পেটে গুলি খেয়েছি। মরে যেতে পারতাম। মরি নাই। তবে মরে যাওয়াই ভাল ছিল। এখন পুঙ্গ হয়ে অসহায় জীবনযাপন করছি। আর্থিক অনটনে আড়াই মাসের মেয়েসহ আমার স্ত্রী বাপের বাড়ী চলে গেছে বলে বুকফাঁটা কান্নায় চোখ ভাসালেন জুলাই যোদ্ধা পারভেজ। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নিজের আর্থিক অসহায়তত্বের কথা বলতে গিয়ে অবহেলার স্বীকার হয়েছি। কোন আর্থিক সহযোগীতা মেলেনি।
রোববার (৬ জুলাই) সকালে নিজ বাড়ীতে সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিযোগ করেন জুলাই যোদ্ধা মোঃ পারভেজ মিয়া। পারভেজের বাড়ী ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার কুশমাইল ইউনিয়নের ধামর বেলতলী গ্রামে। সে ঐ গ্রামের বেসরকারী এম্বুলেন্স চালক গোলাম মাওলার ছেলে। দুই ভাই এক বোনের সংসারে এখন অভাব আর অভাব। অভাবের কারনে পারভেজের ছোট ভাই নবম শ্রেনীর শিক্ষার্থী মারুফ মিয়ার লেখাপড়া প্রায় বন্ধ। ছেলের চিকিৎসা করে অসহায় পরিবারটি সর্বস্ব খুঁইয়ে এখন নিঃস্ব। বাড়ী ভিটা ছাড়া তাদের কোন সম্পত্তি নেই বলে কাঁদলেন অসহায় মা পারভিন বেগম।
আহত জুলাই যোদ্ধা মোঃ পারভেজ মিয়া জানান, সারাদেশ তখন উত্তাল। বিজয়ের দ্বারপ্রান্ত আমরা আন্দোলনকারীরা। ৫ আগষ্ট সকাল ১০ টার দিকে গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় দুই গাড়ী বিজিবি সদস্যকে ব্যারিকেট দেয় আন্দোলনকারীরা। হাজার জনতার ব্যারিকেট ভাঙ্গা ছিল দুরুহ। দুপুর একটার দিকে জনতাকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি করে বিজিবি সদস্যরা। একটা গুলি পারভেজের তলপেটে লাগে। সংঙ্গাহীন পারভেজ দুই ঘন্টা পড়েছিল সড়কে। মানুষ মনে করেছিল সে মারা গেছে। সংঙ্গাহীন পারভেজকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে বেসরকারী হাসপাতাল আলহেরাতে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা রক্ত বন্ধ করে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে স্থানান্তর করে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে অপরেশন করে তার পেট থেকে গুলি বের করা হয়। এক সপ্তাহ হাসপতালে ভর্তি থেকে চিৎিসা নেন সে। হঠাৎ করে পারভেজের বাম পা নার্ভ ইন্জুরিতে আক্রান্ত হয়ে অবশ্য হয়ে যায়। তিন মাস ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি থাকে সে। দুই বার তার পায়ে অপারেশন করা হয়েছে। এখনও অবশ তার পা। ভাল হবে কিনা ডাক্তার এখনো নিশ্চিত করতে বলতে পারছে না। এ অবস্থায় গত ২৫ জুন তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল থেকে তাকে ছুটি দেয়া হয়। এখন বাড়ীতে অবন্থান করছে পারভেজ। হুইল চেয়ার ও পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে রাতদিন কাটে তার। গার্মেন্টসকর্মী পারভেজের জীবন দুঃস্ব যন্ত্রনায় ভরা। এরই মধ্যে দেড় মাস বয়সী মেয়ে স্ত্রী বাপের বাড়ী চলে গেছে। নিজেই খাবার খেতে পারিনা তাদেরকে কেমনে ভরনপোষণ করি। এ পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ টাকার মত খরচ হয়েছে। সরকারীভাবে দুই মাস আগে এক লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। এক বছর ধরে চিকিৎসা করছি। কেউ কোন খবর নেয় না। ঋণের চাপে জর্জরিত আমার পুরো পরিবার। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে আমার ছোট ভাইয়ের লেখা পড়া।
অনুদান পাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন ইউএনওর কাছে গিয়ে সহযোগীতার জন্য তিনি কোন সহযোগীতা করে নাই।বরং অবহেলা করেছে। পরে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে গেলে সে ৫ হাজার টাকা সহযোগীতা করেছেন।
আপসোস করে করে বলেন, এই বৈষম্য দূর করার জন্যই তো আমরা জুলাই আন্দোলন করেছি। আমরা কি পেরেছি বৈষম্য দুূর করতে? জুলাই আন্দোলনে যদি মরে যেতাম তবে ভাল হত। অন্তত দেশের জন্য শহীদ হতাম। এখন যে ভাবে বেঁচে আছি এটাকে কি বাঁচা বলে। অবহেলা নিয়ে কত দিন আর বেঁচে থাকা যায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন পারভেজ।
প্রাভেজে মা পারভিন বেগম বলেন, আমার স্বামী সামান্য এম্বুলেন্স চালক। ছেলে গার্মেন্টেসে চাকরী করে সংসার চালাতো। যে সংসার চালাত সেই এখন পঙ্গু। আমরা গরীব মানুষ চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক টাকা ঋণ। নিজেরা তিন বেলা খেতে পারিনা। ছেলের বৌ দেড় মাসের নাতিনকে নিয়ে চলে গেছে বাপের বাড়ীতে।
প্রতিবেশি হুমায়ুন ফরিদ জানান, বাড়ী ভিটা ছাড়া তাদের কোন সম্পত্তি নাই। পারভেজ গার্মেন্টেসে চাকরী করে যে টাকা বেতন পেত সে টাকা দিয়ে সংসার চলতো। জুলাই আন্দোলনে গুলিয়ে এখন সে পঙ্গু। সরকারীভাবে যে টাকা সহযোগীতা পেয়েছে তার চেয়ে চারগুন টাকা ঋণ হয়েছে। সরকারের উচিত অসহায় জুলাই যোদ্ধা পারভেজের পাশে দাঁড়নো।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আরিফুল ইসলাম জানান, অনেক আগে একবার এসেছিলেন। ঐ সময় তাকে কোন সহযোগীতা করতে পারি নাই।






















