পুরনো দিনের কথা চিন্তা করা যাক। লোকালয়ের জনসাধারণ চাইলেও যখন সবরকম পণ্যের যোগান পেতো না। অনেক পণ্যের চাহিদা মেটাতে পাড়ি দিতে হতো বহুদূরের পথ। যোগাযোগ ব্যবস্থাও তখন এখনকার মত উন্নত নয়। আর স্থানীয় দোকানগুলোতে খুব প্রয়োজনীয় কিছু মালামালই পাওয়া যেতো। এ সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠতে এবং প্রয়োজনীয় সব পণ্যের চাহিদা মেটানোর তাগিদ থেকে সপ্তাহে অথবা মাসে নির্দিষ্ট দিনগুলোতে বৃহৎ পরিসরে বাজার বা হাটের আয়োজন করা হতো। এ আয়োজন হতো স্থানীয় পর্যায়ে স্থানীয় অধিবাসীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশে মূলত গ্রামাঞ্চলগুলোতে হাটের দেখা মেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, নদীর তীর ঘেঁষে অথবা বৃহৎ, পুরনো বটগাছকে কেন্দ্র করেই হাটগুলোর সৃষ্টি হয়েছিলো। শহরের বাজারগুলোতে সবসময় সবরকম পণ্য পাওয়া গেলেও গ্রামের দিকে, বিশেষ করে যেসব গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল, সেখানে হাটগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। বলা যেতে পারে, বিংশ শতাব্দীর দ্বার পেরিয়ে, যোগাযোগ-প্রযুক্তির উন্নয়নের এযুগেও দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য হাটের গুরুত্ব কম নয়।
মূলত আঞ্চলিক পরিসরে বৃহৎ চাহিদা যোগানের প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্র করেই হাটের উৎপত্তি। হাটগুলোতে বহু মৌসুমী বিক্রেতার দেখা মেলে, যেখানে নিজ উৎপাদিত পণ্য বাঁধাধরা কোনো স্থান বা মাধ্যম (আরৎ, দোকান) ছাড়াই স্বহস্তে বিক্রয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে তারা হাজির হয়। এমনকি অনেক নারী বিক্রেতাও বাড়ির আঙিনার গাছের ফল বা গৃহপালিত হাঁস-মুরগি বা সবজিক্ষেতের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে হাটে নিয়ে আসে। রকমারি পণ্যের সমাহার ঘটে হাটে। যেসব পণ্য সাধারণভাবে বাজার অথবা দোকানগুলোতে যেকোনো সময় মেলেনা। পছন্দ অনুযায়ী সেখান থেকে নিজ প্রয়োজনীয়তা মেটায় ক্রেতারা। মধ্যস্বত্বভোগীদের নিরঙ্কুশ হস্তক্ষেপ ছাড়া উপযুক্তমূল্যে ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্য দিয়ে উপকৃত হয় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়পক্ষ।
আঞ্চলিক উৎপাদনের উপর নির্ভর করে কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটেও হাটের উপস্থিতি মেলে। যেমন, কোনো এলাকায় হয়তো কারুপণ্য, মাটির তৈজসপত্র, পাটজাত দ্রব্য বা তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের রেওয়াজ রয়েছে। সে এলাকার অধিকাংশ অধিবাসী এসকল উৎপাদনের সাথে জড়িত। আবার অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট ফলজ বা খাদ্যপণ্যের ব্যাপক উৎপাদন হয়। এক্ষেত্রে ঐসকল এলাকায় নির্দিষ্ট ঐসব পণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে হাট। এ ধরনের হাটগুলোতে বহু দূরদূরান্ত থেকে নির্দিষ্ট পণ্যক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রেতাসাধারনের আগমন ঘটে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে আবার পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে দেখা মেলে আদিবাসী হাটের।
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে দেশের হাটগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। দেশের নানাপ্রান্তে শতাব্দী প্রাচীন অনেক হাটের দেখা মেলে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালের জেলাওয়ারি এক তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশে সর্বমোট ১০,৭৫৬টি হাটবাজারের হিসাব পাওয়া যায়। তালিকা অনুযায়ী বিভাগীয় জেলা ঢাকায় ২০৭টি, ময়মনসিংহে ৪৫৩টি, চট্টগ্রামে ৩৩৫টি, রাজশাহীতে ১৭৬টি, সিলেটে ২৩৫টি, খুলনায় ১৬১টি, বরিশালে ১৭৫টি এবং রংপুরে ১৯৮টি হাট-বাজার রয়েছে। দেশের নওগাঁ জেলায় সর্বাধিক ১,০৩৪টি হাটবাজার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শুধুমাত্র হাট হিসেবে বসে সাপ্তাহিক দিনগুলোতে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঢাকার দোহার উপজেলার জয়পাড়া বাজারের হাট, ঠাকুরগাঁও জেলার লাহিড়ী হাট, জামালপুরের তুলসিপুরের ঘোড়ারহাট, কুষ্টিয়ার রাজারহাট, মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর এবং পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠির কুড়িয়ানা নৌকার হাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরের বাইশমৌজা হাট, টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের জলছত্র আনারস হাট, যশোর জেলার ঝিকরগাছা গদখালির ফুলের হাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের এবং রাজশাহীর পুঠিয়া বানেশ্বরের আমের হাট যেখানে মৌসুমে সপ্তাহের প্রতিদিনই হাট বসে, ঝালকাঠি জেলার ভিমরুলির ভাসমান হাট, নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আহসানগঞ্জ বাঁশ ও বেতপণ্যের হাট প্রভৃতি।
