নৃশংস এক আগুন-হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন দিপু। মুহূর্তেই নিভে গেছে একটি তাজা প্রাণ, আর চরম অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারে ডুবে গেছে তার স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবন। কারণ দিপুর রোজগার দিয়ে পুরো সংসার চলতো।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় মহানবী (সা:)–কে নিয়ে কটূক্তির মিথ্যা অভিযোগ এনে দিপু চন্দ্র দাসকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও পুলিশ। এ ঘটনায় আসামিদের ফাঁসি চেয়েছেন স্বজনরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় সেদিন বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে। কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ দিপুকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে উত্তেজিত জনতার কাছে হস্তান্তর করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:)–কে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে গত বৃহস্পতিবার রাতে পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
নিহত দিপু চন্দ্র দাস (২৮) তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। দিপু প্রায় তিন বছর আগে বিয়ে করেন। তাঁর দেড় বছর বয়সী একটি শিশুসন্তান আছে। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার অকাল মৃত্যুতে স্বামীহারা হয়েছেন স্ত্রী, পিতৃহারা হয়েছে শিশু সন্তান, আর ছেলের লাশের পাশে নির্বাক হয়ে পড়েছেন অসহায় বাবা-মা। কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে বড় হবে সন্তান–এসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবারটির চোখে-মুখে।
নিহতের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামীকে যারা এভাবে পুড়িয়ে মারল, তাদের বিচার চাই। আমি জানি না এখন সন্তানকে কীভাবে মানুষ করব। বৃদ্ধ বাবা বলেন, এই বয়সে ছেলের লাশ কাঁধে নিতে হবে ভাবিনি। আমাদের বাঁচার আর কোনো অবলম্বন রইল না।
দিপুর চাচাতো ভাই কার্তিক চন্দ্র দাস বলেন, দিপুরা তিন ভাই। দিপু সাত বছর ধরে ভালুকায় গার্মেন্টসে কাজ করে। দুই বছর আগে বিয়ে করেছিল। তার এক বছরের একটি কন্যা সন্তান আছে। দিপু যদি কোনও অপরাধ করে থাকে, তাকে পুলিশে সোপর্দ করা যেতো। কিন্তু তা না করে একদল লোক প্রথমে মারধর করে, পরে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। এ ধরনের ঘটনা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আমরা আসামিদের ফাঁসি দাবি করছি।
আরেক চাচাতো ভাই সাধন চন্দ্র দাস বলেন, দিপুর রোজগার দিয়ে পুরো সংসার চলতো। এখন এই পরিবারটি একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছে। ছোট্ট বাচ্চাটিকে নিয়ে দিপুর স্ত্রী কীভাবে চলবে। তার মৃত্যুতে বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরিবারসহ এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
দিপুর ভাই ও মামলার বাদী অপু চন্দ্র দাস বলেন, আমার ভাই দুই বছর ধরে কোয়ালিটি সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছিল। আমার ভাইকে কী কারণে মারল জানি না। ওরা বলছে, আমার ভাই ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছে, কিন্তু তার কোনো প্রমাণ নেই। যদি এমনটি বলে থাকে, অপরাধ হয়েও থাকে, তাহলে আইনের মাধ্যমে বিচার হতে পারত। কিন্তু নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে, এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় দ্রুত আসামিদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। দিপুর মৃত্যুতে নিভে গেছে একটি সংসারের আলো। এখন দেখার বিষয়, আইনের আলো কি সেই অন্ধকারে একটু হলেও আশার প্রদীপ জ্বালাতে পারে কিনা।
শাহ্ নাফিউল্লাহ সৈকত 





















