১২:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহের ১১টি আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি অর্ধশত

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে লড়তে ময়মনসিংহে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন অর্ধশত প্রার্থী। দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনি ডামাঢোল ভিন্ন আবহের সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামেও ময়মনসিংহ জেলা ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ।

 

ময়মনসিংহে মোট সংসদীয় আসন ১১টি। এর মধ্যে ১৩টি উপজেলা, ১টি সিটি করপোরেশন, ১০টি পৌরসভা এবং ১৪৫টি ইউনিয়ন এবং ১টি ক্যান্টমেন্ট রয়েছে। জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৪৫ লাখ ৮৫ হাজার ৫৯৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৬টি, মহিলা ভোটার ২২ লাখ ৫২ হাজার ৫২৫টি এবং হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ৩৭টি।

 

বিগত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এই জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭টি। এ হিসাবে এবার ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৭০টি। কিন্তু হালনাগাদ ভোটার তালিকায় মোট ভোটার সংখ্যা নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা পর্যন্ত আরও বাড়তে পারে।বিগত ১৫ বছরের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন, সংগ্রামে হামলা-মামলা ও গুম, খুনে বিপর্যস্থ বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যূত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দলটির মন্ত্রী-এমপি ও এলাকার বেশিরভাগ দাপুটে নেতাকর্মীরা। এরই মাঝে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ শূন্য মাঠে দল গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিএনপি ও দলটির অঙ্গ সহযোগী সংগঠন। ফলে সাম্প্রতি সময়ে একের পর এক জেলা, মহানগর, উপজেলা কমিটি গঠন হওয়ায় ওয়ার্ড এবং ইউনিয়ন পর্যায়েও চলছে বিএনপির গণজোয়াড়। এতে তৃণমূল পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক কর্মকান্ডে নেতাকর্মীদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা বেড়েছে বহুগুণ।

 

দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে সংগঠন গোছানোর পাশাপাশি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশিরা এখন নির্বাচনমুখী। ফলে বিগত ১৫ বছর আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে থাকা নেতাদের পাশাপাশি নির্বাচনি মাঠে জায়গা করতে উঠেপড়ে লেগেছেন নিষ্ক্রিয়রাও। তারাও এখন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে টানতে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সরবতা দেখাচ্ছেন তৃণমূলে। তবে এবারের দলীয় মনোনয়নে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্যাগী ও নির্যাতিতদের ধানের শীষ প্রতিকে মূল্যায়ন করবে বলে আশাবাদি দলীয় নেতাকর্মীরা।

 

ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনি ডামাঢোলে নিজ নিজ এলাকামুখী হয়ে উঠেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশিরা। এতে করে হাট-বাজার, খেলাধূলা, সাংগঠনিক কর্মকান্ড ছাড়াও উৎসব ও নিমন্ত্রণের মত সামাজিক কর্মকান্ডেও মনোনয়ন প্রত্যাশিদের গণসংযোগ এখন সর্বত্রই দৃশ্যমান।

 

ভারতীয় সীমান্তর্তী উপজেলা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া আসন নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ময়মনসিংহ-১। দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১০৬টি। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে মাঠে রয়েছেন হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে হামলা, মামলায় নির্যাতন ও গ্রেপ্তার হয়েও দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি ছুটেছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। সেই সঙ্গে টানা ১০ বছর ধরে এই আসনের প্রতিটি প্রামে,পাড়া-মহল্লায় সরব ছিলেন মানুষের সুখে-দুঃখে। তাঁর সঙ্গে প্রার্থীতায় লড়বেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা প্রবীণ সাংবাদিক ও আইনজীবী আফজাল এইচ খান এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ি তরুন রাজনীতিক বিএনপি নেতা সালমান ওমর রুবেল।

 

সমতল ভূমি ও খাল-বিলে সমৃদ্ধ ফুলপুর-তারাকান্দা উপজেলার নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ময়মনসিংহ-২। এবারের নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩টি। এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হিসাবে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ার বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের সঙ্গে বেঈমানি করে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিস্কার হন। আগামী নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির মনোনয়নে মূল আলোচনায় রয়েছেন দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার। বিগত লড়াই সংগ্রামে তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে থেকেছেন। তবে তার সঙ্গে প্রার্থীতায় আছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও উত্তর জেলা কৃষকদলের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল বাসার আকন্দ, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক সুজাউদ্দৌলা সুজা ও ময়মনসিংহ মহানগর যুবদলের সাধারন সম্পাদক জোবায়েদ হোসেন শাকিল।

 

