অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বড় বাজেট দেওয়া সহজ, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’ বা ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া এবারের বাজেটের লক্ষ্য।
কৃষক ও সৃজনশীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ক্ষমতায়ন করা এবং বেসরকারি খাতের জন্য নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ তৈরি করাকেও বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
মঙ্গলবার (২ জুন) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন’ বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও সৃজনশীল অর্থনীতির পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও শক্তিশালী করা হবে। কারণ, অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার মূল চালিকাশক্তি সরকার নয়, বেসরকারি খাত।
তিনি বলেন, সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু, আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করার মতো হয়ে গেছে। আমরা সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।
বাজেট তো অপেক্ষা করবে না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জুন মাসে বাজেট দিতেই হবে। তাই অত্যন্ত ধৈর্য, পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে আমরা কাজ করেছি। ঘুমানোর সময় ছাড়া সবাই প্রায় সারাক্ষণ কাজ করছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা একটি ভালো বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
ব্যবসা-বাণিজ্যে হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে অর্থমন্ত্রী বলেন, নাগরিক কিংবা উদ্যোক্তাদের কোনো সেবার জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হবে না। মিউটেশন, লাইসেন্স, বিদ্যুৎ সংযোগ, পাসপোর্ট যে সেবাই হোক না কেন, সবকিছু নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি জানান, কোনো সেবার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন লাগলেও আবেদনকারীকে বারবার বিভিন্ন অফিসে যেতে হবে না। একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে আবেদন করলেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। যদি কেউ নির্ধারিত সময়ে সাড়া না দেয়, তাহলে মানুষকে আর অপেক্ষা করতে হবে না। অটো অনুমোদন হয়ে যাবে। আমরা কোনো ধরনের হয়রানি চাই না। নাগরিকের জীবন সহজ করা সরকারের দায়িত্ব।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ, ব্যবসায়ী, এমনকি সাংবাদিকরাও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিলেন। এখন সরকার অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনতে চায়। আমরা টোটাল ডিরেগুলেশনের দিকে যাচ্ছি। অর্থাৎ, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে চাই। মানুষকে অযথা নিয়ন্ত্রণ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে, কেউ যদি ব্যবসা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বড় বাজেট দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে। প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি সেখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো প্রকল্প কোথায় আটকে গেল, কার কারণে বিলম্ব হলো সবকিছু ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে। কেউ দেরি করলে সঙ্গে সঙ্গে তা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে নানা পর্যায়ে আলোচনা ও ব্রেনস্টর্মিং করেছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে যাত্রা সহজ হবে না। এজন্য, জনগণের ধৈর্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাজেটের আকার নিয়ে সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী একটি উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে নেমে গেছে, যেভাবে নলকূপের পানির স্তর নিচে নেমে গেলে পানি ওঠে না। তখন ওপর থেকে পানি ঢেলে স্তরকে উপরে তুলতে হয়, এরপর পাম্প করলে পানি আসে।
তার ভাষায়, বাংলাদেশের অর্থনীতির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে সেই স্তরকে উপরে তোলা। এজন্য, কিছু সময় বড় আকারের ব্যয় ও বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকেছে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেখানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং বিনিয়োগ সংকট বাড়ছে, সেখানে প্রথমেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া জরুরি। আমরা দেখেছি পরিবারের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ হচ্ছেন গৃহকর্মে নিয়োজিত নারী। তিনি সবার শেষে ঘুমান, সবার আগে ওঠেন, কিন্তু তার কোনো সামাজিক বা আর্থিক মূল্যায়ন নেই। কারণ তার নিজস্ব আয় নেই। এ কারণে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় সরাসরি নারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, এ কর্মসূচিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পাইলট প্রকল্পে মাত্র ১ থেকে দেড় শতাংশ বিচ্যুতি পাওয়া গেছে, যা এখন সংশোধন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই হার ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ভুলতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি হচ্ছে কৃষক। তাদের জীবনমান উন্নত না হলে কৃষিও এগোবে না। এজন্য আমরা ফার্মার্স কার্ড চালু করেছি। কৃষকদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি হলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে জনগণের নিজস্ব ব্যয় বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকার ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার, প্রাইমারি হেলথ কেয়ার এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগের প্রকোপ অনেক কমে যাবে। তাই সবার কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা বড় উদ্যোগ নিয়েছি। তবে এই সেবা প্রদানে সরকার একা কাজ করবে না। বেসরকারি খাত ও এনজিওদের সম্পৃক্ত করে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এবারের বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কামার, কুমার, তাঁতি, শীতলপাটি প্রস্তুতকারক, হস্তশিল্পী, নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে ছিলেন। তারা কাজ করছে, কিন্তু তাদের জন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমরা তাদের অর্থনীতির মূলধারায় আনতে চাই।
এ লক্ষ্যে তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকার এসব মানুষের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ ঋণ, নকশা সহায়তা, ব্র্যান্ডিং, বিপণন এবং আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করবে। এ কাজে বেসরকারি খাত ও এনজিওদের সম্পৃক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যেভাবে গ্রামীণ পণ্য বিশ্ববাজারে যাচ্ছে, আমরা সেভাবেই আমাদের শিল্পীদের সহায়তা করবো।
জিডিপি নিয়ে প্রচলিত ধারণার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, শিল্প-কারখানাই শুধু জিডিপির উৎস নয়। মানুষ যে টাকা খরচ করে সেটাই জিডিপি। থিয়েটারের টিকিট কিনলেও জিডিপি, খেলা দেখতে গিয়ে টিকিট কাটলেও জিডিপি। উন্নত দেশগুলোতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান বিশাল। তাই আমাদেরও জিডিপি সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।
বাজেটের মূল স্লোগান হিসেবে ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি’ বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, অর্থনীতিতেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ থাকতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলও সবার ঘরে পৌঁছাতে হবে। এটাই আমাদের বাজেটের দর্শন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের লুটপাট ও অনিয়মের কারণে দেশের অনেক ব্যাংক বর্তমানে আন্ডার-ক্যাপিটালাইজড অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে বহু বিনিয়োগকারীও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণ করা এবং বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় কার্যকর মূলধন সরবরাহ করা।
সরকারের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা ও ফান্ড ম্যানেজারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), বৈশ্বিক বিভিন্ন ফান্ড ম্যানেজার এবং বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। জেপি মরগানসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসছে। আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার এ খাতে সহায়তা দেবে। দেশেই উৎপাদিত ইভি গাড়ি শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, বিদেশেও রপ্তানি করা হবে। এতে তুলনামূলক কম দামে সাধারণ মানুষ গাড়ি কিনতে পারবেন।
বক্তব্যের শেষদিকে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে, জনগণের সহযোগিতা ও গঠনমূলক সমালোচনা প্রয়োজন। আমরা ভালো কাজ করলে বলবেন ভালো কাজ হচ্ছে। ভুল করলে সেটাও বলবেন। কোনো সমস্যা নেই। তবে সমালোচনা যেন গঠনমূলক হয়।
তিনি আরও বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে যাত্রা সহজ নয়। কিন্তু আমরা সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি।
ইআরএফ সাধারণ সম্পদক আবুল কাশেমের সঞ্চলনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি দৌলত আকতার মালা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বিটিএমএ’র সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এবং ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী।
স্টাফ রিপোর্টার 


















