ইতিহাস ঐতিহ্যের মধুপুর শালবন নানা বৃক্ষ গুল্মলতার পত্রঝরার মধ্যে অন্যতম। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য আর মাটি যেন সৃষ্টির এক অপরুপ মহিমায় সজ্জিত। শুধু বন আর বৃক্ষই নয় এ অঞ্চলের ভূ- মানচিত্রও ছবির মতো। বন ও বনের চারপাশটা সবুজ আচ্ছাদিত। মাঝে মাঝে বয়ে চলা বাইদ বিল এ সৌন্দর্যকে আরও মোহনীয় করেছে। বাইদের সবুজ আর সবুজ বনের গভীর মিতালী যেন চোখ জুড়ানো। এ বর্ষায় বনের পুরো আবহ কে সবুজের মাঝে হলুদ গোলাপিসহ নানা ফুলের রঙে যেন মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। হলুদ রঙের কনকচূড়া হলুদ ফুল যেন মুগ্ধতার মোহনীয় রূপ করে বাড়তি আকর্ষণ। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া অনেকেরই জানা তবে কনক চূড়া এত বহুল প্রচারিত নয়। মধুপুর শালবনের কয়েকটি স্থানে এ সময় দেখা গেছে কনকচূড়া। এ সময়টা হচ্ছে কনকচূড়ার ফুল ফোটার সময়। লহুরিয়া দোখলার শিশুপার্ক ও রসুলপুর- দোখলা সড়কের কয়েক স্থানে দেখা গেছে এ সৌখিন প্রজাতির কনকচূড়া। সৌখিন কনক মধুপুর শালবনে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে।
ইতিহাস ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই ফুলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি কনকের নাম নিয়ে। তবে পরিবেশবিদরা ফুলটিকে রাধাচূড়া নামেই চিনে জানে । রাধাচূড়া গুল্ম শ্রেণির দুর্বল কাণ্ডের উদ্ভিদ। তা ছাড়া রাধাচূড়া ফুলের রকমফেরও রয়েছে। প্রস্টম্ফুটনকালও দীর্ঘ। কিন্তু কনকচূড়া ফুলের একটিই রং। ফোটে নির্দিষ্ট সময়ে। বেশিদিন থাকে না। কনকচূড়া আমাদের দেশি বৃক্ষ নয়।
ভিনদেশি এ ফুলের কনকচূড়া নাম দিয়েছেন বরেণ্য নিসর্গী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা। নার্সারিতে এ গাছের নাম হলুদ কৃষ্ণচূড়া। এ নামটিও শুদ্ধ নয়। কারণ কৃষ্ণচূড়ার একটি হলুদ রকমফের রয়েছে। কনকচূড়া নামটি যথার্থই বলা যায়। কারণ গাছের শীর্ষে ফোটা ফুলগুলো উজ্জ্বল সোনালি রঙের। পাতার নিশ্ছিদ্র বুনন ও অক্লান্ত প্রস্টম্ফুটনের কারণে এ গাছের শোভা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। ইদানীং দেশের বিভিন্ন পার্ক ও পথের ধারে বেশকিছু কনকচূড়া চোখে পড়ে। সবচেয়ে বড় বীথিটি দেখা যায় জাতীয় সংসদ ভবনের পূর্ব পাশের পথের ধারে।
ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, অনেকেই কনকচূড়াকে কৃষ্ণচূড়া বা রাধাচূড়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে রঙ ও গাছের গঠনের দিক থেকে এদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কৃষ্ণচূড়ার ফুল সাধারণত গাঢ় লাল বা আগুনরঙা, রাধাচূড়ার ফুলে লাল, কমলা ও হলুদের মিশ্রণ দেখা যায়; অন্যদিকে কনকচূড়া তার বিশুদ্ধ হলুদ বা সোনালি ফুলের জন্য সহজেই আলাদা করে চেনা যায়।
গ্রীষ্মের শুরুতেই প্রকৃতিকে সোনালি-হলুদ আভায় রাঙিয়ে তোলে কনকচূড়া। উজ্জ্বল হলুদ ফুলের থোকায় থোকায় সমারোহে সজ্জিত এই বৃক্ষ দূর থেকেই দৃষ্টি কাড়ে।
শোভাময় বৃক্ষ হিসেবে দেশের বিভিন্ন পার্ক, রাস্তার ধারে এবং বাড়ির আঙিনায় কনকচূড়ার উপস্থিতি প্রকৃতিকে করে তোলে আরও মনোরম ও প্রাণবন্ত।
কনকচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Peltophorum pterocarpum। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে গাছটি Copperpod, Yellow Flame Tree এবং Yellow Poinciana নামে পরিচিত।
