০৪:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যতীন সরকার – এক মহাজীবনের প্রতিকৃতি

  • স্বপন পাল 
  • পোষ্টের সময় : ০৮:০৫:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৫
  • ৫২০ ভিউ :

 

নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর বাজার সংলগ্ন চন্দপাড়া গ্রামে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই আগস্ট, বাংলা ১৩৪৩ সনের ২রা ভাদ্র যতীন সরকার-এর জন্ম। বাবা জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র সরকার। মা বিমলা বালা সরকার। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রামপুর ফ্রি বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার শুরু। এ স্কুলে তিন বছর অধ্যয়ন করে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে চলে যান ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় মামার বাড়ি-পারুলতলা গ্রামে। সেখান গৃহশিক্ষক যতীন চক্রবর্তীর কাছে পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ শেষ করেন। মুক্তাগাছা থেকে ফিরে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে নেত্রকোণা সদরের পুখুরিয়া গ্রামে বাবার জ্যাঠাতুতো বোনের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে ভর্তি হন চন্দ্রনাথ হাইস্কুলে। এই স্কুলেও বেশিদিন পড়তে পারেননি। দেশ ভাগের কারণে পিসিমার ছেলেরা ভারতে চলে গেলে যতীন সরকার তাঁর পাশের গ্রামের বেখৈরহাটি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন। এ স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে দাঙ্গার কারণে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন রামপুর থেকে আড়াই মাইল দূরে আশুজিয়া স্কুল হিসেবে পরিচিত ‘জয়নাথ চক্রবর্তী ইনস্টিটিউশন’ এ। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও দুরারোগ্য পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ায় ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিক পাশ করেন যতীন সরকার।

 

অভাবঅনটনের সংসারে প্রতিদিনের খরচের কিছুটা যোগান দিতে চৌদ্দ বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন রামপুর বাজারে চাটাই বিছিয়ে ডাল, ম্যাচ-বিড়ি, বিস্কুট ইত্যাদির দোকানদারীও করেছেন যতীন সরকার। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিক পাশ করলেও অর্থ সংকটের জন্যে টিউশনি করে টাকা জমিয়ে একবছর পর অর্থাৎ ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে যতীন সরকার আইএ ভর্তি হন নেত্রকোণা কলেজে। শহরে এক বাড়িতে লজিং থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যান। যে পরিবারে লজিং থাকতেন, ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে দুর্ভিক্ষের সময় সে পরিবারের অভাবের সংসারে অর্থের যোগান দেওয়ার পাশাপাশি সবার সংগে তাঁকেও অনাহারে থাকতে হয়েছে মাঝেমধ্যে।

 

আইএ পাশ করার পর ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দমোহন কলেজে বিএতে ভর্তি হন। ময়মনসিংহ শহরেও তাঁকে লজিং থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হয়। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বিএ পরীক্ষা দিয়েই আশুজিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু সরকার সেই স্কুলের অনুমোদন কেটে দিলে জীবিকার জন্যে বিএ’র রেজাল্ট হবার পর পরই বারহাট্টা সিকেপি হাই স্কুলে যোগ দেন এবং ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এখানে শিক্ষকতা করার সময় ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণকে।

 

দুই বছর শিক্ষকতার টাকা জমিয়ে যতীন সরকার বাংলা সাহিত্যে এম এ ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে এমএ পাশ করেন। রাজশাহীতেও পেয়িং গেস্ট হিসেবে থেকেই লেখাপড়া করেছেন তিনি। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দেই বাংলার শিক্ষক হিসেবে গৌরীপুর হাই স্কুলে যোগদান করেন। এর পরের বছর ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে যোগ দেন ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে এবং দীর্ঘ ৩৮ বছর পর ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে সেখান থেকেই চাকুরি তথা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নেন যতীন সরকার। ১৯৬৭ সালে তিনি কানন আইচ এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ছেলে সুমন সরকার স্ত্রী-সন্তানসহ প্রবাসী, কন্যা সুদীপ্তা সরকার বিচার বিভাগে এবং জামাতা রাজীব সরকার জনপ্রশাসনে কর্মরত। একমাত্র ভাই মতীন্দ্র সরকার এবং ভাতৃজায়া নেলী বড়–য়া দেশের বিভিন্ন সরকারী কলেজে অধ্যাপনা শেষে নেত্রকোনার ‘বানপ্রস্থে’ অবসর জীবন-যাপন করছেন। বোন মায়া সরকারও আছেন একই আঙিনায়।

