০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিস্মৃতির অন্তরালে মানুষ কেন মানুষকে ভুলে যায়?

  • শাকিল বাবু
  • পোষ্টের সময় : ০১:১৮:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
  • ২০৯ ভিউ :

স্মৃতি আর বিস্মৃতি-মানুষের জীবনের মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। আমরা যেমন অনেক কিছু মনে রাখতে ভালোবাসি, তেমনি অজান্তেই অনেক কিছু ভুলে যাই। কিংবা আবার অনেক কিছু ভুলে যেতে চাইলেও বারবার মনে পড়ে। এখন প্রশ্ন হলো, রক্তের সম্পর্কের বা একসময়ের খুব কাছের মানুষগুলোকে আমরা কেন ভুলে যাই? এটি কি নিছক সময়ের প্রভাব, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ? আবার এই ভুলে যাওয়া মানে সবকিছু মন থেকে পুরোপুরি মুছে যাওয়া নয়। বরং আমরা মনের অজান্তেই কিছু মানুষের ক্ষেত্রে প্রাধান্যতা কমিয়ে ফেলি বা বাড়িয়ে দেই। একবার ভাবুন সেই ছোটো বেলার কথা, যখন আপনার বাল্যকালের বন্ধুই ছিল আপনার খেলার সাথী। ভোরের আকাশে সূর্য উঠতেই চলে আসতো আপনার বাসায়। সারাদিনের সঙ্গী থাকতো সেই ছোট্ট বন্ধুটি। অথচ সময়ের ব্যবধানে আপনি তাকে হারিয়ে ফেলেছেন। হারিয়ে ফেলেছেন আপনার সোনালী দিনগুলো। ভুলে গিয়েছেন আপনার চিরোচেনা সেই জায়গাগুলো যেখানে আপনার সময়গুলো কাটতো আনন্দে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যদি আমরা দেখি, তাহলে ভুলে যাওয়াটা আমাদের মস্তিষ্কের একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। একে বলা হয় ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’। আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা হার্ডড্রাইভের মতো; যদি অপ্রয়োজনীয় সব স্মৃতি এটি জমা করে রাখতো, তবে নতুন কিছু শেখা বা মনে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়তো। যখন কোনো মানুষের সাথে আমাদের দীর্ঘকাল যোগাযোগ থাকে না, মস্তিষ্ক ধরে নেয় সেই তথ্যটি আর দরকার নেই। ফলে ধীরে ধীরে সেই স্মৃতির সংযোগগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষের জীবন স্থির নয়। স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র-জীবনের প্রতিটি ধাপে আমাদের চারপাশের মানুষগুলো বদলে যায়। এই বদলে যাওয়ার মিছিলে পুরনোরা অনেক সময় হারিয়ে যায়। এখানে ‘ভুলে যাওয়া’ মানে এই নয় যে তাকে আর চেনা যাচ্ছে না, বরং জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের ‘প্রায়োরিটি’ বা অগ্রাধিকার বদলে গেছে। নতুন দায়িত্ব এবং নতুন সম্পর্কের চাপে পুরনো স্মৃতিগুলো ধুলোবালি পড়া অ্যালবামের মতো অবচেতনের কোনো এক কোণে পড়ে থাকে।

কথায় আছে, “আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড।” আবেগ অনেকটা জ্বালানির মতো; যোগাযোগ না থাকলে সেই জ্বালানি ফুরিয়ে আসে। তিক্ত অভিজ্ঞতাও মানুষকে ভুলতে বাধ্য করে। অনেক সময় আমরা সচেতনভাবেই কাউকে ভুলে থাকতে চাই নিজেকে রক্ষা করার জন্য। সম্পর্কের ভাঙন বা অবহেলা থেকে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, মস্তিষ্ক সেখানে ‘ভুলে যাওয়া’ নামক প্রলেপ দিয়ে আমাদের সুস্থ রাখার চেষ্টা করে। বর্তমানে আমরা এক অদ্ভুত ‘হাইপার-কানেক্টেড’ যুগে বাস করছি। হাজার হাজার ফেসবুক ফ্রেন্ড আর ফলোয়ারের ভিড়ে আমরা মানুষের সংখ্যা গুনছি, কিন্তু মানুষ চিনছি না। এই ডিজিটাল ব্যস্ততা আমাদের স্মৃতিকে অগভীর করে দিচ্ছে। আজ যাকে নিয়ে আমরা মাতামাতি করছি, কাল অন্য কারো নোটিফিকেশনে তাকে অনায়াসেই ভুলে যাচ্ছি। আমাদের স্মৃতির আয়ু এখন অনেকটা সোশ্যাল মিডিয়া স্টোরির মতোই-মাত্র ২৪ ঘণ্টা! মনে আছে সেই ‘ফ্রেন্ডস ফরইভার’ গ্রুপের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন ক্যাম্পাসে নতুন নতুন ফ্রেন্ড। কত শত পরিকল্পনা নিয়ে খুলেছিলেন সেই গ্রুপটি। অথচ সময়ের পরিক্রমায় হয়তোবা চ্যাটলিস্টের সবচেয়ে নিচে পড়ে আছে গ্রুপটি। এখন আর মেসেজ আসে না “চল সবাই বের হই”। কারণ সবাই এখন ব্যাস্ত শেষ পর্যায়ে ক্যারিয়ার গুছাতে।

