সূচনাকাল মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। একটি সুন্দর সূচনা, একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দেয়। একটি জাতির সমৃদ্ধি, একজন মানুষের সম্ভাবনার দুয়ারকে অবারিত করে তুলতে সে জাতি, সে ব্যক্তির সুন্দর বাল্যকাল পূর্বশর্ত হতে পারে। শৈশব সুন্দর, শৈশব স্বাধীন স্বপ্ন দেখার সময়। শৈশব চিন্তাহীন, বাঁধাহীন, ডানা মেলে যেখানে খুশি, যেমন খুশি উড়ে চলার সময়; যদি সে শৈশব পায় পূর্বসূরিদের লালন, স্নেহ, সহযোগিতা।
আজও বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের একটি বিরাট অংশ পরিবার, সমাজের সম্পূর্ণ সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত। এ শিশুদের অনেকে নিজের ভার নিজে বহন করতে বাধ্য হয়, পাশাপাশি তাদের অনেককেই বইতে হয় পরিবারের বোঝা। যেখানে পরিবার, সমাজের দায়িত্ব এই শিশুদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে নেয়া; সেখানে নিজের ভবিষ্যতের, স্বপ্নের জলাঞ্জলি দিয়ে এই শিশুরা কাঁধে তুলে নেয় পরিবারের জোয়াল। আবার এদের অনেকে সঠিক পথনির্দেশের অভাবে ভুলপথে পরিচালিত হয়। ন্যায়-অন্যায়ের ধারণাবঞ্চিত থেকে এমনভাবে ভুল জগতের সাথে নিজেদের জড়িয়ে নেয়, যে অমানুষ হওয়ার বীজটুকু সেখানেই রোপিত হয়ে যায়। অথচ, পরিবার, সমাজের সহযোগিতা পেলে এরাই হতে পারে জাতির ভবিষ্যৎ কান্ডারী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট শিশুর সংখ্যা ৪ কোটি, আর শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৭ জন। এদের মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ২০ লাখ ৯০ হাজার শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে, যাদের ৯৫ শতাংশের অধিক কোনো পারিশ্রমিক পায়না। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের উপর করা বিবিএস-এর জরিপ আরো বলছে, কৃষি, শিল্প ও সেবা তিনখাতেই শিশুশ্রম আছে। এরমধ্যে কৃষিতে ১ লাখ ৭০ হাজার, শিল্পে ১১ লাখ ৯০ হাজার এবং সেবায় ১২ লাখ ৭০ হাজার শিশুশ্রমিক রয়েছে। এই চিত্র দুর্ভাগ্যজনক। শিশুদের কর্মমুখী নয়, বিদ্যালয়মুখী করে তুলতে হবে। দেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, সুশিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলতে সমাজের সকল স্তরের শিশুদের শিক্ষার আলোর নিচে নিয়ে আসা জরুরী। বিবিএসের ২০২২ সালের জনশক্তি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। সাক্ষরতার এই হার উত্তরণে বাংলাদেশ সরকার সচেষ্ট রয়েছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে শিশুরা যাতে বিদ্যালয়মুখী হয়, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কার্যক্রম গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে কাজ করছে। তবে সরকারের একার উদ্যোগে শিশুশিক্ষার হার উন্নয়ন ও শিশুশ্রমের বর্তমান চিত্র পুরোপুরি বদলে দেয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ জরুরি। শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে অভিভাবকগণের সচেতনতা, আগ্রহ, সক্রিয় উদ্যোগ অধিক কাম্য।
দেশে ভঙ্গুর পরিবার অথবা পিতা-মাতা হারানো এতিম শিশুদের একটি বিরাট অংশ রাস্তায় অথবা পরিবারের সমর্থন ছাড়া অসহায় অবস্থায় রয়েছে। এদের অনেকেই আইন-বহির্ভূত কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। আবার, আধুনিক নগরসভ্যতায় কিশোর-গ্যাং কালচারের মতো সমাজবিধ্বংসী একটি বিষয়ও বাংলাদেশের সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। কিশোর গ্যাং-এর সদস্য শিশু-কিশোররা ইভটিজিং, খুন, ছিনতাই-এর মতো ভয়াবহ সামাজিক অপরাধে জড়িত হচ্ছে। এদের এক গ্রæপ আরেক গ্রæপের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পাড়া-মহল্লার পরিবেশকে অস্থির ও অনিরাপদ করে তুলছে। সমাজের নিম্নবিত্ত-উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির শিশু-কিশোরদের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধের অভাবকে এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে দায়ী করা যায়।
