০৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাহবুব রুমনের পৌরাণিক গল্প ‘মহামায়া’

  • মাহবুব রুমন
  • পোষ্টের সময় : ০৬:২৭:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৩৭ ভিউ :

 

যোগিনী মহামায়া! ভূবনমোহিনী !কেবল সর্বরূপের আধার নন, তিনি যেন অনন্ত গুণ ও পরম মহিমার আলোকবর্তিকা। তাঁর করুণা এতই স্নিগ্ধ যে, তা এক পলকের জন্য লাভ করলে জন্মজন্মান্তরের তৃষ্ণা মিটে যায়। তাঁর অলৌকিক রূপের বর্ণনা ভাষায় কুলোয় না—শরতের পূর্ণিমার চাঁদের মতো তাঁর প্রসন্ন মুখমণ্ডল, পদ্মপাপড়ির মতো সুকোমল অথচ জ্যোতির্ময় দুই নয়ন, আর সেই নয়নে ভেসে ওঠে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপরিসীম মায়া।তাই তিনি মহামায়া।

যোগিনীর এই অপরূপ মহিমা, পরম লাবণ্য আর অনিবার্য মোহের ফল্গুধারায় এক অদম ভক্তের হৃদয়ে তাঁর দর্শন লাভের;তাঁর চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক পরম আকুলতা তৈরি হয়েছিল। সে দিনরাত কেবল এক আশাতেই দিন গুনছিল—কখন দেখা মিলবে সেই জগৎমোহিনীর।

যোগিনী কৃপাময়ী, আবার পরম তেজস্বিনী। ভক্তের ভাগ্যাকাশে সেদিন সেই পরম রূপ দর্শনের,ভক্তির পূর্ণচন্দ্র উদিত হওয়ার শুভ সুযোগ এসেছিল।কিন্তু একটুমাত্র অবিবেচনার কারণে সেই মহামূল্যবান মুহূর্তটি হারিয়ে গেল।

স্বয়ং মহামায়া পরম করুণা করে ভক্তের ভাঙা কুটিরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ ভক্তের সে মুহূর্তে সেই দিব্যচক্ষু ছিল না, যা দিয়ে সে যোগিনীর সেই অলৌকিক রূপ চিনে নেবে। ক্ষণিকের ভ্রান্তি ও অবহেলার এই একটি দিনের ভুলের কারণে যোগিনী ভীষণ রুষ্ট হলেন। যোগিনীর মুখ থেকে উচ্চারিত হলো কঠিন এক শাপ—আগামী দীর্ঘ আট বছর তিনি আর এই গৃহে পদার্পণ করবেন না, কোনো করুণার ছায়াও দেবেন না এই অবুঝ ভক্তকে।

প্রদীপের আলো যেন হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় নিভে গেল।

যোগিনী অন্তর্হিত হতেই ভক্তের ভুল ভাঙলো। অনুশোচনার তীব্র আগুনে তার হৃদয় দগ্ধ হতে লাগলো। সে বুঝতে পারলো, এক মুহূর্তের উদাসীনতায় সে পরম রত্ন হারিয়ে ফেলেছে। ভক্ত তখনই কঠোর সাধনায় নিজেকে সঁপে দিল। কিন্তু যোগিনীর মন তো সহজে গলে না। দিন যায়, মাস যায়, সাধনার এত ব্যাকুলতা সত্ত্বেও যোগিনীর কোনো করুণা মিলল না।

তখন ভক্তের মনে জন্ম নিল এক চরম সংকল্প। সে চোখ বন্ধ করে করজোড়ে প্রতিজ্ঞা করলো—”হে মহামায়া, আপনার রাগ ভাঙাতে যদি এই আট বছরের বদলে আটশত বছরও আমাকে এই একই আসনে বসে তপস্যা করতে হয়, তবে তা-ই হবে। তবু আপনার শ্রীচরণ না পাওয়া পর্যন্ত, আপনার অভয় রূপ দর্শন না করা পর্যন্ত আমি এই সাধনা থেকে একচুল নড়বো না।”

শুরু হলো সেই অভূতপূর্ব ও হাড়কাঁপানো সাধনার পর্ব। ভক্ত ধ্যানে মগ্ন হয়ে একই আসনে স্থির হয়ে রইলো।

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে যখন চারপাশের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যেত, সূর্যের তীব্র রোদে চামড়া পুড়ে যেত, তখনও সে আসন ছাড়েনি। বর্ষার দিনে যখন মুষলধারে বৃষ্টি নামতো, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হতো আর নদীর জল উপচে এসে তার শরীর ভিজিয়ে দিত, ভক্ত নিষ্পলক চোখে যোগিনীর নাম জপ করে যেত। কনকনে শীতের রাতে যখন হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়ায় সবাই ঘরের দুয়ার বন্ধ করতো, ভক্ত তখন খোলা আকাশের নিচে বরফশীতল বাতাসে জমে গিয়েও নিজের পণ থেকে বিচ্যুত হয়নি।