 

যতীন সরকার ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ছাত্রজীবনেই দীক্ষা নেন কম্যুনিজমের। ময়মনসিংহ শহরের চন্দ্রকান্ত ঘোষ রোডের নয়াজামানা পুথিঘরই তাঁকে চিনিয়েছিলো নয়া জামানার পথ। দীক্ষিত হয়েছিলেন দ্বান্দিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদে। পরবর্তী জীবনে কর্মে চিন্তায় এবং সকল প্রকাশে দ্বান্দিক বস্তুবাদই ছিলো তাঁর একমাত্র পথ। যতীন সরকার বলেতেন, ‘কোন পার্টি করতাম সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে দর্শনটাই। সেই দর্শনটা আমি গ্রহন করেছি।’

 

অজপাড়াগা হওয়া সত্ত্বেও রামপুর বাজার ছিল তাঁর কাছে ‘দুনিয়ার জানালা’। পোস্ট অফিসে তখন দুই তিনটি পত্রিকা তো আসতো, এছাড়াও আধামাইল দূরের কবিরাজ জগদীশচন্দ্র নাগ ছিলো ‘বসুমতী’, ‘প্রবাসী’, ‘দেশ’সহ কয়েকটি পত্রিকার গ্রাহক। যতীন সরকার সেই ছোটবেলাতেই এগুলোর নিয়মিত পাঠক হয়ে গিয়েছিলেন। ঠাকুরদা রামদয়াল সরকার পড়ে শোনাতেন রামায়ন, মহাভারত, রামকৃষ্ণ কথামৃত, বিবেকানন্দের জীবনী। বাংলার পাশাপাশি সংস্কৃত পাঠের শুরু পারিবারিকভাবেই। এভাবেই সেই শৈশবকাল থেকেই একটা ভিত গড়ে উঠে একজন যতীন সরকারের।

 

পারিবারিক বলয়ের বাইরে মামার বাড়ী মুক্তাগাছার গাবতলী বাজারে কবি ইউনুস আলীর কবিতা পাঠ, জামালপুরের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসী নাসির আলী, যুক্তিনিষ্ঠ পবিত্র দাশ, নেত্রকোণার চন্দ্রনাথ হাইস্কুলের রেক্টর রবীন্দ্রসাহিত্যের শক্তিশালী সমালোচক সুখরঞ্জন রায়, নেত্রকোণা কালেক্টরেটের কেরানী হরেন্দ্র চন্দ্র দাশ, বাউল কবি জালাল উদ্দীন খাঁ, তাঁর পুত্র খান মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম, বন্ধু শচীন আইচ যতীন সরকারের জীবন-ভাবনা তৈরীতে রেখেছেন গভীর প্রভাব। এছাড়াও পার্টিতে যুক্ত হবার পর তালিম পেয়েছিলেন অজয় রায়, জ্যোতিষ বসু, কাজী আব্দুল বারী, মহাদেব স্যানাল, কফিলউদ্দিন লালমিয়া, আলতাব আলী সহ আরো অনেক কম্যুনিস্ট নেতার কাছ থেকে।

 

কোন রঙীন কাঁচের ভেতর দিয়ে নয়, যতীন সরকার মানুষের জীবনকে দেখেছেন প্রতিদিনের রক্ত ঘাম ঝরানো অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। জাতপাত, বংশ, ধর্ম, শিক্ষা-কোনোকিছুই তাঁর এই দেখার চোখকে এক নিমিষের জন্যও থামিয়ে দিতে পারেনি। এই দেখাই তাঁর লেখা ও বলার মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয়েছে।

 

যতীন সরকার নিজেকে ‘কষ্ট-লেখক’ বলেই পরিচয় দিতেন। সারাজীবন মেনে চলেছেন ম্যাকলে’র সেই কথা ‘ছয় লাইন লিখতে হলে ছয়’শ লাইন পড়তে হয়।’ লেখালেখির ব্যাপারে তিনি নিজেকে একটি প্রশ্ন করতেন সবসময়। ‘এই যে এত লিখা, তাঁর পরে আমি কেন লিখবো?’ তাই তিনি মনে করেন কোনো বিষয়ে লিখতে হলে আগে জেনে নিতে হবে এই বিষয়ে ইতোমধ্যে কি লেখা হয়েছে, যদি নতুন কিছু লেখার থাকে তবেই লিখতে হবে। তাই আনন্দ মোহন কলেজ বার্ষিকীতে প্রথম প্রকাশিত লেখার শিরোনাম দিয়েছিলেন, ‘আপনি কি লিখিয়ে?’

