০৪:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শতকোটি টাকার সরকারি জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি : আদালতের হস্তক্ষেপে দলিল স্থগিত

 

ময়মনসিংহ নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পাটগুদামের শতকোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি মাত্র ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা জানাজানি হলে ময়মনসিংহের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক বিতর্কিত দলিলটির রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার আদেশ দিয়েছেন।

 

এই ঘটনায় রোববার সকাল থেকেই দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু মোহাম্মদ সারোয়ার হোসাইন এর নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি টিম সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও জেলা জজ আদালতের সদর কোর্টের বেঞ্চ সহকারীর কার্যালয়ে বিভিন্ন নথিপত্র ঘেটে দেখেন।

 

জানা যায়, জমিটি মূলত রেবতী মোহন দাসের মালিকানাধীন ছিল। ১৯৬৩ সালে এটি আইনগত প্রক্রিয়ায় আদমজী জুট মিলস লিমিটেডের নামে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে, জুট মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে জমিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে এবং বিআরএস জরিপে এটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়।

 

এর প্রায় ৬০ বছর পর, ২০২২ সালে রবীন্দ্র মোহন দাস নিজেকে রেবতী মোহন দাসের ছেলে দাবি করে জেলা প্রশাসক ও বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে একটি মামলা (নং-৫১৪/২২) দায়ের করেন। যদিও আদালত ২০২৪ সালের ৮ মে মামলাটি খারিজ করে দেয়।

 

তবে, মামলা খারিজ হওয়ার আগেই রবীন্দ্র মোহন দাস মিরাশ উদ্দিন সুমন নামে একজনকে আমমোক্তারনামা (মামলা পরিচালনার ক্ষমতা) দেন। এরপর তিনি মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে নতুন করে ছানি মামলা দায়ের করেন। মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেই চলতি বছরের ৬ জুন জমিটির ৮৪ শতক মাত্র ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রির একটি দলিল সম্পাদিত হয়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য শতকোটি টাকা।

 

জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এই দলিলে দাতা হিসেবে রবীন্দ্র মোহন দাসের নাম থাকলেও তার পক্ষে সিনিয়র সহকারী জজ পবন চন্দ্র বর্মণ স্বাক্ষর করেন।

 

ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়লে দুদক সহ ময়মনসিংহের প্রশাসন তড়িঘড়ি করে তদন্তে নামে। এর ফলস্বরূপ একই আদালতের বিচারক পবন চন্দ্র বর্মণ এই মামলায় বিতর্কিত দলিলটির সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দেন।

 

সিনিয়র সহকারী জজ পবন চন্দ্র বর্মন এর আদেশে বলা হয়, রোববার (২৪ আগষ্ট) নথি উপস্থাপন সহ দলিল বাতিলের জন্য ছানি মোকাদ্দমা দায়ের করা হয়েছে। দরখাস্ত মঞ্জুর করা হলো। একই সাথে ২৭ এপ্রিলের ডিক্রি স্থগিত সহ দলিলের কার্যক্রম স্থগিত করা হলো।

 

এর আগে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ভূমি বিশারদরা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি সম্পত্তি কীভাবে আবার ব্যক্তি মালিকানায় বিক্রি হলো। তিনি এই ঘটনায় মামলার বাদী বিবাদী, আদালতপাড়া ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।

 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখছেন এবং গাফিলতির কিছু প্রমাণও পেয়েছেন। এ বিষয়ে আদালতে একটি ছানি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট প্রবীর মজুমদার চন্দন এই ঘটনার গভীর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি জানান, আপাতত আদালতের নির্দেশে দলিলটির রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হওয়ায় শতকোটি টাকার এই সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন জালিয়াতি রোধ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

 

দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু মোহাম্মদ সারোয়ার হোসাইন বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের গাফিলতির কিছু প্রমান পেয়েছি। আদালত থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে দলিল ও ডিক্রি বাতিলের জন্য। এ ঘটনার সাথে যে বা যারা জড়িত তাদের বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