ধীরে ধীরে ভক্তের দেহের ওপর লতাপাতা পেঁচিয়ে উঠলো, চুলে ও দড়ির মতো জটায় পাখির বাসা বাঁধলো, বল্মীক স্তূপ তাকে ঢেকে ফেললো। খিদে-তৃষ্ণা ভুলে কেবল যোগিনীর নামই হয়ে উঠলো তার একমাত্র শ্বাস-প্রশ্বাস। প্রকৃতির কোনো ঝড়-ঝঞ্ঝাই তার এই আটশত বছরের অটল সংকল্পকে ভাঙতে পারলো না।

ভক্তের এই অতল প্রেম, ব্যাকুল অনুশোচনা আর অটল শ্রদ্ধার তীব্রতায় শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি ও ব্রহ্মাণ্ডে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো। ভক্তের তপস্যার অনলে চারপাশের বাতাস যেন পবিত্র হয়ে উঠলো, শুকিয়ে যাওয়া গাছপালায় নতুন পাতা গাজালো, মরুভূমির মতো শুষ্ক মাটিতে বুনো ফুল ফুটে উঠলো।

ভক্তের এই চরম আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার পরাকাষ্ঠা দেখে দেবী মহামায়ার পরম স্নেহের হৃদয় আর স্থির থাকতে পারলো না। ভক্তের অটল পণের কাছে যোগিনীর রাগ মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

এক শুভ সকালে ভক্তের কুটির ও তার চারপাশ এক অলৌকিক স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ভরে উঠলো। বাতাস ভেসে এলো পদ্মফুলের অপূর্ব সুবাসে। যোগিনী কেবল দূর থেকে দর্শন দিলেন না—তিনি সশরীরে ভক্তের কুটিরে এসে আবির্ভূত হলেন। নিজ হাতে ভক্তের গায়ের লতাপাতা আর ধুলোবালি ছড়িয়ে তাকে তুলে দাঁড় করালেন।

ভক্তের শত বছরের তৃষ্ণার্ত চোখ যোগিনীর পরম রূপ দেখে ধন্য হলো। যোগিনী পরম ভালোবাসায় ভক্তের হাতে তৈরি করা সামান্য অন্ন গ্রহণ করলেন। যে কুটির একদিন ভুলের গ্লানিতে অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল, আজ তা ভক্তির পরম আনন্দে ভেসে গেল। ভক্তের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুধারা—তা আর দুঃখের নয়, পরম প্রাপ্তি ও প্রেমানন্দের অশ্রু।

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

রাতারাতি আইনশৃঙ্খলায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

পাকিস্তানে হাসপাতালে আগুন, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু

26 August 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

মাহবুব রুমনের পৌরাণিক গল্প ‘মহামায়া’

পোষ্টের সময় : ০৬:২৭:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

 

যোগিনী মহামায়া! ভূবনমোহিনী !কেবল সর্বরূপের আধার নন, তিনি যেন অনন্ত গুণ ও পরম মহিমার আলোকবর্তিকা। তাঁর করুণা এতই স্নিগ্ধ যে, তা এক পলকের জন্য লাভ করলে জন্মজন্মান্তরের তৃষ্ণা মিটে যায়। তাঁর অলৌকিক রূপের বর্ণনা ভাষায় কুলোয় না—শরতের পূর্ণিমার চাঁদের মতো তাঁর প্রসন্ন মুখমণ্ডল, পদ্মপাপড়ির মতো সুকোমল অথচ জ্যোতির্ময় দুই নয়ন, আর সেই নয়নে ভেসে ওঠে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপরিসীম মায়া।তাই তিনি মহামায়া।

যোগিনীর এই অপরূপ মহিমা, পরম লাবণ্য আর অনিবার্য মোহের ফল্গুধারায় এক অদম ভক্তের হৃদয়ে তাঁর দর্শন লাভের;তাঁর চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক পরম আকুলতা তৈরি হয়েছিল। সে দিনরাত কেবল এক আশাতেই দিন গুনছিল—কখন দেখা মিলবে সেই জগৎমোহিনীর।

যোগিনী কৃপাময়ী, আবার পরম তেজস্বিনী। ভক্তের ভাগ্যাকাশে সেদিন সেই পরম রূপ দর্শনের,ভক্তির পূর্ণচন্দ্র উদিত হওয়ার শুভ সুযোগ এসেছিল।কিন্তু একটুমাত্র অবিবেচনার কারণে সেই মহামূল্যবান মুহূর্তটি হারিয়ে গেল।

স্বয়ং মহামায়া পরম করুণা করে ভক্তের ভাঙা কুটিরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ ভক্তের সে মুহূর্তে সেই দিব্যচক্ষু ছিল না, যা দিয়ে সে যোগিনীর সেই অলৌকিক রূপ চিনে নেবে। ক্ষণিকের ভ্রান্তি ও অবহেলার এই একটি দিনের ভুলের কারণে যোগিনী ভীষণ রুষ্ট হলেন। যোগিনীর মুখ থেকে উচ্চারিত হলো কঠিন এক শাপ—আগামী দীর্ঘ আট বছর তিনি আর এই গৃহে পদার্পণ করবেন না, কোনো করুণার ছায়াও দেবেন না এই অবুঝ ভক্তকে।

