বাংলাদেশ এখন এমন এক সংবেদনশীল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ–সবকিছুই একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। বছরের পর বছর আমরা দেখেছি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস আর দুর্বল প্রতিষ্ঠান কীভাবে আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অভিজ্ঞতা বলে, যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়, তখন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষের অধিকার কমে যায়, আর তরুণরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ–নতুন করে দিশা ঠিক করার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতি গড়ে তোলার।
গণতন্ত্রের তিনটি মূল ভিত্তি হলো–মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই তিন ক্ষেত্রেই আজ আমাদের নতুন করে প্রতিশ্রুতি দরকার। মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ চায় যেখানে তারা ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারে, বিরোধী দলগুলো তাদের কার্যক্রম চালাতে পারে, আর নির্বাচন সত্যিকার অর্থে ভোটারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং রাজনীতিকে আবার দেশের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে নিতে।
সুষ্ঠু নির্বাচন মানে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ। কোনো দল জনপ্রিয় হোক বা বিতর্কিত–তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ, কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা কখনোই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি বা স্থিতিশীলতা আনে না। জার্মানিতে উগ্রবাদী দল নিষিদ্ধ হলেও মতাদর্শ টিকে গেছে। তুরস্কে দল নিষিদ্ধ করা বাড়িয়েছে মেরুকরণ। ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়ায় দল নিষিদ্ধ করার ফল হয়েছে গণতন্ত্রের আরও অবক্ষয়। এসব উদাহরণ দেখায়, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আসলে সমস্যা বাড়ায়–সমাধান করে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমাধান নিষেধাজ্ঞায় নয়; সমাধান রাজনৈতিকভাবেই। প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে হলে প্রয়োজন আরও ভালো নীতি, আরও শক্তিশালী জনসমর্থন এবং স্বচ্ছ নেতৃত্ব। একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারের জবাবদিহিতা বাড়ায়, নীতিনির্ভর আলোচনাকে উৎসাহিত করে এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করে।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মানবাধিকার সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন না হলে গণতন্ত্র টিকতে পারে না। জনগণকে বিশ্বাস করতে হবে যে এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের জন্য কাজ করে–কোনো দলের স্বার্থে নয়। নিরপেক্ষ আইনপ্রয়োগ, ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন ও মানবাধিকারের সুরক্ষা একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র তৈরির ভিত্তি।
অর্থনৈতিক চাপের সময় রাজনৈতিক উদারতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, জ্বালানি সমস্যা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা–এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনীতি। repression বা দমনমূলক নীতি অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে। বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য দরকার শান্তিপূর্ণ ও পূর্বানুমানযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ। যে দেশগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে, সেসব দেশই দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে–এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।
এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত তরুণদের অংশগ্রহণে। বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয় এবং অনিরাপদ পরিবেশ তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। একটি নিরাপদ ও নীতিনির্ভর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা গেলে তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে যুক্ত হবে, নতুন চিন্তা আনবে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি। মতপার্থক্য থাকবে–এটাই রাজনীতি। কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক নিয়মগুলো নিয়ে যেন কোনো সন্দেহ না থাকে। শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান–এই চারটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন।
গঠনমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কোনো বিলাসিতা নয়; এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়, নাগরিকেরা যেন মর্যাদা নিয়ে কথা বলতে পারে–এটাই একটি ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি। বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিশাল–অর্থনীতি, জলবায়ু অভিযোজন, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি–সব ক্ষেত্রেই আমরা এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু এর জন্য আগে প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
আগামীর বাংলাদেশ হোক সংলাপের, অংশগ্রহণের এবং সহনশীলতার বাংলাদেশ। বিভাজনের নয়, বরং সহযোগিতার পথে হোক আমাদের যাত্রা। ভিন্নমতকে সম্মান করা–এটাই হোক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা। গঠনমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত শুধু আমাদের আশা নয়–এটাই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।
লেখক : ইমন সরকার, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

ইমন সরকার 

