দার্শনিক দিক থেকে দেখলে, ভুলে যাওয়াটা জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি মানুষ তার জীবনের সব শোক, বিচ্ছেদ আর হারানো মানুষের স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়াতো, তবে জীবন থমকে যেতো। পুরনোকে ভুলে যাওয়ার জায়গা থেকেই নতুনের আবাহন ঘটে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো-“সব পাখি ফেরে এই নীড়ে, সব নদী-ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন।” পরিশেষে বলা যায়, মানুষ মানুষকে ভুলে যায় বেঁচে থাকার তাগিদে, বিবর্তনের প্রয়োজনে। তবে কিছু স্মৃতি পাথরখোদাই অক্ষরের মতো থেকে যায়, যা সময় বা বিজ্ঞান কোনো কিছুই মুছে ফেলতে পারে না। ভুলে যাওয়া যেমন স্বাভাবিক, কিছু স্মৃতি বয়ে বেড়ানোও তেমনি মানবিক।

লেখকঃ মো. শাকিল বাবু (সাংবাদিক)

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

নাটকীয় কামব্যাকে জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল

সেরিব্রাল পালসি ও অকুপেশনাল থেরাপি: শিশুর সম্ভাবনাকে বিকশিত করার এক নির্ভরযোগ্য পথ

29 June 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

বিস্মৃতির অন্তরালে মানুষ কেন মানুষকে ভুলে যায়?

পোষ্টের সময় : ০১:১৮:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

স্মৃতি আর বিস্মৃতি-মানুষের জীবনের মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। আমরা যেমন অনেক কিছু মনে রাখতে ভালোবাসি, তেমনি অজান্তেই অনেক কিছু ভুলে যাই। কিংবা আবার অনেক কিছু ভুলে যেতে চাইলেও বারবার মনে পড়ে। এখন প্রশ্ন হলো, রক্তের সম্পর্কের বা একসময়ের খুব কাছের মানুষগুলোকে আমরা কেন ভুলে যাই? এটি কি নিছক সময়ের প্রভাব, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ? আবার এই ভুলে যাওয়া মানে সবকিছু মন থেকে পুরোপুরি মুছে যাওয়া নয়। বরং আমরা মনের অজান্তেই কিছু মানুষের ক্ষেত্রে প্রাধান্যতা কমিয়ে ফেলি বা বাড়িয়ে দেই। একবার ভাবুন সেই ছোটো বেলার কথা, যখন আপনার বাল্যকালের বন্ধুই ছিল আপনার খেলার সাথী। ভোরের আকাশে সূর্য উঠতেই চলে আসতো আপনার বাসায়। সারাদিনের সঙ্গী থাকতো সেই ছোট্ট বন্ধুটি। অথচ সময়ের ব্যবধানে আপনি তাকে হারিয়ে ফেলেছেন। হারিয়ে ফেলেছেন আপনার সোনালী দিনগুলো। ভুলে গিয়েছেন আপনার চিরোচেনা সেই জায়গাগুলো যেখানে আপনার সময়গুলো কাটতো আনন্দে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যদি আমরা দেখি, তাহলে ভুলে যাওয়াটা আমাদের মস্তিষ্কের একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। একে বলা হয় ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’। আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা হার্ডড্রাইভের মতো; যদি অপ্রয়োজনীয় সব স্মৃতি এটি জমা করে রাখতো, তবে নতুন কিছু শেখা বা মনে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়তো। যখন কোনো মানুষের সাথে আমাদের দীর্ঘকাল যোগাযোগ থাকে না, মস্তিষ্ক ধরে নেয় সেই তথ্যটি আর দরকার নেই। ফলে ধীরে ধীরে সেই স্মৃতির সংযোগগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষের জীবন স্থির নয়। স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র-জীবনের প্রতিটি ধাপে আমাদের চারপাশের মানুষগুলো বদলে যায়। এই বদলে যাওয়ার মিছিলে পুরনোরা অনেক সময় হারিয়ে যায়। এখানে ‘ভুলে যাওয়া’ মানে এই নয় যে তাকে আর চেনা যাচ্ছে না, বরং জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের ‘প্রায়োরিটি’ বা অগ্রাধিকার বদলে গেছে। নতুন দায়িত্ব এবং নতুন সম্পর্কের চাপে পুরনো স্মৃতিগুলো ধুলোবালি পড়া অ্যালবামের মতো অবচেতনের কোনো এক কোণে পড়ে থাকে।