প্রদীপের আলো যেন হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় নিভে গেল।

যোগিনী অন্তর্হিত হতেই ভক্তের ভুল ভাঙলো। অনুশোচনার তীব্র আগুনে তার হৃদয় দগ্ধ হতে লাগলো। সে বুঝতে পারলো, এক মুহূর্তের উদাসীনতায় সে পরম রত্ন হারিয়ে ফেলেছে। ভক্ত তখনই কঠোর সাধনায় নিজেকে সঁপে দিল। কিন্তু যোগিনীর মন তো সহজে গলে না। দিন যায়, মাস যায়, সাধনার এত ব্যাকুলতা সত্ত্বেও যোগিনীর কোনো করুণা মিলল না।

তখন ভক্তের মনে জন্ম নিল এক চরম সংকল্প। সে চোখ বন্ধ করে করজোড়ে প্রতিজ্ঞা করলো—”হে মহামায়া, আপনার রাগ ভাঙাতে যদি এই আট বছরের বদলে আটশত বছরও আমাকে এই একই আসনে বসে তপস্যা করতে হয়, তবে তা-ই হবে। তবু আপনার শ্রীচরণ না পাওয়া পর্যন্ত, আপনার অভয় রূপ দর্শন না করা পর্যন্ত আমি এই সাধনা থেকে একচুল নড়বো না।”

শুরু হলো সেই অভূতপূর্ব ও হাড়কাঁপানো সাধনার পর্ব। ভক্ত ধ্যানে মগ্ন হয়ে একই আসনে স্থির হয়ে রইলো।

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে যখন চারপাশের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যেত, সূর্যের তীব্র রোদে চামড়া পুড়ে যেত, তখনও সে আসন ছাড়েনি। বর্ষার দিনে যখন মুষলধারে বৃষ্টি নামতো, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হতো আর নদীর জল উপচে এসে তার শরীর ভিজিয়ে দিত, ভক্ত নিষ্পলক চোখে যোগিনীর নাম জপ করে যেত। কনকনে শীতের রাতে যখন হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়ায় সবাই ঘরের দুয়ার বন্ধ করতো, ভক্ত তখন খোলা আকাশের নিচে বরফশীতল বাতাসে জমে গিয়েও নিজের পণ থেকে বিচ্যুত হয়নি।

ধীরে ধীরে ভক্তের দেহের ওপর লতাপাতা পেঁচিয়ে উঠলো, চুলে ও দড়ির মতো জটায় পাখির বাসা বাঁধলো, বল্মীক স্তূপ তাকে ঢেকে ফেললো। খিদে-তৃষ্ণা ভুলে কেবল যোগিনীর নামই হয়ে উঠলো তার একমাত্র শ্বাস-প্রশ্বাস। প্রকৃতির কোনো ঝড়-ঝঞ্ঝাই তার এই আটশত বছরের অটল সংকল্পকে ভাঙতে পারলো না।

ভক্তের এই অতল প্রেম, ব্যাকুল অনুশোচনা আর অটল শ্রদ্ধার তীব্রতায় শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি ও ব্রহ্মাণ্ডে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো। ভক্তের তপস্যার অনলে চারপাশের বাতাস যেন পবিত্র হয়ে উঠলো, শুকিয়ে যাওয়া গাছপালায় নতুন পাতা গাজালো, মরুভূমির মতো শুষ্ক মাটিতে বুনো ফুল ফুটে উঠলো।

ভক্তের এই চরম আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার পরাকাষ্ঠা দেখে দেবী মহামায়ার পরম স্নেহের হৃদয় আর স্থির থাকতে পারলো না। ভক্তের অটল পণের কাছে যোগিনীর রাগ মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

এক শুভ সকালে ভক্তের কুটির ও তার চারপাশ এক অলৌকিক স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ভরে উঠলো। বাতাস ভেসে এলো পদ্মফুলের অপূর্ব সুবাসে। যোগিনী কেবল দূর থেকে দর্শন দিলেন না—তিনি সশরীরে ভক্তের কুটিরে এসে আবির্ভূত হলেন। নিজ হাতে ভক্তের গায়ের লতাপাতা আর ধুলোবালি ছড়িয়ে তাকে তুলে দাঁড় করালেন।

ভক্তের শত বছরের তৃষ্ণার্ত চোখ যোগিনীর পরম রূপ দেখে ধন্য হলো। যোগিনী পরম ভালোবাসায় ভক্তের হাতে তৈরি করা সামান্য অন্ন গ্রহণ করলেন। যে কুটির একদিন ভুলের গ্লানিতে অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল, আজ তা ভক্তির পরম আনন্দে ভেসে গেল। ভক্তের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুধারা—তা আর দুঃখের নয়, পরম প্রাপ্তি ও প্রেমানন্দের অশ্রু।

 

Share this news as a Photo Card