 

যতীন সরকার বাঙালি বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখে। এর জন্য বাংলা একাডেমি থেকে ‘ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক’ স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। দৈনিক পত্রিকায় ও সাহিত্যপত্রে গভীরতাস্পর্শী প্রবন্ধ নিয়মিত লিখে চললেও তাঁর প্রথম বই ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে, যখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ। প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেধাবী সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর আর থামেননি। একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর মূল্যবান প্রবন্ধের ও সম্পাদিত বই। আশি বছর বয়স পর্যন্ত বিরামহীন লিখেছেন তিনি।

 

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো- প্রবন্ধ গ্রন্থ: সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা, বাঙ্গালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবি সমাচার, সংস্কৃতির সংগ্রাম, ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদের ভূত ভবিষ্যৎ, আমাদের চিন্তা চর্চার দিকদিগন্ত, ভাষা সংস্কৃতি উৎসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা, প্রাকৃত জনের জীবনদর্শন, দ্বি-জাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান চেতনা, বাংলাদেশের কবিগান, ভাবনার মুক্ত বাতায়ন, বাংলা কবিতার মূলধারা ও নজরুল, বরণীয় জনের স্মৃতি, কৃতি, নীতি, বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি , গল্পে গল্পে ব্যাকরণ, রাজনীতি ও দুর্নীতি বিষয়ক কথাবার্তা, আমার যেটুকু সাধ্য, মানব মন, মানব ধর্ম ও সমাজ বিপ্লব, মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা, বিচিত্রবিধ বিচার বিবেচনা, সমকালের দর্পণে প্রবন্ধ, ব্যাকরণের ভয় অকারণ, যুগান্তরের ঘুর্ণিপাক ও বাংলাদেশের উপন্যাস, ভাষা বিষয়ক নির্বাচিত প্রবন্ধ, শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ, আমার রবীন্দ্র অবলোকন, আমার নজরুল অবলোকন, কালের কপোল তলে, রবীন্দ্রনাথের গদ্যঃ প্রথম চল্লিশ বছর, রবীন্দ্রনাথের সোনারতরী, প্রসঙ্গ: মৌলবাদ, সাঁকো বাঁধার প্রত্যয় ৩৩, প্রান্তিক ভাবনাপুঞ্জ, সত্য যে কঠিন, নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধাবলী, সাহিত্য নিয়ে নানাকথা, সংস্কৃতি ভাবনা, ইতিহাসের দর্শন ও বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে, দর্শনের গল্প ইত্যাদি।

 

আত্মজীবনীমূলক রচনা : পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন, পাকিস্তানের ভূত দর্শন।

জীবনী গ্রন্থ : চন্দ্রকুমার দে, কেদারনাথ মজুমদার, সিরাজ উদ্দিন কাশিমপুরী, হরিচরণ আচার্য।

সম্পাদিত গ্রন্থঃ জালাল গীতিকা সমগ্র, সত্তর বছরঃ বিপিন চন্দ্র পাল, ব্রাহ্মসমাজের চল্লিশ বছরঃ শ্রীনাথ চন্দ। এছাড়াও রাহুল সাংকৃত্যায়ন এর অনেক বই তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নির্বাচিত প্রবন্ধ, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ সংকলনসহ রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে। ‘সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র’ নামে একটি তাত্ত্বিক ত্রৈমাসিক সম্পাদনা করতেন তিনি।

 

যতীন সরকার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১০) সহ অনেক পুরস্কার ও পদক পেয়েছেন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক দিয়ে তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির শুরু। এরপর পেয়েছেন ‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৯৭), শ্রুতি স্বর্ণপদক (২০০৮), ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব সাহিত্য পুরস্কার (২০০১), ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১১ পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৭), ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী সম্মাননা (২০০৮), জেমকন সাহিত্য পুরস্কার, আমরা সূর্যমূখী সম্মাননা (২০০৮), ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু পুরস্কার (২০০৯) এবং ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭। ২০১৩ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা কল্যাণ সমিতি কর্তৃক বরেণ্য শিক্ষক সম্মাননা পান তিনি।