জেলার গৌরীপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৩ আসন। এতে মোট ভোটার রয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৯১টি। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে তৃনমূলের জনপ্রিয়তায় আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও নবগঠিত উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আহম্মেদ তায়েবুর রহমান হিরন। তাঁর সঙ্গে মনোয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য প্রকৌশলী মো: ইকবাল হোসাইন, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মো: নূরুল হক, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ডা: আব্দুস সেলিম এবং নবগঠিত উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব হাফেজ আজিজুল হক।

 

দেশের অষ্টম বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহের সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৪ আসন। সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশনে জেলার সর্বাধিক ভোটার নিয়ে গঠিত এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৩টি। এই আসনে ২০১৮ সালের কারচুপির নির্বাচনেও দেড় লক্ষাধিক ভোট পেয়ে দেশজুড়ে নজির সৃষ্টিকরেছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ। এবারও তিনি এই আসনে আলোচিত প্রার্থী। আসনটিতে এবার মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে রয়েছেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন। ইতোমধ্যে দলীয় প্রচার-প্রচারণায় তারা নিজেদের প্রার্থীতা হিসেবে জানান দিয়েছেন।

 

জেলার উত্তর-পশ্চিমের জনপদ জমিদারি স্থাপত্যের ঐতিহ্যগাঁথা মুক্তাগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৫ আসন। এবার এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭১টি। বিএনপির একমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে মাঠে সরব রয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক আলহাজ্ব জাকির হোসেন বাবলু। তাঁর নেতৃত্বেই আগামী নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি ভোটের চমক সৃষ্টি করবে বলে আশাবাদি দলটির নেতাকর্মীরা।

 

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৬ আসন। ভোটার সংখ্যার দিক থেকে এই আসনটি জেলার তৃতীয় অবস্থানে। এর মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২ হাজার ১০৫টি। এ আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন শেরে বাংলা একেএম ফজলুল হকের নাত জামাতা ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আকতারুল আলম ফারুক। তার সঙ্গে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্ধি বিগত ১৫ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের সম্মুখ সারির যোদ্ধা কেন্দ্রীয় যুবদলের সদ্য সাবেক প্রচার সম্পাদক আব্দুল করিম সরকার।

 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত শিল্পাঞ্চল লগুয়া ত্রিশাল উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৭ আসন। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮৯টি। বিএনপির হেভিওয়েট মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে মাঠে সরব রয়েছেন দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা: মাহাবুবুর রহমান লিটন। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে তিনি এই আসনে ধানের শীষের নমিনি ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই তৃণমূল বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। তবে গতবারের ন্যায় এবারও তার সঙ্গে মনোনয়ন চাইবেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। সেই সঙ্গে আসনটিতে নতুন প্রার্থী হিসাবে আওয়াজ দিয়েছেন নবগঠিত দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক শহীদুল আমিন খসরু।

 

কাঁচা মাটিয়া নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা জমিদারি স্থাপত্য সমৃদ্ধ ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৮ আসন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৫৬টি। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে এবারের নির্বাচনে এ আসনে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ি ও উপজেলা বিএনপির আহবায়ক প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। বিগত আন্দোলনে অর্থ যোগাদানদাতা হিসাবে গ্রেপ্তার হয়ে নির্যাতন ও কারাবন্দি হয়েছেন। তবে তার সঙ্গে প্রবল প্রতিদ্বন্ধি সাবেক এমপি ও সাবেক ক্রিকেটার শাহ নূরুল কবীর শাহীন এবং বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি, উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য কামরুজ্জামান লিটন।

 

নান্দাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৯ আসন। এবার এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৮টি। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে এ আসনটিতে তৃণমূলে দল গোছাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন উপজেলা বিএনপির আহবায়ক প্রয়াত সাংসদ পুত্র ইয়াসের খান চৌধুরী। তার সঙ্গে প্রতি›দ্বন্ধিতা করবেন আরেক সাংসদ পুত্র নাসের খান চৌধুরী। তারা পারিবারিক সর্ম্পকে চাচাত্ত ভাই। আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন অবসরপ্রাপ্ত ও আলোচিত সেনা কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামসুল ইসলাম শামছ ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সাবেক ছাত্রনেতা মালশিয়া প্রবাসী ব্যবসায়ী মামুন বিন আব্দুল মান্নান।

 

রাজনীতির রক্তাক্ত জনপদ হিসাবে পরিচিত জেলার গফরগাঁও উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-১০ আসন। এতে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩টি। আগামী নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন চাইছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক সাবেক ছাত্রনেতা আলমগীর মাহমুদ আলম এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ডা: মোফাখারুল ইসলাম রানা। এছাড়াও আসনটিতে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন প্রবীণ বিএনপি নেতা এবি সিদ্দিক, মুশফিকুর রহমান এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক আকতারুজ্জামান বাচ্চু।

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে: প্রিন্স

ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হালুয়াঘাটের গ্রাম পরিদর্শনে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান প্রিন্স