চীনে টাইফুন ডলফিনের তাণ্ডব, সরানো হলো ১০ লাখের বেশি মানুষ

ময়মনসিংহে ‘হার ভোট,হার সিট’ ক্যাম্পেইন

09 August 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

শতকোটি টাকার সরকারি জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি : আদালতের হস্তক্ষেপে দলিল স্থগিত

পোষ্টের সময় : ০৭:২৪:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৫

 

ময়মনসিংহ নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পাটগুদামের শতকোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি মাত্র ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা জানাজানি হলে ময়মনসিংহের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক বিতর্কিত দলিলটির রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার আদেশ দিয়েছেন।

 

এই ঘটনায় রোববার সকাল থেকেই দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু মোহাম্মদ সারোয়ার হোসাইন এর নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি টিম সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও জেলা জজ আদালতের সদর কোর্টের বেঞ্চ সহকারীর কার্যালয়ে বিভিন্ন নথিপত্র ঘেটে দেখেন।

 

জানা যায়, জমিটি মূলত রেবতী মোহন দাসের মালিকানাধীন ছিল। ১৯৬৩ সালে এটি আইনগত প্রক্রিয়ায় আদমজী জুট মিলস লিমিটেডের নামে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে, জুট মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে জমিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে এবং বিআরএস জরিপে এটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়।

 

এর প্রায় ৬০ বছর পর, ২০২২ সালে রবীন্দ্র মোহন দাস নিজেকে রেবতী মোহন দাসের ছেলে দাবি করে জেলা প্রশাসক ও বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে একটি মামলা (নং-৫১৪/২২) দায়ের করেন। যদিও আদালত ২০২৪ সালের ৮ মে মামলাটি খারিজ করে দেয়।

 

তবে, মামলা খারিজ হওয়ার আগেই রবীন্দ্র মোহন দাস মিরাশ উদ্দিন সুমন নামে একজনকে আমমোক্তারনামা (মামলা পরিচালনার ক্ষমতা) দেন। এরপর তিনি মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে নতুন করে ছানি মামলা দায়ের করেন। মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেই চলতি বছরের ৬ জুন জমিটির ৮৪ শতক মাত্র ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রির একটি দলিল সম্পাদিত হয়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য শতকোটি টাকা।

 

জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এই দলিলে দাতা হিসেবে রবীন্দ্র মোহন দাসের নাম থাকলেও তার পক্ষে সিনিয়র সহকারী জজ পবন চন্দ্র বর্মণ স্বাক্ষর করেন।

 

ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়লে দুদক সহ ময়মনসিংহের প্রশাসন তড়িঘড়ি করে তদন্তে নামে। এর ফলস্বরূপ একই আদালতের বিচারক পবন চন্দ্র বর্মণ এই মামলায় বিতর্কিত দলিলটির সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দেন।

 

সিনিয়র সহকারী জজ পবন চন্দ্র বর্মন এর আদেশে বলা হয়, রোববার (২৪ আগষ্ট) নথি উপস্থাপন সহ দলিল বাতিলের জন্য ছানি মোকাদ্দমা দায়ের করা হয়েছে। দরখাস্ত মঞ্জুর করা হলো। একই সাথে ২৭ এপ্রিলের ডিক্রি স্থগিত সহ দলিলের কার্যক্রম স্থগিত করা হলো।

 

এর আগে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ভূমি বিশারদরা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি সম্পত্তি কীভাবে আবার ব্যক্তি মালিকানায় বিক্রি হলো। তিনি এই ঘটনায় মামলার বাদী বিবাদী, আদালতপাড়া ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।

 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখছেন এবং গাফিলতির কিছু প্রমাণও পেয়েছেন। এ বিষয়ে আদালতে একটি ছানি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট প্রবীর মজুমদার চন্দন এই ঘটনার গভীর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি জানান, আপাতত আদালতের নির্দেশে দলিলটির রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হওয়ায় শতকোটি টাকার এই সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন জালিয়াতি রোধ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

 

দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু মোহাম্মদ সারোয়ার হোসাইন বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের গাফিলতির কিছু প্রমান পেয়েছি। আদালত থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে দলিল ও ডিক্রি বাতিলের জন্য। এ ঘটনার সাথে যে বা যারা জড়িত তাদের বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

 

Share this news as a Photo Card