বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, জীবাশ্ম জ্বালানির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অধিক বরাদ্দ, কর-শুল্ক ছাড় এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী, গবেষক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর একটি ট্রেনিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রাক-বাজেট মিডিয়া সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এ দাবি জানান। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম (ফেড), ময়মনসিংহ এবং অন্যচিত্র ফাউন্ডেশন, ময়মনসিংহ। এতে সভাপতিত্ব করেন ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সভাপতি সেলিমা রহমান।
সংলাপে বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, এলএনজি ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্যচিত্র ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।”
প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরামের (ফেড) সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মো. খাইরুল আলম তুহিন বলেন, “আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর ও শুল্ক সুবিধা, সহজ অর্থায়ন এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।”
বক্তারা আরও বলেন, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনও অত্যন্ত সীমিত। অথচ সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তারা জানান, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার), সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা, এগ্রিভোল্টাইকস, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং কমিউনিটি মালিকানাধীন জ্বালানি ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ উপলক্ষে সংলাপে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত কর ও শুল্ক প্রত্যাহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি, সহজ শর্তে সবুজ অর্থায়ন ও ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
বক্তারা আরও বলেন, নতুন কয়লা, তেল ও এলএনজিনির্ভর প্রকল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের আধুনিকায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রিডে যুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। রপ্তানিমুখী শিল্পে সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।
সংলাপে অংশ নেওয়া সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, টেকসই উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। এ লক্ষ্যে আসন্ন জাতীয় বাজেটে কার্যকর নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
শাহ্ নাফিউল্লাহ সৈকত 




