22 September 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

ময়মনসিংহের ১১টি আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি অর্ধশত

পোষ্টের সময় : ০১:৫৫:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে লড়তে ময়মনসিংহে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন অর্ধশত প্রার্থী। দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনি ডামাঢোল ভিন্ন আবহের সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামেও ময়মনসিংহ জেলা ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ।

 

ময়মনসিংহে মোট সংসদীয় আসন ১১টি। এর মধ্যে ১৩টি উপজেলা, ১টি সিটি করপোরেশন, ১০টি পৌরসভা এবং ১৪৫টি ইউনিয়ন এবং ১টি ক্যান্টমেন্ট রয়েছে। জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৪৫ লাখ ৮৫ হাজার ৫৯৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৬টি, মহিলা ভোটার ২২ লাখ ৫২ হাজার ৫২৫টি এবং হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ৩৭টি।

 

বিগত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এই জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭টি। এ হিসাবে এবার ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৭০টি। কিন্তু হালনাগাদ ভোটার তালিকায় মোট ভোটার সংখ্যা নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা পর্যন্ত আরও বাড়তে পারে।বিগত ১৫ বছরের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন, সংগ্রামে হামলা-মামলা ও গুম, খুনে বিপর্যস্থ বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যূত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দলটির মন্ত্রী-এমপি ও এলাকার বেশিরভাগ দাপুটে নেতাকর্মীরা। এরই মাঝে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ শূন্য মাঠে দল গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিএনপি ও দলটির অঙ্গ সহযোগী সংগঠন। ফলে সাম্প্রতি সময়ে একের পর এক জেলা, মহানগর, উপজেলা কমিটি গঠন হওয়ায় ওয়ার্ড এবং ইউনিয়ন পর্যায়েও চলছে বিএনপির গণজোয়াড়। এতে তৃণমূল পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক কর্মকান্ডে নেতাকর্মীদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা বেড়েছে বহুগুণ।

 

দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে সংগঠন গোছানোর পাশাপাশি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশিরা এখন নির্বাচনমুখী। ফলে বিগত ১৫ বছর আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে থাকা নেতাদের পাশাপাশি নির্বাচনি মাঠে জায়গা করতে উঠেপড়ে লেগেছেন নিষ্ক্রিয়রাও। তারাও এখন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে টানতে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সরবতা দেখাচ্ছেন তৃণমূলে। তবে এবারের দলীয় মনোনয়নে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্যাগী ও নির্যাতিতদের ধানের শীষ প্রতিকে মূল্যায়ন করবে বলে আশাবাদি দলীয় নেতাকর্মীরা।

 

ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনি ডামাঢোলে নিজ নিজ এলাকামুখী হয়ে উঠেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশিরা। এতে করে হাট-বাজার, খেলাধূলা, সাংগঠনিক কর্মকান্ড ছাড়াও উৎসব ও নিমন্ত্রণের মত সামাজিক কর্মকান্ডেও মনোনয়ন প্রত্যাশিদের গণসংযোগ এখন সর্বত্রই দৃশ্যমান।

 

ভারতীয় সীমান্তর্তী উপজেলা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া আসন নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ময়মনসিংহ-১। দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১০৬টি। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে মাঠে রয়েছেন হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে হামলা, মামলায় নির্যাতন ও গ্রেপ্তার হয়েও দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি ছুটেছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। সেই সঙ্গে টানা ১০ বছর ধরে এই আসনের প্রতিটি প্রামে,পাড়া-মহল্লায় সরব ছিলেন মানুষের সুখে-দুঃখে। তাঁর সঙ্গে প্রার্থীতায় লড়বেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা প্রবীণ সাংবাদিক ও আইনজীবী আফজাল এইচ খান এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ি তরুন রাজনীতিক বিএনপি নেতা সালমান ওমর রুবেল।

 

সমতল ভূমি ও খাল-বিলে সমৃদ্ধ ফুলপুর-তারাকান্দা উপজেলার নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ময়মনসিংহ-২। এবারের নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৩টি। এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হিসাবে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ার বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের সঙ্গে বেঈমানি করে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিস্কার হন। আগামী নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির মনোনয়নে মূল আলোচনায় রয়েছেন দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার। বিগত লড়াই সংগ্রামে তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে থেকেছেন। তবে তার সঙ্গে প্রার্থীতায় আছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও উত্তর জেলা কৃষকদলের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল বাসার আকন্দ, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক সুজাউদ্দৌলা সুজা ও ময়মনসিংহ মহানগর যুবদলের সাধারন সম্পাদক জোবায়েদ হোসেন শাকিল।

 

