কোটা ন্যায্যতাকে ঘিরে যে আন্দোলনের সূত্রপাত, সে বিক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে শেষ পর্যন্ত সকল বৈষম্যমুক্তির কাঙ্খিত লক্ষ্যপূরণের সংগ্রামে রূপ নেয়। জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায় নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়।
জুলাই আন্দোলনে দেশের নাগরিকদের নবীন অংশ, জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কান্ডারী, ছাত্রসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের যে অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়, বিশ্ব আন্দোলনের ইতিহাসে এমন নজির খুবই বিরল। শহর থেকে গ্রাম, চর থেকে পাহাড়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের এমন কোনো অংশ নেই, যেখানে এই আন্দোলন দেশকে কাঁপিয়ে তুলেনি। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে যে আন্দোলনের অগ্রযাত্রা, শেষ পর্যন্ত তা একটি যৌক্তিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে দেশের সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন লাভ করে। জুলাই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল বৈষম্যনিরোধ। কোটা-বৈষম্যের দাবি ছাত্র-জনতার আবেগ ও চেতনায় বৃদ্ধি পেয়ে সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্ফূরণ ঘটায়। দেশ, সমাজ ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো হবে সুষম, কেউ বঞ্চিত হবে না, রাষ্ট্রীয় তোষামোদ পাবে না কেউ, সবার হবে সমান অধিকার, বৈষম্যবিরোধী এই দাবিগুলো ছিলো ছাত্রজনতার।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মূল যে উপাদানগুলো রয়েছে, তার প্রয়োগ যেন যথাযথ হয়, সে দাবিতে তারা ছিল সোচ্চার। দেশের সকল জনগণ যেন গণতান্ত্রিক, নিজের মতামত প্রকাশ ও জীবনধারণের ন্যায্য অধিকার পায়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসে বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আজও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। দেশে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ঘটেছে ঠিক, তারপরও দেশের সকল জনগণের অন্ন-বস্ত্র- বাসস্থানের পর্যাপ্ত সংস্থান হয়নি। সকলের জন্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের সকল জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার যতক্ষণ পর্যন্ত না নিশ্চিত করা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বৈষম্য পুরোপুরি নিরোধ করা সম্ভব নয়। যে প্রেক্ষাপটকে ঘিরে জুলাই আন্দোলন ঘটেছে, এবার তার পরবর্তী অধ্যায়কে সফল করতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ছাত্র ও জনতার সম্মিলিত শক্তিতে এবার সে লক্ষ্যে উদ্যোগী হতে হবে। দেশ থেকে অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য নিরোধে সবাই মিলে কাজ করতে হবে।
অন্যায়ের প্রতিবাদে ছাত্ররা যে দুর্বার শক্তির স্বাক্ষর রাখতে পারে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশের ইতিহাসের সকল আন্দোলন, সংগ্রামে ছাত্র/নবীনরাই মূল ভূমিকা পালন করেছে। ৫২্’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম, ৯০ এর গণআন্দোলন, ২৪’র গণঅভ্যুত্থান, দেশের ইতিহাসের সকল আন্দোলন, সংগ্রামে ছাত্ররাই প্রথম এগিয়ে এসেছে। ছাত্রদের দেখানো পথে হেঁটেই দেশের আপামর জনসাধারণ তাতে সামিল হয়েছে। তবে কেবল আন্দোলন, সংগ্রামেই নয়, দেশ গঠনেও ছাত্ররা অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শিক্ষিত, নবীন জনগোষ্ঠীর দেশপ্রেমের অঙ্গীকার, দেশের নেতৃত্বের প্রতি সুষম অংশীদারিত্বই পারে একটি রাষ্ট্রকে উন্নয়নের পথনিদর্শন করতে। জুলাই আন্দোলন তার যৌক্তিক ফললাভের পর দেশের জনসেবা বিভাগের বিভিন্ন সেক্টরের অচল অংশগুলোকে সচল করে তুলতে ছাত্ররা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলোতে সহায়তামূলক দায়িত্ব পালন, দরিদ্র অসহায় জনগণের পাশে আর্থিক ও বিভিন্ন সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানো, ইত্যাদি সামাজিক সুরক্ষামূলক কার্যক্রমে