১১:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর: প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় হতাশ রোহিঙ্গারা

 

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে নৃশংসতার শিকার ও বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রাণরক্ষায় সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করেন রোহিঙ্গারা। এরপর কেটে গেছে নয় বছর। প্রতিবছরই প্রত্যাবাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের কারণে তাদের নিজ দেশে ফেরার পথ এখনো অনিশ্চিত।

 

নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) কক্সবাজারের কয়েকটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা জড়ো হয়ে তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের দিনটি স্মরণ করবেন। এ সময় তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বিচার দাবি করার পাশাপাশি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতিও জানাবেন।

 

প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমে আসছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানা ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পে অপরাধ ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতের ঘটনাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

 

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন হলেও শুধু ঘোষণা বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা, মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

 

রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’র সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধাপ ও কাজ রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন করতে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না। ২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।

 

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই এখন কাজ করতে হবে। জাতীয় নীতিতে কী চলছে, বৈশ্বিক নীতিতে কী পরিবর্তন হচ্ছে এবং মিয়ানমারের নীতি কোনদিকে যাচ্ছে, সেসব বিবেচনায় নিতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটি প্রথমত মিয়ানমারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের এবং তৃতীয়ত অন্য দেশগুলোরও সমস্যা।

 

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করার মিয়ানমারের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সৈয়দ উল্লাহ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি ব্যবহার করে মিয়ানমার আন্তর্জাতিকভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক কোনো খেলার অংশ হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তারা বাংলাদেশের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করছেন না, শুধু শান্তি চান।

 

রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সংকট নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক সমস্যা। রাখাইন বা আরাকানের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তার দাবি, আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

 

মুজিবুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে চীন ও ভারতের মতো প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও পদক্ষেপ নিতে হবে। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের অবমাননাকরভাবে উপস্থাপনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা ভিক্ষুক নন। তারা তাদের পূর্বপুরুষের জন্মভূমি আরাকানের মানুষ।

 

শরণার্থী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে ভালো সমাধান। তবে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না করে তাদের ফেরত পাঠানো যাবে না। রাখাইনের চলমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

উন্নয়নকর্মী ফারিহা হোসাইন বলেন, নয় বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু জরুরি মানবিক সহায়তার দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে সমাধান আসবে।

 

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্তের ওপারে পাঠানোর বিষয় নয়, তাদের মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রেখে রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তা অব্যাহত রাখা দরকার। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যেমন জরুরি, তেমন এ সংকটের প্রভাব বহন করা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও দেখতে হবে।

 

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, শরণার্থী সংকটে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সমাধানের মধ্যে প্রত্যাবাসন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন রয়েছে। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়ার বাস্তব সুযোগ না থাকায় প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে হলেও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ চালু রাখা যেতে পারে। সংখ্যায় সীমিত হলেও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

 

কুতুপালং এলাকার জনপ্রতিনিধি প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী পাশাপাশি বাস করলেও বিভিন্ন কারণে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপ ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতও তাদের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি এবং প্রত্যাবাসনসহ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাদের নিজস্ব বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

 

সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো নেই। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়াকে প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্ব বা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

 

তিনি আরও বলেন, এসব শর্ত তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

 

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী বিষয়ে প্রশাসন, গবেষক, রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বিত আলোচনা প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট সুপারিশ তৈরি করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

 

কক্সবাজার উন্নয়ন আন্দোলনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ রুবেল বলেন, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বসবাসরত একটি প্রজন্মকে কেবল ত্রাণনির্ভর করে রাখলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার কথাও বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

 

রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন। তবে নয় বছর পর এসে শুধু ‘প্রত্যাবাসন হবে’—এমন ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবতা বিবেচনায় একটি সুস্পষ্ট কৌশল, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা।

 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের মুখে সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বনভূমিতে আশ্রয় নেন। কক্সবাজারে আগে থেকে আশ্রয় নেওয়া প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা এবং পরে নতুন করে আসা আরও দেড় লাখসহ বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন। নয় বছর ধরে তারা অপেক্ষা করছেন নিরাপদে নিজ জন্মভূমিতে ফেরার। কিন্তু সেই প্রত্যাবাসন কবে বাস্তবায়িত হবে, তার নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি।

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে ইরান

অক্টোবরে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে চায় ব্রাজিল

24 August 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর: প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় হতাশ রোহিঙ্গারা

