ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলী চার লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে চাকরী দিতে না পেরে এক লাখ টাকা টাকা ফেরত দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ে কর্মচারি নিয়োগ দিয়ে পাঁচজনের কাছ থেকে জনপ্রতি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দিনের দিনের পর দিন কোন ছুটি না নিয়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসি।
বিদ্যালয়ে গত ২৪ বছর যাবত একক আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছেন- যে কারণে শিক্ষার মান, একের পর এক এসএসসি রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটিতে নিজের পছন্দমত লোক দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। কাউকে না জানিয়ে নিজের ইচ্ছামত এডহক কমিটিতে জামায়াতপন্থী তিনজনের নাম দিয়ে সভাপতির নাম প্রস্তাব করেছেন। এসব নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মোকছেন আলী জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের লাঙ্গল শিমুল গ্রামের রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ২০০২ সালে তিনি ওই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। ওই বিদ্যালয়ে ৫ জন কর্মচারি ও ১২ জন শিক্ষক রয়েছে।
জানা গেছে, রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা হয়। তখন বিদ্যালয়ে হাফ বিল্ডিং টিন শেডে কার্যক্রম পরিচালনা করে। তখন ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৭৬ জন। হাফ বিল্ডিং ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেলে পরবর্তীতে দুই তলা ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তিনতলা নতুন বিল্ডিং নির্মাণ করে। বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রকম চলমান আছেন। নিচতলা শিক্ষকদের অফিসের কার্যক্রম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় শিক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) স্বরেজমিন গিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলীকে পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ে অন্যান্য শিক্ষকরা জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলী আগামী এক মাসের মাঝে অবসরে যাবেন। তাই গত দুই তিন মাস যাবত অসুস্থতার কথা বলে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসেন না। শিক্ষকদের হাজিরা খাতা ঘেটে এসব কথার সত্যতাও মিলেছে।
বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলার ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে গিয়ে দেখা যায়, ৬ জন শিক্ষার্খী উপস্থিত আছেন। ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষিকা ঈশিতা শাহজাদ। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে মোট কতজন মিক্ষার্থী আছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্খীর সংখ্যা মনে নেই। খাতা দেখে বলতে বলতে হবে।
ওই ক্লাসের শিক্ষার্থী মিম আক্তার বলেন, স্কুলে আসার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। এজন্য শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম। গতকাল কতজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল জানতে চাই মিম বলেন, ৭ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।
৭ম শ্রেণীতে গিয়ে দেখা যায় ৪ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত আছেন। ওই ক্লাসের শিক্ষার্থী ইসমিত আরা বলেন, আজকে আমরা ৪ জন উপস্থিত আছি। গতকাল ৭ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। নিয়মিত গড়ে ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। অষ্টম শ্রেনীতে ৪ জন, ৯ম শ্রেণীতে ৭ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
তৃতীয় তলার ১০ম শ্রেণীর কক্ষে তালা ঝুলানো। কোন শিক্ষার্থীই উপস্থিত ছিল না। তখন পাশেই দাড়ানো ছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষক সারোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়েছে। যে কারণে আজ কোন শিক্ষার্খী উপস্থিত নেই। আপনারা ঠিক মত ক্লাস নিলে শিক্ষার্থীরা কোচিং কেন যাবে জানতে চাইলে, তার কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
আপনারা বাচ্চাদের নিয়মিত মনিটরিং করেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে মোবাইলে বাচ্চাদের খোঁজ নেয়া হয়। তাছাড়া, আমাদে৷ সময় শিক্ষকরা যেভাবে বাচ্চাদের মনিটরিঙ করতেন, এবাবে করা হয় না। বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১৭৬ জন শিক্ষার্থী আছেন বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় মফিজ উদ্দিন বলেন, আমার মেয়ে আনিকা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে। রোকন উদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে লেখাপড়ার মান খারাপ হওয়ায় পাশের অন্য একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছি। বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান অনেক ভাল ছিল। কিন্তু, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকছেন আলীর একক আধিপত্তের কারণে লেখাপড়ার মান একেবারে খারাপ হয়ে গেছে। যে কারণে আশপাশের কোন অভিবাবক তার বাচ্চাকে এখানে ভর্তি করে না।