অভিভাবকদের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে ছাত্রসমাজের পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের ইতিহাস রচিত হয়। জুলাই আন্দোলনের খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশের কুমিল্লা, নোয়াখালী অঞ্চল এবং৮৭৬ তার কিছুদিন পরেই ময়মনসিংহ বিভাগের নিম্নাঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। সে সময় বন্যাদুর্গতদের সাহায্যার্থে ছাত্রসমাজ অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করে। আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় ছাত্রসমাজের ভূমিকা নিত্যপণ্যের বাজারে ক্রেতা সাধারনের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। চুরি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ঠেকাতে সক্রিয় পাহারাদারের মতো ছাত্র, নবীনদের দূর্দান্ত ভূমিকা দেশের পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
জেলা, উপজেলা প্রশাসনের পাশে দাঁড়িয়ে গঠনমূলক পরামর্শ ও স্বেচ্ছাসেবা প্রদান করে ছাত্রসমাজ। দারিদ্র্যপীড়িত, অভাবগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পাশে আর্থিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে দেশের ছাত্রসমাজ যে সেবা প্রদান করে, তাতে উপকৃত হয় বহু মানুষ। শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদন্ড, তেমনি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জাতির উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত আবিষ্কার, উদ্ভাবনী শক্তির উত্থান হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে শিক্ষার প্রয়োগ, জ্ঞানচর্চার অবদান। একইসঙ্গে শিক্ষা মানুষকে মানবিক হতে সহায়তা করে, সমঅধিকারের চর্চায় উৎসাহ যোগায়। আর যুগে যুগে সমাজ গঠনে নবীনরাই রেখেছে মুখ্য ভূমিকা। প্রবীনদের অভিজ্ঞতাপুষ্ট দিকনির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে নবীনরাই। ২০২৪-এ দেশের নবীন, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীই ছিলো জুলাই আন্দোলনের মূলশক্তি।
একটি আদর্শকে সামনে রেখে, সকল নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিলো। সেদিন যে শপথ নিয়ে সমঅধিকারের দাবিতে ছাত্রজনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এখন সময় এসেছে সে প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপায়িত করার। রাষ্ট্রকাঠামোর যে যে অংশে বৈষম্য বিদ্যমান, সে সবকিছুর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করতে হবে। সমাজের বিভিন্ন অংশে জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ নানা অবহেলা, বঞ্চনার শিকার। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেশের সকল পর্যায় থেকে বৈষম্য হটাতে হবে। নিজ নিজ পরিমন্ডলের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছাত্রসমাজ তার চর্চা করতে পারে।
জুলাই আন্দোলনের পর দেশের আপামর জনগণ এক নতুন সূচনার আশায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। একটি নিয়মতান্ত্রিক, সুশাসিত নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, সকলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে দৃঢ়বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। জুলাই আন্দোলনের পর এক বছর সময় পার হয়ে গিয়েছে। দেশ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু দেশের সে অগ্রযাত্রায় ছাত্রসমাজকে সম্পৃক্ত হতে হবে। তার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। ছাত্রদের নিজেদেরকে তৈরি করে তুলতে হবে। ভবিষ্যতের নির্ভরযোগ্য কান্ডারী হয়ে গড়ে উঠতে হবে। কেবল শিক্ষা নয়, মানবিক মূল্যবোধে বলিয়ান হয়ে উঠতে হবে। তবেই সুযোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে, জুলাই আন্দোলনের আদর্শের সঠিক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ, সফল রাষ্ট্র।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, ময়মনসিংহ।

মো. রিদওয়ানুর রহমান রুবাইয়াৎ : 


























