হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে…
আজ যতীন সরকারের ৯০ তম জন্মদিন। গত ১৩ আগস্ট ২০২৫ মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেছেন মহাপ্রাণ যতীন সরকার। আগেও হয়েছে কিন্তু সেদিন থেকে বিরামহীন তাঁর দর্শন, তাঁর জীবন চর্চা ও চর্যা নিয়ে লেখালেখি চলছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, নানা মাধ্যমে।
বরাবরের মতো যতীন সরকারের জন্মদিন উদযাপনের আয়োজনের ব্যস্ততায় কাটেনি গত কিছুদিন। বরং অনেক বেশি উদ্বেগের মধ্যেই ছিলাম আমরা। আর গত পাঁচদিন ধরে তো এক গভীর বিষাদের আবহের মধ্যেই আছি।
বেশ কয়েক বছর ধরে স্যার জন্মদিনের বক্তৃতা শেষ করতেন এই বলে যে,
‘যাবার দিনে এই কথাটি/বলে যেন যাই–
যা দেখেছি যা পেয়েছি/ তুলনা তার নাই।’
এটি শুধু তাঁর কথার কথা ছিল না। গভীর বিশ্বাস থেকেই তাঁর এই উচ্চারণ। আর এও আমরা জানি, যতীন সরকার কথা বলতেন অনেক, কিন্তু ‘কথার কথা’ বলতেন না এতোটুকুও। ক্ষুদ্র এই এক জীবনে এই পৃথিবীর জন্যে যতোটা করতে পারেন একজন মানুষ, যতীন সরকার সবটুকু দিয়ে ততোটাই করেছেন।
যতীন সরকারকে যারা জানি, তারা এও জানি যে এক প্রচন্ড সংগ্রামমুখর জীবন কাটিয়েছেন তিনি। আর্থিক দরিদ্রতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম তো ছিলই। কিন্তু সেটিকে মূখ্য করে তুলেননি জীবনে। তিনি বলতেন ‘জীবনের জন্যে জীবিকা, জীবিকার জন্যে জীবন নয়।’ হতে চেয়েছেন বৌদ্ধিক ধনে ধনী এবং হয়েছিলেনও তাই।
দু:খকে হাসি দিয়ে আড়াল করা নয়, ‘দুঃখ-আত্মসাৎ করাই আনন্দ’ই ছিল তাঁর জীবনের অভিমুখ। আট থেকে আশি, পন্ডিত থেকে চাষী সবার সাথে মেশার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ছিল যতীন সরকারের জীবন দর্শন। সামগ্রিক গ্রাম জীবনের মানবপ্রকৃতি, ইহজাগতিক চিন্তাভাবনা, লোকায়ত জীবন-ধর্ম-সংস্কৃতির পাঠ গ্রহণ করে সেটিকে সমাজ পরিবর্তনের আধুনিকতম তত্ত্ব ‘দ্বান্ধিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের’ আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং ‘মার্কসবাদের যান্ত্রিক অনুশীলনের পরিবর্তে’ এর সৃষ্টিশীল প্রয়োগের প্রসারতা বাড়িয়েছেন যতীন সরকার। এ জন্যে তিনিই সম্ভবত প্রথম, যিনি আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যেই সমাজতন্ত্রের উপাদান খুঁজে বের করেছেন এবং তা সাহসের সঙ্গে যুক্তির সৌষ্ট্যবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘বাঙ্গালীর সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’ গ্রন্থে। বাঙালির বৃহত্তর সমাজের মধ্যে তিনি সমাজতান্ত্রিক তথা সাম্যবাদের ঐতিহ্য খুঁজে পেয়েছেন। তিনি মনে করতেন, মার্কস-এঙ্গেলস মানবসমাজে ও প্রকৃতিতে ক্রিয়াশীল নিয়মগুলো আবিষ্কার করে ইতিহাসের আলোকে একটি রূপরেখা তৈরি করেছেন মানুষের এগিয়ে যাবার জন্যে। আপাতত এটিই পথ, এরপর আরও নতুন পথ ও মত আসতেই পারে এবং অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান আরও বিকশিত হবে বলেই বিশ্বাস ছিল তাঁর। নব্বইয়ের দশকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলো, নতুন নানা মতের উদ্ভব ঘটতে লাগলো, সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে কথাবার্তার ব্যাপক জোয়ার চলতে থাকলো। তখন যে অল্প কয়েকজন মানুষ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে কলম ধরেছিলেন, দেশের নানা প্রান্তে এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, যতীন সরকার তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই যুক্তিপ্রয়োগের ধারাকে কখনো গোঁড়ামীর পর্যায়ে নিয়ে যাননি। তাঁর স্লোগান ছিল, ‘মার্কসবাদ ছাড়িয়ে যাওয়া প্রগতি, এড়িয়ে যাওয়া আত্মঘাতী।’