 

যতীন সরকার ভাষা আন্দোলনের সময় অজ পাড়াগাঁয় থেকে যেমন মাতৃভাষা রক্ষায় মিছিল-মিটিং-এ অংশ নিয়েছিলেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে ময়মনসিংহে বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে সংগঠিত করেছেন পাড়া-মহল্লার মানুষদের। পচাত্তরে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দীর্ঘ ১৮ মাস জেল খেটেছেন তিনি। যতীন সরকার উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন দু’বার। ছিলেন বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্য। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। মুক্ত বাতায়ন পাঠকচক্রের উদ্যোক্তা ও সংগঠক তিনি। এছাড়াও যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। ভ্রমণ করেছেন জার্মানি, ইংল্যান্ড, ভারত, পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ।

 

বহুপথ হেঁটে বহু আঙিনা আলোকিত করে ঠাঁই নিয়েছিলেন নেত্রকোণার বানপ্রস্থে। রাজধানী থেকে দূরের শহর নেত্রকোণার সাতপাই এলাকায় অবস্থিত ‘বানপ্রস্থ’ নামের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল তাঁর অনুবর্তীদের অনাবিল জ্ঞান চর্চা কেন্দ্র। আমৃত্যু নিজের জ্ঞান চর্চার পাশাপাশি ক্লান্তিহীনভাবে অনুপ্রাণিত করে গেছেন নবীন লেখক এবং প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মীদের।

 

আজ যতীন সরকারের ৯০তম জন্মদিন। ১৩ আগস্ট ২০২৫ মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেছেন মহাপ্রাণ যতীন সরকার। প্রয়াণের পূর্ব পর্যন্ত অবিচল আস্থায় উচ্চারণ করেছেন, ‘‘ন্যায্যতার এবং সমতার পৃথিবী হবেই, মুক্তি ঘটবে মানুষের, মানুষ গাইবে ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’।”

 

জন্মদিনে প্রণতি, হে মহাজীবন।    

 

লেখক-

স্বপন পাল

প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

নাটকীয় কামব্যাকে জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল

সেরিব্রাল পালসি ও অকুপেশনাল থেরাপি: শিশুর সম্ভাবনাকে বিকশিত করার এক নির্ভরযোগ্য পথ

29 June 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

যতীন সরকার – এক মহাজীবনের প্রতিকৃতি

পোষ্টের সময় : ০৮:০৫:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৫

 

নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর বাজার সংলগ্ন চন্দপাড়া গ্রামে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই আগস্ট, বাংলা ১৩৪৩ সনের ২রা ভাদ্র যতীন সরকার-এর জন্ম। বাবা জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র সরকার। মা বিমলা বালা সরকার। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে রামপুর ফ্রি বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার শুরু। এ স্কুলে তিন বছর অধ্যয়ন করে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে চলে যান ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় মামার বাড়ি-পারুলতলা গ্রামে। সেখান গৃহশিক্ষক যতীন চক্রবর্তীর কাছে পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ শেষ করেন। মুক্তাগাছা থেকে ফিরে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে নেত্রকোণা সদরের পুখুরিয়া গ্রামে বাবার জ্যাঠাতুতো বোনের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে ভর্তি হন চন্দ্রনাথ হাইস্কুলে। এই স্কুলেও বেশিদিন পড়তে পারেননি। দেশ ভাগের কারণে পিসিমার ছেলেরা ভারতে চলে গেলে যতীন সরকার তাঁর পাশের গ্রামের বেখৈরহাটি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন। এ স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে দাঙ্গার কারণে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন রামপুর থেকে আড়াই মাইল দূরে আশুজিয়া স্কুল হিসেবে পরিচিত ‘জয়নাথ চক্রবর্তী ইনস্টিটিউশন’ এ। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও দুরারোগ্য পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ায় ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিক পাশ করেন যতীন সরকার।

 