আজিজুল হক নামে আরেক অভিবাবক বলেন, লেখাপড়া মান একেবারেই খারাপ। যে কারণে আমার বাচ্চাকেও অন্য স্কুলে ভর্তি করেছি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের একগেয়েমীর কারণে এলাকার কেউ তাকে দেখতে পারে না। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, এডহক কমিটি তার ইচ্ছামত তৈরী হয়। বিদ্যালয়ের কমিটি তৈরীতে এই বিদ্যালয়ে কোনদিন কোন নির্বাচন হয়নি। প্রধান শিক্ষকোর পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি তৈরী করে। বর্তমানে এডহক কমিটি নিয়ে বিতর্ক চলছে। এডহক কমিটিতে তিন জনের নাম দিয়েছে। কিন্তু, ওই তিন কারা, কেউ তাদের নাম বলতে পারে না।
চাকরী দিতে না পেরে টাকা ফেরত
সম্প্রতি হুমায়ুন নামে একজনকে বিদ্যালযের ল্যাব সহকারি পদে চাকরী দেয়ার কথা বলে আট লাখ টাকা চুক্তি করেন। চার লাখ টাকা প্রধান শিক্ষককে দেন হুমায়ুন ও তার বড় ভাই কালিমুল্লাহ। পরে চাকরী দিতে না চার লাখ টাকার এক লাখ টাকা ফেরত। বাকি তিন লাখ দেই দিচ্চি বলে তালবাহানা করছেন।
হুমায়ুন বর্তমানে ঢাকার কোন এক কোম্পানীতে চাকরী করছেন। যে কারণে তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে, তার বড় ভাই কালিমুল্লাহ বলেন, আমার ভাই হুমায়ুনকে বিদ্যালযে ল্যাব সহকারি পদে চাকরী দেয়ার কথা বলে আট লাখ টাকা চুক্তি করেছিলেন। পরে চার লাখ টাকা প্রধান শিক্ষককে দেয়া হয়। পরে চাকরী দিতে না পেরে এক লাখ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। বাকি তিন লাখ দেই দিচ্চি বলে তালবাহানা করছেন।
এডহক কমিটি নিয়ে বিতর্ক
সম্প্রতি এডহক কমিটির সভাপতি পদের জন্য আবেদন করেছেন প্রধান শিক্ষক। তবে, কোন তিন জনের নাম আবেদন করা হয়েছে, বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে এলাবাসি কেউ তাদের নাম জানে না। এজন্য এডহক কমিটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে, প্রধান শিক্ষক ওই সংবাদকর্মীর কাছে তিনজনের নাম প্রকাশ করেছেন। সভাপতি প্রার্থী তিনজন হলেন, আব্দুল হক, আব্দুল হাই ও মো. শহিদুল্লাহ। তবে, স্থানীয় একটি সুত্র বলছে, সভাপতি প্রার্থী তিনজন জামায়াতপন্থী। প্রধান শিক্ষকের অবসরের শেষে এসে নিজের অপকর্ম ডাকতে নিজের পছন্দ মত সভাপতি প্রার্থীর নাম দিযেছেন।
এডহক কমিটির সভাপতির নাম প্রকাশ না করার জন্য গত ১৪ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সদস্য শাহ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন।
অভিযোগে উল্লেখ্য করা হয়, প্রধান শিক্ষক আগামী ১৭ জুন অবসরে যাবেন। যে কারণে তার পছন্দের লোকের নাম সভাপতি হিসাবে আবেদন করেছেন। অবসরে যাওয়ার আগে দীর্ঘ ২৪ বছরের অপকর্ম ডাকতে এমন কাজ করেছেন।
অভিযোগে আরও উল্রেখ্য করা হয়, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়ম ও সীমাহীন দূর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলী বিদ্যালয় পরিচালনায় দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিদ্যালয়টি ধংসের দ্বারপ্রান্তে এসে গেছে। যে কারণে বিদ্যালয়ের রেখাপড়ান মান একে বারে খারাপ হয়ে গেছে। তাই, স্থানীয়রা বাচ্চাদের এখানে ভর্তি না করে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করছেন।
এবিষয়ে শাহ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এডহক কমিটির সভাপতির নাম ঘোষণা না করার জন্য আবেদন করেছি। কারণ, গত ২৪ বছরের দুর্নীতি ডাকতে ইচ্ছামত নিজের পছন্দের নাম দিয়েছেন। এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রতিটি কর্মচারী নিয়োগে জনপ্রতি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা দুনীতি করেছেন।
যা বলছেন বিদ্যালযের শিক্ষকরা
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, স্যার একরোখা, নিজের খেয়াল খুশিমত চলেন। যে কারণে, এলাকার মানুষ তাকে দেখতে পারে না। এডজক কমিটিতে সভাপতি হিসাবে কাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। তাছাড়া যা রটে, তা একটু হলেও ঘটে।
বিদ্যালযের শিক্ষার মানের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার মান একেবারে বাল তা বলা যাবে না। কারণ, এত বড় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৭৬ জন। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ৩২ জন অংশগ্রহণ করে মাত্র ৩২ জন পাশ করেছেন।
এবিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকছেদ আলী সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চাকরীর শেষ মুহুর্তে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
এবিষয়ে জানতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ভুঞার নাম্বারে একাধিক বার ফোন করলেও তিনি লাইন কেটে দেন।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও বলেন, অভিযোগের বিষয়ে এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না। তবে, অভিযোগটি খুজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মঞ্জুরুল ইসলাম 

























