বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পোল্ট্রি শিল্পের অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিশেষ সহায়তা বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)।
বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সংগঠনটির সভাপতি শাহ হাবিবুল হক। তিনি বলেন, ন্যায্য দামে ডিম ও মুরগির সরবরাহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির অব্যাহত ধারা, নিরাপদ প্রাণিজ প্রোটিনের জোগান এবং সাধারণ মানুষের নাগালে ডিম ও মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

বিপিআইএর তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের পোল্ট্রি শিল্প প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজারে রূপ নিয়েছে, যেখানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। এই খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। চার দশকের প্রচেষ্টা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি নির্ভরতা মিলে দেশের পোল্ট্রি অবকাঠামো আজকের অবস্থানে এসেছে।
তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং বাজার অস্থিরতায় শিল্পটি বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। ডলার মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে খাদ্য, বাচ্চা, ভ্যাকসিন ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা টিকে থাকতে না পেরে খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি করছে বলে জানিয়েছে বিপিআইএ।
![]()
পোল্ট্রি খাতকে আরও টেকসই করতে এবং উৎপাদনকারী ও ভোক্তাবান্ধব পরিবেশ গড়তে এসোসিয়েশনটি জাতীয় বাজেটে ছয়টি প্রধান দাবি উপস্থাপন করেছে:
১. প্রযুক্তি ক্রয়ে সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ:
ছোট ও মাঝারি খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধিত লেয়ার ও ব্রয়লার খামারিদের জন্য নামমাত্র সুদে মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করতে বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের আহ্বান জানানো হয়েছে।
২. ডিমের বাজারে স্থিতিশীলতা ও আধুনিক স্টোরেজ:
রমজান এবং ঈদকেন্দ্রিক সময়কালে ডিমের চাহিদা হ্রাস পায়, যার ফলে খামারিরা লোকসানে পড়ে। এই সংকট মোকাবিলায় ডিম উৎপাদন প্রবণ জেলাগুলোতে আধুনিক ও উন্নত স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বিপিআইএ। এই খাতে পাইলটিং প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে থোক বরাদ্দ রাখার দাবিও জানানো হয়।
৩. বিদ্যুৎ বিলে ছাড়ের প্রক্রিয়া সহজীকরণ:
বর্তমানে ছোট খামারিরা বিদ্যুৎ বিলে ২০% রিবেটের সুবিধা নিতে পারেন না নানা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে। ট্রেড লাইসেন্স, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন এবং বিপিআইএ’র পরিদর্শন রিপোর্টের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ছাড়ের সুবিধা প্রদান এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
৪. পোল্ট্রি পণ্য বিজনেস সেন্টার স্থাপন:
ফড়িয়া ও মৌসুমি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম কমাতে খামারিদের সরাসরি বিক্রয়ের সুযোগ তৈরি করতে ‘পোল্ট্রি পণ্য বিজনেস সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। জেলার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট স্থানে অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে তোলার জন্যও বাজেটে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনরুদ্ধার:
অতি বৃষ্টি, বন্যা ও ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের আর্থিক সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারে বাজেটে থোক বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারেন এবং প্রোটিন সরবরাহে ঘাটতি না হয়।
৬. উচ্চ শুল্ক হার হ্রাসের প্রস্তাব:
সম্প্রতি এসআরও নং ২০৩ (২৯ মে ২০২৫) এর মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে পোল্ট্রি ফিড ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ট্যাক্স ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হলেও, কিছু HS Code-এ এখনও উচ্চ শুল্ক বহাল রয়েছে। এগুলোর পুনর্মূল্যায়ন ও শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বিপিআইএ।
বিপিআইএ সভাপতি শাহ হাবিবুল হক বলেন, “পোল্ট্রি শিল্প সরল সমীকরণে চলে না। প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখেও খামারিরা প্রতিনিয়ত দেশের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে প্রোটিন সরবরাহ নিশ্চিত করে যাচ্ছেন। তাই জাতীয় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে বাজেটে পোল্ট্রি শিল্পের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া আবশ্যক।”






