অভাবঅনটনের সংসারে প্রতিদিনের খরচের কিছুটা যোগান দিতে চৌদ্দ বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন রামপুর বাজারে চাটাই বিছিয়ে ডাল, ম্যাচ-বিড়ি, বিস্কুট ইত্যাদির দোকানদারীও করেছেন যতীন সরকার। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিক পাশ করলেও অর্থ সংকটের জন্যে টিউশনি করে টাকা জমিয়ে একবছর পর অর্থাৎ ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে যতীন সরকার আইএ ভর্তি হন নেত্রকোণা কলেজে। শহরে এক বাড়িতে লজিং থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যান। যে পরিবারে লজিং থাকতেন, ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে দুর্ভিক্ষের সময় সে পরিবারের অভাবের সংসারে অর্থের যোগান দেওয়ার পাশাপাশি সবার সংগে তাঁকেও অনাহারে থাকতে হয়েছে মাঝেমধ্যে।

 

আইএ পাশ করার পর ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দমোহন কলেজে বিএতে ভর্তি হন। ময়মনসিংহ শহরেও তাঁকে লজিং থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হয়। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বিএ পরীক্ষা দিয়েই আশুজিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু সরকার সেই স্কুলের অনুমোদন কেটে দিলে জীবিকার জন্যে বিএ’র রেজাল্ট হবার পর পরই বারহাট্টা সিকেপি হাই স্কুলে যোগ দেন এবং ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এখানে শিক্ষকতা করার সময় ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণকে।

 

দুই বছর শিক্ষকতার টাকা জমিয়ে যতীন সরকার বাংলা সাহিত্যে এম এ ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে এমএ পাশ করেন। রাজশাহীতেও পেয়িং গেস্ট হিসেবে থেকেই লেখাপড়া করেছেন তিনি। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দেই বাংলার শিক্ষক হিসেবে গৌরীপুর হাই স্কুলে যোগদান করেন। এর পরের বছর ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে যোগ দেন ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে এবং দীর্ঘ ৩৮ বছর পর ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে সেখান থেকেই চাকুরি তথা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নেন যতীন সরকার। ১৯৬৭ সালে তিনি কানন আইচ এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ছেলে সুমন সরকার স্ত্রী-সন্তানসহ প্রবাসী, কন্যা সুদীপ্তা সরকার বিচার বিভাগে এবং জামাতা রাজীব সরকার জনপ্রশাসনে কর্মরত। একমাত্র ভাই মতীন্দ্র সরকার এবং ভাতৃজায়া নেলী বড়–য়া দেশের বিভিন্ন সরকারী কলেজে অধ্যাপনা শেষে নেত্রকোনার ‘বানপ্রস্থে’ অবসর জীবন-যাপন করছেন। বোন মায়া সরকারও আছেন একই আঙিনায়।

 

যতীন সরকার ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ছাত্রজীবনেই দীক্ষা নেন কম্যুনিজমের। ময়মনসিংহ শহরের চন্দ্রকান্ত ঘোষ রোডের নয়াজামানা পুথিঘরই তাঁকে চিনিয়েছিলো নয়া জামানার পথ। দীক্ষিত হয়েছিলেন দ্বান্দিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদে। পরবর্তী জীবনে কর্মে চিন্তায় এবং সকল প্রকাশে দ্বান্দিক বস্তুবাদই ছিলো তাঁর একমাত্র পথ। যতীন সরকার বলেতেন, ‘কোন পার্টি করতাম সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে দর্শনটাই। সেই দর্শনটা আমি গ্রহন করেছি।’

 

অজপাড়াগা হওয়া সত্ত্বেও রামপুর বাজার ছিল তাঁর কাছে ‘দুনিয়ার জানালা’। পোস্ট অফিসে তখন দুই তিনটি পত্রিকা তো আসতো, এছাড়াও আধামাইল দূরের কবিরাজ জগদীশচন্দ্র নাগ ছিলো ‘বসুমতী’, ‘প্রবাসী’, ‘দেশ’সহ কয়েকটি পত্রিকার গ্রাহক। যতীন সরকার সেই ছোটবেলাতেই এগুলোর নিয়মিত পাঠক হয়ে গিয়েছিলেন। ঠাকুরদা রামদয়াল সরকার পড়ে শোনাতেন রামায়ন, মহাভারত, রামকৃষ্ণ কথামৃত, বিবেকানন্দের জীবনী। বাংলার পাশাপাশি সংস্কৃত পাঠের শুরু পারিবারিকভাবেই। এভাবেই সেই শৈশবকাল থেকেই একটা ভিত গড়ে উঠে একজন যতীন সরকারের।

 

