সময় নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, সে সময়কে বুঝে ফেলেছে। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেই যেন সময় ধরা পড়ে যায়। অথচ সময় কখনো ধরা দেয় না, বরং নীরবে মানুষকে টেনে নিয়ে যায় জীবনের শেষপ্রান্তে যেখানে পৌঁছে মানুষ হঠাৎ বুঝতে পারে, সে সারাজীবন যেটাকে স্থায়ী ভেবেছিল, সেটাই ছিল সবচেয়ে অস্থায়ী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো একটি সংগৃহীত লেখা আজকাল অনেকেই শেয়ার করেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়– মানুষ কি সত্যিই লেখাটি পড়ে? পড়লে তো বদলে যাওয়ার কথা। বাস্তবে দেখা যায়, মানুষ বদলায় না। হয়তো পড়ে, কিন্তু শিক্ষা নেয় না। কারণ, শিক্ষা নেওয়ার জন্য যে বিবেক দরকার সেটাই যেন আজ সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি।
সংগৃহীত সেই লেখায় বলা হয়– একজন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবসরের পাঁচ বছর পর নিজের শহরের একটি শাখায় টাকা তুলতে যান। কেউ তাঁকে চিনতে পারে না, সালাম দেয় না, এগিয়ে আসে না। কারণ, ব্যাংকের সবাই নতুন। পরিচয় দেওয়ার পর একজন কর্মকর্তা চা অফার করেন এবং জানতে চান অবসরের পর তাঁর দিন কেমন কাটছে।
সাবেক এমডি বলেন, প্রথম দু-এক বছর খুব কষ্টে কেটেছে। তারপর তিনি বুঝেছেন, দাবা খেলা শেষ হলে রাজা আর সৈনিক সবাইকে একই বাক্সে রাখা হয়। পদ, পদবি, ক্ষমতা, জৌলুস সবই ক্ষণস্থায়ী। স্থায়ী শুধু মানুষের ভালোবাসা, যা অর্জন করতে হয় বিনয় ও সদাচরণ দিয়ে।
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের নির্মম সত্য, সময় যার যার জীবনের হিসাব নিজ হাতে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা সময় থাকতে সেই হিসাব বুঝতে চাই না।
শেক্সপিয়র বলেছিলেন, “পৃথিবীটা একটা রঙ্গমঞ্চ, আর আমরা সবাই অভিনেতা।” কথাটি আজও নিখুঁতভাবে সত্য। সময় মানুষকে একেক সময় একেক চরিত্র দেয়–রাজা বানায়, আবার রাজ্যহীনও করে। মানুষ ভাবে সে সময়কে বশে এনেছে, অথচ সময়ই একদিন মানুষকে অচেনা শহর, অচেনা মানুষ আর অচেনা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
জার্মান রূপকথার সেই সত্যবাদী আয়নার মতোই, মানুষের প্রয়োজন এমন একটি আয়না যা মুখ নয়, ভবিষ্যতের পরিণতি দেখাবে। কিন্তু মানুষ সেই আয়না দেখতে ভয় পায়।
তারপরও ইতিহাসে কিছু ব্যতিক্রম মানুষ জন্ম নেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু পেটেন্ট করেননি তাঁর আবিষ্কার, কারণ তাঁর কাছে টাকার মোহ ছিল বিপজ্জনক। তিনি সৃষ্টিকে টাকার ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন। এর মূল্য তিনি পেয়েছেন ইতিহাসে, যদিও আবিষ্কারের কৃতিত্ব অন্যের নামে গেছে। সময় এখানে এক অদ্ভুত বিচারক কেউ পুরস্কার পায়, কেউ স্মৃতি।
সময় কখনো শুধু বর্তমান নয়–সময় ইতিহাস, সময় ভবিষ্যৎ। সময়কে চিনেই মানুষকে পা ফেলতে হয়। নইলে মানুষ নিজের গল্প লিখতে গিয়ে সময়ের গল্পে হারিয়ে যায়।
এই পৃথিবী আরও অদ্ভুত এক জায়গা। এখানে মানুষ নিজের জীবনের দুঃখ লুকিয়ে রেখে সুখের মুখোশ পরে। যে মানুষটা সারাজীবন লাথি খেয়েছে, সে-ই সবচেয়ে জোরে বলে সে খুব সুখী। নিজের সবটা ঢেলে দিয়ে অন্যের জীবন গড়েছে, অথচ নিজের জীবনটা গড়তে পারেনি। তবু সে খুশি কারণ অন্তত সে টিস্যু পেপারের মতোই হলেও কারও কাজে লেগেছে। সে বোকা নয়, সে হয়তো মানুষের ঘুমন্ত বিবেক।
আরও নির্মম বাস্তবতা হলো– সংসারের বোঝা টানতে টানতে একদিন মানুষ নিজেই বোঝা হয়ে যায়। যে সংসারটা একদিন তার ছিল, সময় সেটাকেও তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়। সময় রাজাকে রাজ্যহীন করে, স্বাধীন মানুষকে পরাধীনতায় ঠেলে দেয়। অথচ মানুষ তখনও মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলে, সে খুব ভাগ্যবান।
এই বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায় বাংলা গানের করুণ উচ্চারণ–
“বুকে ধরে যত ফুল ফোটালাম, সেই ফুলের কাঁটা ছাড়া কী পেলাম–ভাগ্যের পরিহাস এরই নাম।”
এটা কমেডি না ট্র্যাজেডি–না বোঝাটাই হয়তো ভালো।
সমাজের অধিকাংশ মানুষ স্রোতের অনুকূলেই গা ভাসায়। নিরাপত্তা, সুবিধা আর স্বার্থের আশায়। উচ্চাভিলাষীরা তো জেনেশুনেই স্রোতের পক্ষে দাঁড়ায় এবং আশ্চর্যজনকভাবে তারাই বেশিরভাগ সময় সফল হয়। ফলে স্রোতের প্রতিকূলে চলা মানুষ জ্ঞানী, সৎ ও সৃষ্টিশীল হয়েও ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
মনোবিজ্ঞান বলছে, এই প্রবণতা আত্মঘাতী। এটি ভিন্ন চিন্তার মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, সমাজকে নিয়ে যায় মেধাহীন, ভীতু ও সুবিধাবাদী ভবিষ্যতের দিকে।
তবুও ইতিহাস আশার কথা বলে। বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়–তাঁরা স্রোতের প্রতিকূলে দাঁড়িয়েই সমাজ বদলেছেন। একা দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু টিকে আছেন কর্মে ও স্মৃতিতে। আর স্রোতের অনুকূলে থাকা অসংখ্য মানুষ হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে।
শেষ পর্যন্ত সময়ই বিচার করে–কে টিকে থাকবে, আর কে হারিয়ে যাবে।
লেখক : শাহ্ নাফিউল্লাহ সৈকত, গণমাধ্যমকর্মী।

শাহ্ নাফিউল্লাহ সৈকত 

