লোকায়ত জ্ঞানের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল যতীন সরকারের। নিবিড়ভাবে চর্চা করে তিনি এই জ্ঞান আয়ত্ত্ব করেছেন। অধ্যয়ন করেছেন পৃথিবীর নানা ধর্মগ্রন্থ। সাথে নিবিষ্ট থেকেছেন বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়সহ অনেক জীবন দিশারী মানুষের সৃষ্টিতে। তাদের অনেকের মাঝেই সন্ধান করেছেন সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের। প্রাচ্যের সাথে মিলিয়েছেন পাশ্চাত্যের জ্ঞানপ্রবাহের ধারাকে। অধ্যয়ন করেছেন কার্ল মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, ফ্রয়েডসহ অনেক মনীষীর রচনা। তিনি যেমন পাঠ নিয়েছেন নানা গ্রন্থ থেকে, তেমনি মানুষ ও প্রকৃতির ভেতরেও করেছেন জ্ঞানের অনুসন্ধান। এই দুইয়ে মিলেই হয়ে উঠেছিলেন প্রজ্ঞাবান এক মানুষ। কর্ম ও সৃষ্টিমুখর জীবন ছিল যতীন সরকারের। তিনি বিশ্বাস করতেন এটিই ‘বেঁচে’ থাকা। এই প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ডা: ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের বলা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটি বাক্য প্রায়ই উচ্চারণ করতেন- ‘‘রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন ‘বেঁচে’ ছিলেন”। ‘বেঁচে’ থাকা মানে কর্মশীল থাকা, সৃষ্টিশীল থাকা।
গত কয়েকবছর ধরে নানারকম শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি লিখতে পারছিলেন না। এজন্য ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করলে উত্তরে বলতেন, ‘জীবিত’ আছি ‘বেঁচে’ নেই। সাথে মজা করে বলতেন ‘আমি তো রবীন্দ্রনাথকে অপমান করতে পারিনা। তাই আশির পর আর লিখি না।’ ব্যক্তিগত দু:খ-কষ্টকে এভাবেই দূরে সরিয়ে রাখতেন যতীন সরকার।
যতীন সরকারের সততা ছিল ঈর্ষণীয় এবং অনুকরণীয়। সাধারণ্যে আর্থিক সততার বিষয়টি বেশি আলোচিত হয়। এ বিষয়ে তাঁকে নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠা অসম্ভব। বৌদ্ধিক সততার ব্যাপারটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যখন দেশে তো বটেই পৃথিবী জুড়ে নানান ফন্দিফিকিরের বুদ্ধিবৃত্তির দাপট, তখন যতীন সরকার শতভাগ সততার সাথে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা চলমান রেখেছেন আমৃত্যু। যা বিশ্বাস করতেন, তা অপকটে বলতেন। কখনো কারো বা কোনো গোষ্ঠীর মনরক্ষার জন্যে এমনকিছু লিখেননি বা বলেননি, যা তার চিন্তার সাথে যায় না।
তিনি বলতেন, ‘মনেরে আজ কহ যে,/ ভালো মন্দ যাহাই আসুক/ সত্যেরে লও সহজে।’ এবং একইসাথে সাধন-মন্ত্র হিসেবে উচ্চারণ করতেন, ‘সত্য যে কঠিন / কঠিনেরে ভালোবাসিলাম / দসে কখনো করে না বঞ্চনা।
সমাজ-চিন্তক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, দার্শনিক, বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি নানা অভিধায় স্যারকে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যতীন সরকার নিজেকে ‘শিক্ষক’ হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। মূলত তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘গণশিক্ষক’। নিবিড় ও নিরন্তর জ্ঞান সাধনা, জীবন চর্চা ও চর্যায় এর প্রয়োগ, আত্মস্থ করার অপার ক্ষমতা, প্রখর ও কালব্যাপী স্মৃতিশক্তি এবং জীবনভর ‘হয়ে উঠা’র সাধনায় জ্ঞানে-মেধায়-চিন্তায়-সৃজনে-কর্মে, বৌদ্ধিক সততায় এবং মানুষকে ভালোবাসার অসীম ক্ষমতায় যতীন সরকার হয়ে উঠেছিলেন একজন পূর্ণ মানুষ। সশরীরে যতীন সরকার নেই, এ যেমন সত্য, তেমন তিনি আছেন সবটা জুড়ে,-এ হচ্ছে পরম সত্য।
নব্বইতম জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে আজকের লেখার ইতি টানতে এই বলে যে, ‘হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে, যাহা-কিছু সব আছে আছে আছে- নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই, নিশিদিন কাঁদি তাই। অন্তরগ্লানি সংসারভার পলক ফেলিতে কোথা একাকার, জীবনের মাঝে স্বরূপ তোমার রাখিবারে যদি পাই।’
লেখক-
স্বপন পাল, প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী
স্বপন পাল 




