পোষ্টের সময় : ১০:৩৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

 

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে নৃশংসতার শিকার ও বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রাণরক্ষায় সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করেন রোহিঙ্গারা। এরপর কেটে গেছে নয় বছর। প্রতিবছরই প্রত্যাবাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের কারণে তাদের নিজ দেশে ফেরার পথ এখনো অনিশ্চিত।

 

নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) কক্সবাজারের কয়েকটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা জড়ো হয়ে তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের দিনটি স্মরণ করবেন। এ সময় তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বিচার দাবি করার পাশাপাশি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতিও জানাবেন।

 

প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমে আসছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানা ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পে অপরাধ ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতের ঘটনাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

 

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন হলেও শুধু ঘোষণা বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা, মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

 

রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’র সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধাপ ও কাজ রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন করতে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না। ২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।

 

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই এখন কাজ করতে হবে। জাতীয় নীতিতে কী চলছে, বৈশ্বিক নীতিতে কী পরিবর্তন হচ্ছে এবং মিয়ানমারের নীতি কোনদিকে যাচ্ছে, সেসব বিবেচনায় নিতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটি প্রথমত মিয়ানমারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের এবং তৃতীয়ত অন্য দেশগুলোরও সমস্যা।

 

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করার মিয়ানমারের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সৈয়দ উল্লাহ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি ব্যবহার করে মিয়ানমার আন্তর্জাতিকভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক কোনো খেলার অংশ হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তারা বাংলাদেশের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করছেন না, শুধু শান্তি চান।

 

রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সংকট নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক সমস্যা। রাখাইন বা আরাকানের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তার দাবি, আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

 

মুজিবুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে চীন ও ভারতের মতো প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও পদক্ষেপ নিতে হবে। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের অবমাননাকরভাবে উপস্থাপনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা ভিক্ষুক নন। তারা তাদের পূর্বপুরুষের জন্মভূমি আরাকানের মানুষ।

 

শরণার্থী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে ভালো সমাধান। তবে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না করে তাদের ফেরত পাঠানো যাবে না। রাখাইনের চলমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

উন্নয়নকর্মী ফারিহা হোসাইন বলেন, নয় বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু জরুরি মানবিক সহায়তার দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে সমাধান আসবে।

 

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্তের ওপারে পাঠানোর বিষয় নয়, তাদের মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রেখে রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তা অব্যাহত রাখা দরকার। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যেমন জরুরি, তেমন এ সংকটের প্রভাব বহন করা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও দেখতে হবে।

 

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, শরণার্থী সংকটে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সমাধানের মধ্যে প্রত্যাবাসন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন রয়েছে। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়ার বাস্তব সুযোগ না থাকায় প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে হলেও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ চালু রাখা যেতে পারে। সংখ্যায় সীমিত হলেও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

 

কুতুপালং এলাকার জনপ্রতিনিধি প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী পাশাপাশি বাস করলেও বিভিন্ন কারণে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপ ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতও তাদের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি এবং প্রত্যাবাসনসহ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাদের নিজস্ব বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

 

সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো নেই। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়াকে প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্ব বা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

 

তিনি আরও বলেন, এসব শর্ত তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

 

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী বিষয়ে প্রশাসন, গবেষক, রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বিত আলোচনা প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট সুপারিশ তৈরি করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

 

কক্সবাজার উন্নয়ন আন্দোলনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ রুবেল বলেন, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে বসবাসরত একটি প্রজন্মকে কেবল ত্রাণনির্ভর করে রাখলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার কথাও বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

 

রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন। তবে নয় বছর পর এসে শুধু ‘প্রত্যাবাসন হবে’—এমন ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবতা বিবেচনায় একটি সুস্পষ্ট কৌশল, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা।

 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের মুখে সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বনভূমিতে আশ্রয় নেন। কক্সবাজারে আগে থেকে আশ্রয় নেওয়া প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা এবং পরে নতুন করে আসা আরও দেড় লাখসহ বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন। নয় বছর ধরে তারা অপেক্ষা করছেন নিরাপদে নিজ জন্মভূমিতে ফেরার। কিন্তু সেই প্রত্যাবাসন কবে বাস্তবায়িত হবে, তার নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি।

 

Share this news as a Photo Card