০৩:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় কবির জন্মদিন আজ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • পোষ্টের সময় : ১০:০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ মে ২০২৫
  • ৪০৩ ভিউ :

 

আজ ২৫ মে, বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত কণ্ঠ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী। বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের গৌরবময় প্রতীক এই কবি শুধু সাহিত্যিক নন—তিনি এক জীবন্ত চেতনা, এক অনির্বাণ প্রেরণা, যিনি যুগে যুগে বাঙালি জাতিকে আলোকিত করেছেন সংগ্রাম ও প্রতিবাদের পথ দেখিয়ে।

 

জন্ম ও শৈশব:

১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মক্তব শিক্ষক। অল্প বয়সেই পিতৃহারা নজরুল আর্থিক সংকটের মধ্যেও সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেন। লেটো দলে গান লেখার মাধ্যমে তাঁর সৃজনশীল যাত্রা শুরু হয়।

 

সাহিত্য ও সংগীতে অবদান:

নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বহুমুখী প্রতিভা। তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান, সঙ্গীতসৃষ্টি, সাংবাদিকতা—সব ক্ষেত্রে রেখেছেন তাঁর বৈপ্লবিক ও মানবিক ছাপ।

তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যেখানে তিনি শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন মুক্তির আহ্বান।

 

তিনি প্রায় ৩,০০০ গান রচনা করেন, যার অধিকাংশই ‘নজরুলগীতি’ নামে পরিচিত। তাঁর গানগুলোতে যেমন আছে প্রেমের কোমলতা, তেমনি আছে সাম্যের আহ্বান, দ্রোহের অগ্নিশিখা ও মানবতার জয়গান।

 

সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা:

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে হিন্দু-মুসলিম একতার কথা, নারীর অধিকার, শ্রমিকের মুক্তি, জাতিভেদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এজন্য তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘দারিদ্র্য’ প্রকাশের পর সমাজে সৃষ্টি হয় তুমুল আলোড়ন।

 

বাংলাদেশের জাতীয় কবি:

১৯৪২ সালে নজরুল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং বাকশক্তি হারান। দীর্ঘ নীরব জীবন শেষে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করে এবং সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

তিনি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

 

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানমালা:

জাতীয় কবির জন্মদিন উপলক্ষে সারা দেশে নানা আয়োজনে তাঁর স্মরণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান ‘চব্বিশের গণজাগরণ: নজরুলের উত্তরাধিকার’।

অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। অতিথি ছিলেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুর রহমান শিবলী এবং কবির নাতনী খিলখিল কাজী।

 

এই আয়োজনে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের নজরুল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রাখায় বিশিষ্টজনদের মাঝে।

এছাড়া আগামীকাল ২৬ মে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ঢাকায় আয়োজিত হচ্ছে নজরুল সঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তির বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।

 

নজরুল: প্রাসঙ্গিকতা ও উত্তরাধিকার

আজকের বৈষম্য ও বিদ্বেষপূর্ণ বিশ্বে নজরুলের সাহিত্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখা বারবার মনে করিয়ে দেয়—ধর্ম, জাতি বা শ্রেণির নয়, মানুষই মানুষের আসল পরিচয়।

নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন—প্রেম, দ্রোহ এবং মুক্তির জন্য কলমকে অস্ত্র বানানো যায়। তাঁর চিন্তা ও চেতনা আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

 

জাতীয় কবির জন্মদিনে তাঁর অমর সৃষ্টি ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। নজরুলের লেখা শুধু পঠনের জন্য নয়—তা বাঁচার পথ, সংগ্রামের সঙ্গী, ও মানবিক মূল্যবোধের মশাল।

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

প্রয়োজনে বিমান টিকিট দেব, তবুও দেশে আসুন: হাসিনাকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী

জাতীয় হিফজ প্রতিযোগিতায় দেশসেরা দুই হাফেজ, নকলায় রাজকীয় সংবর্ধনা

06 November 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

জাতীয় কবির জন্মদিন আজ

পোষ্টের সময় : ১০:০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ মে ২০২৫

 

আজ ২৫ মে, বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত কণ্ঠ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী। বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের গৌরবময় প্রতীক এই কবি শুধু সাহিত্যিক নন—তিনি এক জীবন্ত চেতনা, এক অনির্বাণ প্রেরণা, যিনি যুগে যুগে বাঙালি জাতিকে আলোকিত করেছেন সংগ্রাম ও প্রতিবাদের পথ দেখিয়ে।

 

জন্ম ও শৈশব:

১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মক্তব শিক্ষক। অল্প বয়সেই পিতৃহারা নজরুল আর্থিক সংকটের মধ্যেও সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেন। লেটো দলে গান লেখার মাধ্যমে তাঁর সৃজনশীল যাত্রা শুরু হয়।

 

সাহিত্য ও সংগীতে অবদান:

নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বহুমুখী প্রতিভা। তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান, সঙ্গীতসৃষ্টি, সাংবাদিকতা—সব ক্ষেত্রে রেখেছেন তাঁর বৈপ্লবিক ও মানবিক ছাপ।

তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যেখানে তিনি শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন মুক্তির আহ্বান।

 

তিনি প্রায় ৩,০০০ গান রচনা করেন, যার অধিকাংশই ‘নজরুলগীতি’ নামে পরিচিত। তাঁর গানগুলোতে যেমন আছে প্রেমের কোমলতা, তেমনি আছে সাম্যের আহ্বান, দ্রোহের অগ্নিশিখা ও মানবতার জয়গান।

 

সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা:

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে হিন্দু-মুসলিম একতার কথা, নারীর অধিকার, শ্রমিকের মুক্তি, জাতিভেদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এজন্য তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘দারিদ্র্য’ প্রকাশের পর সমাজে সৃষ্টি হয় তুমুল আলোড়ন।

 

বাংলাদেশের জাতীয় কবি:

১৯৪২ সালে নজরুল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং বাকশক্তি হারান। দীর্ঘ নীরব জীবন শেষে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করে এবং সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

তিনি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

 

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানমালা:

জাতীয় কবির জন্মদিন উপলক্ষে সারা দেশে নানা আয়োজনে তাঁর স্মরণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান ‘চব্বিশের গণজাগরণ: নজরুলের উত্তরাধিকার’।

অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। অতিথি ছিলেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুর রহমান শিবলী এবং কবির নাতনী খিলখিল কাজী।

 

এই আয়োজনে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের নজরুল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রাখায় বিশিষ্টজনদের মাঝে।

এছাড়া আগামীকাল ২৬ মে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ঢাকায় আয়োজিত হচ্ছে নজরুল সঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তির বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।

 

নজরুল: প্রাসঙ্গিকতা ও উত্তরাধিকার

আজকের বৈষম্য ও বিদ্বেষপূর্ণ বিশ্বে নজরুলের সাহিত্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখা বারবার মনে করিয়ে দেয়—ধর্ম, জাতি বা শ্রেণির নয়, মানুষই মানুষের আসল পরিচয়।

নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন—প্রেম, দ্রোহ এবং মুক্তির জন্য কলমকে অস্ত্র বানানো যায়। তাঁর চিন্তা ও চেতনা আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

 

জাতীয় কবির জন্মদিনে তাঁর অমর সৃষ্টি ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। নজরুলের লেখা শুধু পঠনের জন্য নয়—তা বাঁচার পথ, সংগ্রামের সঙ্গী, ও মানবিক মূল্যবোধের মশাল।

Share this news as a Photo Card