জেলার গৌরীপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৩ আসন। এতে মোট ভোটার রয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৯১টি। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে তৃনমূলের জনপ্রিয়তায় আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও নবগঠিত উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আহম্মেদ তায়েবুর রহমান হিরন। তাঁর সঙ্গে মনোয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য প্রকৌশলী মো: ইকবাল হোসাইন, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মো: নূরুল হক, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ডা: আব্দুস সেলিম এবং নবগঠিত উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব হাফেজ আজিজুল হক।

 

দেশের অষ্টম বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহের সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৪ আসন। সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশনে জেলার সর্বাধিক ভোটার নিয়ে গঠিত এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৩টি। এই আসনে ২০১৮ সালের কারচুপির নির্বাচনেও দেড় লক্ষাধিক ভোট পেয়ে দেশজুড়ে নজির সৃষ্টিকরেছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ। এবারও তিনি এই আসনে আলোচিত প্রার্থী। আসনটিতে এবার মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে রয়েছেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন। ইতোমধ্যে দলীয় প্রচার-প্রচারণায় তারা নিজেদের প্রার্থীতা হিসেবে জানান দিয়েছেন।

 

জেলার উত্তর-পশ্চিমের জনপদ জমিদারি স্থাপত্যের ঐতিহ্যগাঁথা মুক্তাগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৫ আসন। এবার এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭১টি। বিএনপির একমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে মাঠে সরব রয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক আলহাজ্ব জাকির হোসেন বাবলু। তাঁর নেতৃত্বেই আগামী নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি ভোটের চমক সৃষ্টি করবে বলে আশাবাদি দলটির নেতাকর্মীরা।

 

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৬ আসন। ভোটার সংখ্যার দিক থেকে এই আসনটি জেলার তৃতীয় অবস্থানে। এর মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২ হাজার ১০৫টি। এ আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন শেরে বাংলা একেএম ফজলুল হকের নাত জামাতা ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আকতারুল আলম ফারুক। তার সঙ্গে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্ধি বিগত ১৫ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের সম্মুখ সারির যোদ্ধা কেন্দ্রীয় যুবদলের সদ্য সাবেক প্রচার সম্পাদক আব্দুল করিম সরকার।

 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত শিল্পাঞ্চল লগুয়া ত্রিশাল উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৭ আসন। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮৯টি। বিএনপির হেভিওয়েট মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে মাঠে সরব রয়েছেন দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা: মাহাবুবুর রহমান লিটন। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে তিনি এই আসনে ধানের শীষের নমিনি ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই তৃণমূল বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। তবে গতবারের ন্যায় এবারও তার সঙ্গে মনোনয়ন চাইবেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। সেই সঙ্গে আসনটিতে নতুন প্রার্থী হিসাবে আওয়াজ দিয়েছেন নবগঠিত দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক শহীদুল আমিন খসরু।

 

কাঁচা মাটিয়া নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা জমিদারি স্থাপত্য সমৃদ্ধ ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৮ আসন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৫৬টি। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে এবারের নির্বাচনে এ আসনে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ি ও উপজেলা বিএনপির আহবায়ক প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। বিগত আন্দোলনে অর্থ যোগাদানদাতা হিসাবে গ্রেপ্তার হয়ে নির্যাতন ও কারাবন্দি হয়েছেন। তবে তার সঙ্গে প্রবল প্রতিদ্বন্ধি সাবেক এমপি ও সাবেক ক্রিকেটার শাহ নূরুল কবীর শাহীন এবং বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি, উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য কামরুজ্জামান লিটন।

 

নান্দাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৯ আসন। এবার এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৮টি। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসাবে এ আসনটিতে তৃণমূলে দল গোছাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন উপজেলা বিএনপির আহবায়ক প্রয়াত সাংসদ পুত্র ইয়াসের খান চৌধুরী। তার সঙ্গে প্রতি›দ্বন্ধিতা করবেন আরেক সাংসদ পুত্র নাসের খান চৌধুরী। তারা পারিবারিক সর্ম্পকে চাচাত্ত ভাই। আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন অবসরপ্রাপ্ত ও আলোচিত সেনা কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামসুল ইসলাম শামছ ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সাবেক ছাত্রনেতা মালশিয়া প্রবাসী ব্যবসায়ী মামুন বিন আব্দুল মান্নান।

 

রাজনীতির রক্তাক্ত জনপদ হিসাবে পরিচিত জেলার গফরগাঁও উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-১০ আসন। এতে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩টি। আগামী নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন চাইছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক সাবেক ছাত্রনেতা আলমগীর মাহমুদ আলম এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ডা: মোফাখারুল ইসলাম রানা। এছাড়াও আসনটিতে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন প্রবীণ বিএনপি নেতা এবি সিদ্দিক, মুশফিকুর রহমান এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক আকতারুজ্জামান বাচ্চু।

 

Share this news as a Photo Card