কোরবানির সময় দেশের নানাপ্রান্তে অস্থায়ীভিত্তিতে পশুরহাট গড়ে ওঠে। এসব মৌসুমী হাট কোরবানির পশুর কেনাবেচার মধ্য দিয়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। মূলত গরু ও ছাগলের কেনাবেচা হলেও উল্লেখযোগ্য কিছু হাটে উট, মহিষ, ভেড়া প্রভৃতি পশুও পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব অস্থায়ী কোরবানীর হাটগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান সময়ে সারাদেশজুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য পশুর খামারের মালিকরা এসব হাটগুলোকে টার্গেট করেই খামার ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রায়নের এইযুগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচামালের দৈনন্দিন যোগানের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পণ্যচাহিদাও বেড়েছে কয়েকগুণ। আর সে চাহিদা দ্রæত পূরণে আকাঙ্ক্ষা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়পক্ষেরই। সে জায়গা থেকে, প্রতিদিনকার বাজারব্যবস্থার সাথে পাল্লা দিয়ে সাপ্তাহিক হাটের গুরুত্ব তুলনামূলক কমেছে, একথা স্বীকার্য। তারপরেও গ্রামবাংলা ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ দেশের একটি বিরাট জনসংখ্যার জন্য নিত্যপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে হাটগুলোই মূল ভূমিকা পালন করে থাকে।
কালের সাথে দেশের বহু হাট আজ বিলুপ্তির পথে। তবে যথার্থ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে দেশের হাটগুলোকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলা সম্ভব। একইসাথে হাটগুলোকে কাজে লাগিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো গেলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়পক্ষ লাভবান হবে। হাটগুলোতে কৃষক বা উৎপাদনকারীদের জন্য আলাদা কর্নার স্থাপন করা যায়। ইজারা ব্যতীত অথবা নামমাত্র ইজারায় এসব কর্নার উন্মুক্ত করে দেয়া হলে সরাসরি কৃষক লাভবান হবে। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব রোধে বাজার তদারকি করতে হবে। ক্রেতা বা পাইকারদের সাথে সংযোগের জন্য কৃষক, উৎপাদনকারীদের কাছে একটি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের মোবাইল নাম্বার পৌঁছে দেয়া যায়। যাতে হাটের নির্ধারিত দিনে পণ্য নিয়ে আসার জন্য উৎপাদনকারী আগে থেকেই যোগাযোগ করতে পারে। পাইকারদের পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে হাটগুলোর সাথে বৃহত্তর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। হাটগুলোতে প্রয়োজনীয়তার নিরিখে স্টোরেজ ব্যবস্থা স্থাপনে উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়। এ সকল পদক্ষেপের সফল বাস্তবায়ন করা গেলে সাপ্তাহিক হাটগুলো নবরূপে জেগে উঠবে।
গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সামাজিক সংযোগেও হাটগুলোর ভূমিকা রয়েছে। সাপ্তাহিক হাটের দিনগুলোতে কয়েক গ্রামের মানুষের সাক্ষাৎ হয়, কুশলাদি বিনিময় হয়। হাটগুলো শুধু কেনাবেচা নয়, বাংলাদেশের কৃষ্টি-কালচারের সাথেও জড়িয়ে আছে। ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে ইতিহাস বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। হাটের গুরুত্ব যেমন অতীতে সীমাহীন ছিলো, তেমনি বর্তমান আধুনিক যুগেও সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে হাটগুলোকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা সম্ভব। এতে করে আঞ্চলিক ব্যবসার সমৃদ্ধি হবে, অর্থনীতি লাভবান হবে, বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে বাংলার ঐতিহ্য হাটগুলো।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, ময়মনসিংহ।

মো. রিদওয়ানুর রহমান রুবাইয়াৎ : 

