কথায় আছে, “আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড।” আবেগ অনেকটা জ্বালানির মতো; যোগাযোগ না থাকলে সেই জ্বালানি ফুরিয়ে আসে। তিক্ত অভিজ্ঞতাও মানুষকে ভুলতে বাধ্য করে। অনেক সময় আমরা সচেতনভাবেই কাউকে ভুলে থাকতে চাই নিজেকে রক্ষা করার জন্য। সম্পর্কের ভাঙন বা অবহেলা থেকে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, মস্তিষ্ক সেখানে ‘ভুলে যাওয়া’ নামক প্রলেপ দিয়ে আমাদের সুস্থ রাখার চেষ্টা করে। বর্তমানে আমরা এক অদ্ভুত ‘হাইপার-কানেক্টেড’ যুগে বাস করছি। হাজার হাজার ফেসবুক ফ্রেন্ড আর ফলোয়ারের ভিড়ে আমরা মানুষের সংখ্যা গুনছি, কিন্তু মানুষ চিনছি না। এই ডিজিটাল ব্যস্ততা আমাদের স্মৃতিকে অগভীর করে দিচ্ছে। আজ যাকে নিয়ে আমরা মাতামাতি করছি, কাল অন্য কারো নোটিফিকেশনে তাকে অনায়াসেই ভুলে যাচ্ছি। আমাদের স্মৃতির আয়ু এখন অনেকটা সোশ্যাল মিডিয়া স্টোরির মতোই-মাত্র ২৪ ঘণ্টা! মনে আছে সেই ‘ফ্রেন্ডস ফরইভার’ গ্রুপের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন ক্যাম্পাসে নতুন নতুন ফ্রেন্ড। কত শত পরিকল্পনা নিয়ে খুলেছিলেন সেই গ্রুপটি। অথচ সময়ের পরিক্রমায় হয়তোবা চ্যাটলিস্টের সবচেয়ে নিচে পড়ে আছে গ্রুপটি। এখন আর মেসেজ আসে না “চল সবাই বের হই”। কারণ সবাই এখন ব্যাস্ত শেষ পর্যায়ে ক্যারিয়ার গুছাতে।

দার্শনিক দিক থেকে দেখলে, ভুলে যাওয়াটা জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি মানুষ তার জীবনের সব শোক, বিচ্ছেদ আর হারানো মানুষের স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়াতো, তবে জীবন থমকে যেতো। পুরনোকে ভুলে যাওয়ার জায়গা থেকেই নতুনের আবাহন ঘটে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো-“সব পাখি ফেরে এই নীড়ে, সব নদী-ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন।” পরিশেষে বলা যায়, মানুষ মানুষকে ভুলে যায় বেঁচে থাকার তাগিদে, বিবর্তনের প্রয়োজনে। তবে কিছু স্মৃতি পাথরখোদাই অক্ষরের মতো থেকে যায়, যা সময় বা বিজ্ঞান কোনো কিছুই মুছে ফেলতে পারে না। ভুলে যাওয়া যেমন স্বাভাবিক, কিছু স্মৃতি বয়ে বেড়ানোও তেমনি মানবিক।

লেখকঃ মো. শাকিল বাবু (সাংবাদিক)

Share this news as a Photo Card