পারিবারিক বলয়ের বাইরে মামার বাড়ী মুক্তাগাছার গাবতলী বাজারে কবি ইউনুস আলীর কবিতা পাঠ, জামালপুরের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসী নাসির আলী, যুক্তিনিষ্ঠ পবিত্র দাশ, নেত্রকোণার চন্দ্রনাথ হাইস্কুলের রেক্টর রবীন্দ্রসাহিত্যের শক্তিশালী সমালোচক সুখরঞ্জন রায়, নেত্রকোণা কালেক্টরেটের কেরানী হরেন্দ্র চন্দ্র দাশ, বাউল কবি জালাল উদ্দীন খাঁ, তাঁর পুত্র খান মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম, বন্ধু শচীন আইচ যতীন সরকারের জীবন-ভাবনা তৈরীতে রেখেছেন গভীর প্রভাব। এছাড়াও পার্টিতে যুক্ত হবার পর তালিম পেয়েছিলেন অজয় রায়, জ্যোতিষ বসু, কাজী আব্দুল বারী, মহাদেব স্যানাল, কফিলউদ্দিন লালমিয়া, আলতাব আলী সহ আরো অনেক কম্যুনিস্ট নেতার কাছ থেকে।

 

কোন রঙীন কাঁচের ভেতর দিয়ে নয়, যতীন সরকার মানুষের জীবনকে দেখেছেন প্রতিদিনের রক্ত ঘাম ঝরানো অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। জাতপাত, বংশ, ধর্ম, শিক্ষা-কোনোকিছুই তাঁর এই দেখার চোখকে এক নিমিষের জন্যও থামিয়ে দিতে পারেনি। এই দেখাই তাঁর লেখা ও বলার মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয়েছে।

 

যতীন সরকার নিজেকে ‘কষ্ট-লেখক’ বলেই পরিচয় দিতেন। সারাজীবন মেনে চলেছেন ম্যাকলে’র সেই কথা ‘ছয় লাইন লিখতে হলে ছয়’শ লাইন পড়তে হয়।’ লেখালেখির ব্যাপারে তিনি নিজেকে একটি প্রশ্ন করতেন সবসময়। ‘এই যে এত লিখা, তাঁর পরে আমি কেন লিখবো?’ তাই তিনি মনে করেন কোনো বিষয়ে লিখতে হলে আগে জেনে নিতে হবে এই বিষয়ে ইতোমধ্যে কি লেখা হয়েছে, যদি নতুন কিছু লেখার থাকে তবেই লিখতে হবে। তাই আনন্দ মোহন কলেজ বার্ষিকীতে প্রথম প্রকাশিত লেখার শিরোনাম দিয়েছিলেন, ‘আপনি কি লিখিয়ে?’

 

যতীন সরকার বাঙালি বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখে। এর জন্য বাংলা একাডেমি থেকে ‘ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক’ স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। দৈনিক পত্রিকায় ও সাহিত্যপত্রে গভীরতাস্পর্শী প্রবন্ধ নিয়মিত লিখে চললেও তাঁর প্রথম বই ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে, যখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ। প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেধাবী সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর আর থামেননি। একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর মূল্যবান প্রবন্ধের ও সম্পাদিত বই। আশি বছর বয়স পর্যন্ত বিরামহীন লিখেছেন তিনি।

 

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো- প্রবন্ধ গ্রন্থ: সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা, বাঙ্গালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবি সমাচার, সংস্কৃতির সংগ্রাম, ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদের ভূত ভবিষ্যৎ, আমাদের চিন্তা চর্চার দিকদিগন্ত, ভাষা সংস্কৃতি উৎসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা, প্রাকৃত জনের জীবনদর্শন, দ্বি-জাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান চেতনা, বাংলাদেশের কবিগান, ভাবনার মুক্ত বাতায়ন, বাংলা কবিতার মূলধারা ও নজরুল, বরণীয় জনের স্মৃতি, কৃতি, নীতি, বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি , গল্পে গল্পে ব্যাকরণ, রাজনীতি ও দুর্নীতি বিষয়ক কথাবার্তা, আমার যেটুকু সাধ্য, মানব মন, মানব ধর্ম ও সমাজ বিপ্লব, মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা, বিচিত্রবিধ বিচার বিবেচনা, সমকালের দর্পণে প্রবন্ধ, ব্যাকরণের ভয় অকারণ, যুগান্তরের ঘুর্ণিপাক ও বাংলাদেশের উপন্যাস, ভাষা বিষয়ক নির্বাচিত প্রবন্ধ, শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ, আমার রবীন্দ্র অবলোকন, আমার নজরুল অবলোকন, কালের কপোল তলে, রবীন্দ্রনাথের গদ্যঃ প্রথম চল্লিশ বছর, রবীন্দ্রনাথের সোনারতরী, প্রসঙ্গ: মৌলবাদ, সাঁকো বাঁধার প্রত্যয় ৩৩, প্রান্তিক ভাবনাপুঞ্জ, সত্য যে কঠিন, নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধাবলী, সাহিত্য নিয়ে নানাকথা, সংস্কৃতি ভাবনা, ইতিহাসের দর্শন ও বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে, দর্শনের গল্প ইত্যাদি।