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার দেশে তিনটি কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এ কেন্দ্রগুলোতে অপরাধী শিশু কিশোরদের শারীরিক, বুদ্ধিভিত্তিক ও মানবিক উৎকর্ষতা সাধনে সহায়তা করছে সরকার। একই সঙ্গে তাদের শিক্ষা, বৃত্তিমূলক ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানেও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। সরকার সুপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে, তবে মূল্যবোধের প্রাথমিক অবক্ষয় ঠেকানোর দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের উপরই ন্যস্ত হয়। সুতরাং, শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার ও সমাজকেই আরো অধিক দায়িত্বশীল ও সচেষ্ট হতে হবে। এতিম, অসহায় শিশুদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সমাজের বিত্তবান, সামর্থ্যবানরা এক বা একাধিক অসহায় শিশুর দায়িত্বগ্রহণ করতে পারে। সামাজিক উদ্যোগে নির্মাণ করা যেতে পারে শিশু-কিশোর লালন কেন্দ্র।
আধুনিক প্রযুক্তিকেন্দ্রিক সমাজে শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের এক নতুন উপষঙ্গের নাম হয়ে উঠেছে মোবাইল আর সোশ্যাল মিডিয়ার কু-প্রভাব। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে চরিত্রহননের মধ্য দিয়ে নবীন প্রজন্মের ব্যক্তিসত্তার বিপুল ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে এ বিষয়গুলো।
শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু, এ শিশুদের পরিচর্যার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের। কুড়ি থেকে ফুল ফুটতে যেমন পরিচর্যা প্রয়োজন, তেমনি জাতির ভবিষ্যৎ কোমলমতি শিশুদের সঠিক পথনির্দেশ, সুশিক্ষার মধ্য দিয়ে দেশ, রাষ্ট্রের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জীবনের চলার পথ সবটাই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। অসংখ্য বাধা-বিপত্তি, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে হয়। জীবন চলার পথে, একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরির পথে প্রতিবন্ধকগুলো ক্রমাগত বাধার পাঁচিল হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। দূষিত কীট, ঘুণপোকার মতো মানবজীবনের সম্ভাবনাগুলোকে শুরুতেই কুঁড়ে-কুঁড়ে খেয়ে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে কখনো সমাজের কুসংস্কার, কখনো নানা বিধিবিধান, কখনো লোভ, ভুলপথের হাতছানি, কখনো সামর্থ্য বা সহযোগিতার অভাবের মতো নানা সমস্যাগুলো পাহাড়ের মতো বাধা হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। এ ঘুনপোকার বিনাশ জরুরি।
শিশুরা, প্রজন্মের উত্তরসূরীরা পথ হারিয়ে যখন দিশেহারার মতো ঘুরে বেড়ায়, চোখধাঁধানো রঙিন কিন্তু বিধ্বংসী পথ ধরে সামনে এগিয়ে চলে, তখন তাদের থামাতে হবে। সহযোগিতার, স্নেহের স্পর্শের মধ্য দিয়ে তাদের ভিতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। নেতৃত্ব, সঠিক পথনির্দেশের মধ্য দিয়ে তাদের এগিয়ে চলার পথকে দৃশ্যমান করে তুলতে হবে। অন্ধকারের পথ থেকে দূরে রেখে আলোর পথে তাদের ঠেলে দিতে হবে। পাখি যখন একবার তার ডানা মেলে বাধাহীন উড়ে চলে, খুব সহজেই সে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যের পথে এগোতে পারে। নিজের সামর্থ্য, অঙ্গীকারের উপর ভর করে সামনে কোনো বাধা এলেও সে বাধা নির্দ্বিধায় এড়িয়ে যেতে পারে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রই পারে শিশুদের স্বপ্নডানায় শক্তি, উদ্যমের সঞ্চারণ ঘটাতে। সে শক্তি, সে সাহস, সে উদ্যমের জোরে স্বপ্নডানায় ভর করে শিশুরা স্বাধীনভাবে এগিয়ে যাবে তার কাঙ্খিত গন্তব্যে।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, ময়মনসিংহ।

মো.রিদওয়ানুর রহমান রুবাইয়াৎ 

























