ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সরব হয়েছেন দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের পাশে না দাঁড়িয়ে ইউনিয়ন কমিটি ভেঙে দেওয়া, নতুন কমিটি গঠন এবং ‘কমিটি বাণিজ্য’র অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা কারাগারে বা আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় কয়েকটি কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য শেয়ার করা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালামের দুই মেয়ের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেনের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট চালু হলে সেখানে ৫ আগস্টের তিন দিন পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্য শেয়ার করা হয়েছে বলে দেখা যায়। উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতার অ্যাকাউন্ট থেকে এমন পোস্ট প্রকাশের পর দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ দেখা দেয়।
তবে এ বিষয়ে ইকবাল হোসেনের দাবি, তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে হ্যাক বা অপব্যবহার করা হয়েছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর তিনি অ্যাকাউন্টটি নিয়ন্ত্রণে নেন। ওই পোস্ট তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে গত ৩১ মে ত্রিশাল পৌরশহরের প্রাণকেন্দ্রে নজরুল অডিটোরিয়ামে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালামের দুই মেয়ের বিয়ের আয়োজন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়। দলটির অনেক নেতাকর্মী তখন মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে বা কারাগারে থাকায় সহস্রাধিক অতিথির উপস্থিতিতে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
তবে আবুল কালাম বলেন, এটি তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আগে থেকেই নির্ধারিত একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান ছিল। এর সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগের বড় একটি অংশ ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি ভেঙে দেওয়া ও নতুন কমিটি অনুমোদনকে ঘিরে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ বাদল প্রায় এক বছর বিভিন্ন মামলায় কারাগারে ছিলেন। এ সময় তাঁর চেয়ারম্যান পদ থেকে বরখাস্ত হওয়া, বাড়িঘরে হামলা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। তাঁর ছেলে আদনানও একাধিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থায় ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। নেতাদের অনুপস্থিতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দলের গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী বলেও অভিযোগ তাঁদের। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা সুহেল মাহমুদ সুমন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন এবং তাঁদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। তৃণমূলের শতাধিক নেতাকর্মী কারাগারে থাকলেও উপজেলা আওয়ামী লীগ তাঁদের খোঁজ না নিয়ে নিজেদের স্বার্থে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে এলাকায় থেকে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং কমিটি বাণিজ্য করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ দুঃসময়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে দলের হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সুমন।
বালিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ বাদল মোবাইল ফোনে বলেন, ৫ আগস্টের পর তাঁর সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। পাঁচটি মামলায় ছয় মাস কারাগারে থাকার পর কিছুদিন আগে জামিনে মুক্ত হয়েছেন তিনি। তাঁর ছেলে তিনটি মামলায় এখনো কারাগারে রয়েছেন। গত সপ্তাহে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার কথা শুনেছেন বলেও জানান তিনি।
বাদল বলেন, দল যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকে দায়িত্ব দেবে—এ নিয়ে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। তবে তাঁর জেলজীবন ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে দলীয়ভাবে সহায়তা পেলে কষ্টটা কিছুটা কমত।
ত্রিশাল পৌরসভা ও বইলর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেন বা ‘কমিটি বাণিজ্য’র অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি 




















