ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ জেলার আজ ২৩৯তম জন্মদিন। ১৭৮৭ সালের ১ মে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলটিকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এক সময়ের উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ এই জেলাটি বর্তমানে একটি সমৃদ্ধ বিভাগ হিসেবে পরিচিত। নিচে আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ময়মনসিংহ জেলার ভৌগোলিক বৈচিত্র্য অত্যন্ত নজরকাড়া। এর উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে গাজীপুর, পূর্বে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ এবং পশ্চিমে শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলা অবস্থিত। ভৌগোলিক বিচিত্রতার কারণে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে— ‘হাওর, জঙ্গল, মইষের শিং-এ নিয়ে ময়মনসিং’। রত্নগর্ভা এই জেলার আয়তন ছিল ৪,৭৮৭ বর্গমাইল। এর ইংরেজি নাম Mymensingh-এর একটি চমৎকার ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে, যা হলো My-men-sing অর্থাৎ ‘আমার লোকেরা গান গায়’।
ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক কাজ সহজ করতে এবং স্থানীয় বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে ১৭৮৭ সালে এই জেলা গঠিত হয়। মিস্টার এফ লি গ্রোস ছিলেন এর প্রথম কালেক্টর। প্রথম দিকে খাগডহর অঞ্চলে প্রশাসনিক কাচারি স্থাপনের চেষ্টা করা হলেও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৭৯১ সালে সেহড়া মৌজায় ‘নাসিরাবাদ’ নাম দিয়ে জেলা শহরের পত্তন ঘটে।
নামকরণের ইতিহাসে দেখা যায়, মোঘল আমলের সাধক মোমেন শাহ-এর নাম থেকে এই অঞ্চলের নাম হয়েছিল মোমেনশাহী। আবার সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তার পুত্র নাসির উদ্দিন নসরত শাহ-এর জন্য এখানে একটি নতুন রাজ্য গঠন করেছিলেন, যা থেকে নাসিরাবাদ নামের উৎপত্তি। তবে এই নাসিরাবাদ নাম পরিবর্তনের পেছনে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। বর্জনলাল এন্ড কোম্পানি নাসিরাবাদ রেল স্টেশনের ঠিকানায় ২০ টিন কেরোসিন বুক করেছিল, যা ভুলবশত রাজস্থানের নাসিরাবাদে চলে যায়। এই বিড়ম্বনা এড়াতে পরবর্তীতে রেল স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ময়মনসিংহ রাখা হয় এবং ১৯০৫ সালে পৌরসভার নামও পরিবর্তিত হয়।
সময়ের সাথে সাথে প্রশাসনিক প্রয়োজনে ময়মনসিংহ জেলাকে ভেঙে একাধিক মহকুমা ও জেলা করা হয়। ১৮৪৫ সালে জামালপুর, ১৮৬০ সালে কিশোরগঞ্জ, ১৮৬৯ সালে টাঙ্গাইল এবং ১৮৮২ সালে নেত্রকোনা মহকুমা গঠিত হয়, যা বর্তমানে পৃথক জেলা। ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলা নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত হলেও টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ ঢাকা বিভাগেই থেকে যায়।
শিক্ষা ও উন্নয়নে এই জনপদ সবসময়ই অগ্রগামী ছিল। ১৮৬৯ সালে গঠিত নাসিরাবাদ মিউনিসিপ্যালিটি ছিল বাংলা প্রেসিডেন্সির প্রথম এবং উপমহাদেশের দ্বিতীয় পৌরসভা। ১৮৮৬ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ চালু হয়। ১৮৪৬ সালে প্রথম ইংরেজি স্কুল এবং ১৮৫৩ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ময়মনসিংহে বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও আনন্দমোহন কলেজের মতো স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ইতিহাস ও স্থাপত্যের দিক থেকেও এই জেলা সমৃদ্ধ। মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের রাজবাড়ি, শশীলজ, আঠারোবাড়ী জমিদার বাড়ি এবং রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস আজও অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ময়মনসিংহের অবদান ছিল অপরিসীম। ১৭৮৭ সালের ১ মে যাত্রা শুরু করা এই প্রাচীন জনপদ আজ তার ঐতিহ্যের ২৩৯ বছর পূর্ণ করল।

স্টাফ রিপোর্টার 























