 

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, এনসিপি ইতোমধ্যেই ‘শাপলা’ নিয়ে জনমনে যে আলোচনার ঢেউ তুলেছে, তা এক প্রকার রাজনৈতিক সাফল্য। এনসিপি যদি ‘শাপলা’ পায় তা হবে শুধু প্রশাসনিক অর্জন নয়, বরং জনমানসে তাদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রতীকী বিজয়। এটি তাদের ভোটার চেনায় সহায়তা করবে এবং মিডিয়ায় ইতিবাচক প্রতিফলন ফেলবে। তবে এনসিপিকে প্রতীক বিতর্ক নিয়েই থাকলে হবে না। গণমানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বাড়াতেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে এই বিতর্কই একদিন তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

 

_লেখক: গণমাধ্যমকর্মী_

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

নাটকীয় কামব্যাকে জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল

সেরিব্রাল পালসি ও অকুপেশনাল থেরাপি: শিশুর সম্ভাবনাকে বিকশিত করার এক নির্ভরযোগ্য পথ

29 June 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

এনসিপির ‘শাপলা’ বিতর্ক: কৌশল নাকি অন্যকিছু?

পোষ্টের সময় : ১০:৪৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী প্রতীক কখনো কেবল প্রশাসনিক চিহ্ন নয়—এটি দলের আত্মপরিচয়, আবেগ এবং ভোটারদের মানসিক সংযোগের প্রতিফলন। ‘ধানের শীষ’, ‘দাঁড়িপাল্লা’ কিংবা ‘শাপলা’,— এসব প্রতীক কাগজে মুদ্রিত একটি চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি। প্রতীক হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ, যার মাধ্যমে একটি দল নিজেদের দর্শন, ইতিহাস ও জনআবেগের সঙ্গে একাত্মতা তৈরি করে। ফলে প্রতীক পাওয়া মানে শুধু নির্বাচনী সুবিধা নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও মানসিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।

 

শাপলা প্রতীকের বিতর্ক ও নতুন ধাঁধা :

সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘শাপলা’ প্রতীক নিয়ে যে বিতর্কে জড়িয়েছে, তা নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলটির নেতারা দাবি করে আসছেন—আইনগত কোনো বাধা নেই, তাই শাপলা প্রতীক আমাদের প্রাপ্য। অপরদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলে আসছে—বর্তমান বিধিমালায় এ প্রতীক বরাদ্দের সুযোগ নেই। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ইসি নতুন প্রতীক তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ‘শাপলা’ নয়, বরং ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এনসিপি। তাদের অভিযোগ, শাপলা প্রতীক বাদ দিয়ে ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা প্রতারণামূলক আচরণ।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলামোটরে যুবশক্তির এক সেমিনারে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, শাপলা কলি যদি দেওয়া যায়, তাহলে শাপলাও দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু কমিশন বুঝিয়ে দিল—তোমরা এখনো মূলধারার দল নও। এই মানসিকতা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ছায়া, যা ইসিতেও বিদ্যমান।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ইচ্ছায় প্রতীকের তালিকায় ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হয়েছে, কারও নেয়া বা না নেয়াটা ব্যাপার নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে শাপলা কলি প্রতীক যুক্ত করার বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মনে করেছে, প্রতীকে শাপলা কলি রাখা যেতে পারে। তাই যুক্ত করা হয়েছে। এটা কারো দাবির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক না। এনসিপি শাপলা প্রতীক চেয়েছে। তবে শাপলা কলির সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে।’

অর্থাৎ, প্রতীক তালিকায় শাপলা কলি যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘শাপলা বিতর্ক’ আরও জটিল মোড় নিয়েছে। এখন প্রশ্ন—এটি কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল?

 

বিতর্কের মধ্যেই প্রচারণা কৌশল:

বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় প্রচারণা মানেই দৃশ্যমানতা, আর দৃশ্যমানতা মানেই আলোচনায় থাকা। বিতর্কিত বা আলোচিত দলগুলো সবসময় মিডিয়ার নজরে থাকে—যা ছোট দলের জন্য অমূল্য প্রচারসুবিধা। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এনসিপি হয়তো ‘শাপলা বিতর্ক’কে ব্যবহার করছে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচিতি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে। ইসির সঙ্গে বাক-সংঘাত, সংবাদ শিরোনামে থাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেওয়া—সব মিলিয়ে শাপলা এখন মানুষের মুখে মুখে।

 

প্রতীক মানেই ব্র্যান্ড:

বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীক জাতীয়তাবাদের প্রতীক, যা গণআন্দোলনের সঙ্গে জনগণের সংযোগের প্রতিফলন। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাদের পুরনো ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক ফিরে পায়। এ প্রতীকটি ‘ন্যায়বিচার’ ও ‘ভারসাম্য’-এর প্রতীক হিসেবে জামায়াতের দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে—প্রতীক কেবল ভোটের চিহ্ন নয়, বরং একটি দলের দর্শন, অতীত ও ভবিষ্যতের ধারক।

 

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, এনসিপি ইতোমধ্যেই ‘শাপলা’ নিয়ে জনমনে যে আলোচনার ঢেউ তুলেছে, তা এক প্রকার রাজনৈতিক সাফল্য। এনসিপি যদি ‘শাপলা’ পায় তা হবে শুধু প্রশাসনিক অর্জন নয়, বরং জনমানসে তাদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রতীকী বিজয়। এটি তাদের ভোটার চেনায় সহায়তা করবে এবং মিডিয়ায় ইতিবাচক প্রতিফলন ফেলবে। তবে এনসিপিকে প্রতীক বিতর্ক নিয়েই থাকলে হবে না। গণমানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বাড়াতেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে এই বিতর্কই একদিন তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

 

_লেখক: গণমাধ্যমকর্মী_

 

Share this news as a Photo Card