মাঝারি থেকে বড় আকারের এই বৃক্ষের পাতাগুলো ঘন ও গাঢ় সবুজ রঙের। বসন্তের শেষভাগ থেকে গ্রীষ্মকালজুড়ে গাছে থোকায় থোকায় ফোটে উজ্জ্বল হলুদ ফুল। ফুলের পাপড়িগুলো কিছুটা কোঁকড়ানো এবং পাপড়ির গোড়ায় হালকা তামাটে বা কমলা আভা দেখা যায়। ফুল ঝরে যাওয়ার পর গাছে তামাটে বা কালচে রঙের শুঁটির মতো ফল ধরে।
প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ধনে কনকচূড়ার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সোনালি ফুলের অপূর্ব সমারোহ শুধু পরিবেশকে নান্দনিক করে তোলে না, বরং নগর ও গ্রামীণ জনপদের সবুজায়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই সৌন্দর্য ও ছায়ার সমন্বয়ে কনকচূড়া আজও অন্যতম জনপ্রিয় শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ।
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী পরিবেশ প্রেমী রাতুল মুন্সী জানান, কনকচূড়া প্রধানত একটি ছায়ানিবিড় ও দৃষ্টিনন্দন বৃক্ষ। সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত কার্যকর। সরাসরি কোনো খাদ্য বা ভেষজ ওষুধ হিসেবে এর ব্যবহারের চেয়ে এর নান্দনিক ও পরিবেশগত সুবিধাই সবচেয়ে বেশি।
গ্রীষ্ম ও বর্ষার শুরুতে উজ্জ্বল হলুদ রঙের থোকায় থোকায় কনকচূড়া ফুটে প্রকৃতিতে দারুণ প্রাণচাঞ্চল্য আনে। তপ্ত রোদে এই গাছের ফুল পথচারীদের চোখ জুড়িয়ে প্রশান্তি দেয়।
তিনি আরো বলেন,পরিবেশ সংরক্ষণ: এর শাখা-প্রশাখা অনেকদূর ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছের পাতা ঘন থাকে, যা চমৎকার ছায়া প্রদান করে। এই জাতীয় গাছ মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, যা ভূমিক্ষয় রোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বাতাস ও পরিবেশ দূষণ রোধ: অন্যান্য বৃক্ষের মতো কনকচূড়াও পরিবেশ থেকে ক্ষতিকারক গ্যাস শোষণ করে বাতাসকে নির্মল রাখতে সাহায্য। এই গাছের শাখা প্রশাখা বেশ মজবুত,আমরা মহাসড়কের পাশে ইচ্ছা করে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কনকচূড়া রোপণ করতে পারি।
পরিবেশ সংরক্ষক তাপস কুমার বর্দ্ধন বলেন, এটি আমাদের দেশী প্রজাতি নয়। এটি মূলত সৌখিন বৃক্ষ। তার এলাকা টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি সরকারি কলেজের মাঠেও কনকচূড়ার গাছ রয়েছে। এ গাছ দেশের বিভিন্ন পার্ক ও সড়কে দেখা যায় বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, এটি বিরল বা দুর্লভ প্রজাতি নয়।
টাঙ্গাইলের বন বিভাগের রসুলপুর সদর বিট অফিসার মোশারফ হোসেন বলেন, বন বিভাগ মধুপুর বনের সৌন্দর্য বর্ধণের কাজ করে থাকে। শালবনের স্থানীয় ১১০ প্রজাতির বৃক্ষের বীজ ও চারার মাধ্যমে প্রজাতি সংরক্ষণ করে থাকে।
ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টার উদ্যানতত্ত্ববিদ রাসেল পারভেজ তমাল বলেন,দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের উদ্ভিদ। প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ধনে কনকচূড়ার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সোনালি ফুলের অপূর্ব সমারোহ শুধু পরিবেশকে নান্দনিক করে তোলে না, বরং নগর ও গ্রামীণ জনপদের সবুজায়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই সৌন্দর্য ও ছায়ার সমন্বয়ে কনকচূড়া আজও অন্যতম জনপ্রিয় শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ।
হাবিবুর রহমান, মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি 



