 

আত্মজীবনীমূলক রচনা : পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন, পাকিস্তানের ভূত দর্শন।

জীবনী গ্রন্থ : চন্দ্রকুমার দে, কেদারনাথ মজুমদার, সিরাজ উদ্দিন কাশিমপুরী, হরিচরণ আচার্য।

সম্পাদিত গ্রন্থঃ জালাল গীতিকা সমগ্র, সত্তর বছরঃ বিপিন চন্দ্র পাল, ব্রাহ্মসমাজের চল্লিশ বছরঃ শ্রীনাথ চন্দ। এছাড়াও রাহুল সাংকৃত্যায়ন এর অনেক বই তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নির্বাচিত প্রবন্ধ, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ সংকলনসহ রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে। ‘সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র’ নামে একটি তাত্ত্বিক ত্রৈমাসিক সম্পাদনা করতেন তিনি।

 

যতীন সরকার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১০) সহ অনেক পুরস্কার ও পদক পেয়েছেন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক দিয়ে তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির শুরু। এরপর পেয়েছেন ‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৯৭), শ্রুতি স্বর্ণপদক (২০০৮), ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব সাহিত্য পুরস্কার (২০০১), ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১১ পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৭), ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী সম্মাননা (২০০৮), জেমকন সাহিত্য পুরস্কার, আমরা সূর্যমূখী সম্মাননা (২০০৮), ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু পুরস্কার (২০০৯) এবং ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭। ২০১৩ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা কল্যাণ সমিতি কর্তৃক বরেণ্য শিক্ষক সম্মাননা পান তিনি।

 

যতীন সরকার ভাষা আন্দোলনের সময় অজ পাড়াগাঁয় থেকে যেমন মাতৃভাষা রক্ষায় মিছিল-মিটিং-এ অংশ নিয়েছিলেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে ময়মনসিংহে বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে সংগঠিত করেছেন পাড়া-মহল্লার মানুষদের। পচাত্তরে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দীর্ঘ ১৮ মাস জেল খেটেছেন তিনি। যতীন সরকার উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন দু’বার। ছিলেন বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্য। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। মুক্ত বাতায়ন পাঠকচক্রের উদ্যোক্তা ও সংগঠক তিনি। এছাড়াও যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। ভ্রমণ করেছেন জার্মানি, ইংল্যান্ড, ভারত, পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ।

 

বহুপথ হেঁটে বহু আঙিনা আলোকিত করে ঠাঁই নিয়েছিলেন নেত্রকোণার বানপ্রস্থে। রাজধানী থেকে দূরের শহর নেত্রকোণার সাতপাই এলাকায় অবস্থিত ‘বানপ্রস্থ’ নামের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল তাঁর অনুবর্তীদের অনাবিল জ্ঞান চর্চা কেন্দ্র। আমৃত্যু নিজের জ্ঞান চর্চার পাশাপাশি ক্লান্তিহীনভাবে অনুপ্রাণিত করে গেছেন নবীন লেখক এবং প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মীদের।

 

আজ যতীন সরকারের ৯০তম জন্মদিন। ১৩ আগস্ট ২০২৫ মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেছেন মহাপ্রাণ যতীন সরকার। প্রয়াণের পূর্ব পর্যন্ত অবিচল আস্থায় উচ্চারণ করেছেন, ‘‘ন্যায্যতার এবং সমতার পৃথিবী হবেই, মুক্তি ঘটবে মানুষের, মানুষ গাইবে ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’।”

 

জন্মদিনে প্রণতি, হে মহাজীবন।    

 

লেখক-

স্বপন পাল

প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী

 

Share this news as a Photo Card