১১:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাতুড়িপেটায় শ্রমিক নেতা হত্যা, যুবদল-ছাত্রদলের তিন নেতা বহিষ্কার

 

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ও পালকি গাড়িচালক মানিক মিয়া (৪০) হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রদলের আরও দুই নেতাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।

 

এদিকে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, হাতুড়ি দিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার পর ঘটনাটি ‘মাদক ব্যবসায়ীদের গণপিটুনি’ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি অস্ত্রের মুখে মানিক মিয়ার স্ত্রীকে দিয়ে জোরপূর্বক একটি ভিডিও বক্তব্যও ধারণ করা হয়।

 

শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেলে গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

 

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নিহতের স্ত্রী সোমাইয়া আক্তার সেলিনা বাদী হয়ে গৌরীপুর থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সিকে।

 

নিহত মানিক মিয়া গৌরীপুর পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ডের সতিশা রোড এলাকার আজিবুল ইসলামের ছেলে। তিনি গৌরীপুর উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন এবং জীবিকার জন্য পালকি গাড়ি চালাতেন।

 

নিহতের ছোট ভাই সুখ মিয়া জানান, শোয়েব মুন্সির সঙ্গে তাদের পরিবারের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকা অবস্থায় শোয়েব মুন্সির নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল মানিক মিয়ার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে।

 

পরে আহত মানিক মিয়াকে বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে সতিশা রোডে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রী সেলিনার হাতে তুলে দেওয়া হয়। স্বজনরা তাকে প্রথমে গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান।

 

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আহত মানিক মিয়াকে তার স্ত্রীর কাছে হস্তান্তরের সময় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সেলিনা আক্তারকে দিয়ে একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিওতে তাকে বলতে বাধ্য করা হয় যে, তার স্বামী মাদক ব্যবসায়ী এবং মাদক ব্যবসার বিরোধকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজন তাকে মারধর করেছে। একই সঙ্গে তাকে হুমকি দেওয়া হয়, মানিক মিয়া বেঁচে থাকলে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে।

 

এ ঘটনার পর বুধবার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। পরদিন বৃহস্পতিবার বাবার দাফন সম্পন্ন করেই এইচএসসি বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেয় নিহতের ছেলে আদিব মাহমুদ আলিফ। গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে স্বজনদের কান্নার মধ্যে পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ করে সে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ মিনিট আগে পরীক্ষা শেষ করে বেরিয়ে আসে আলিফ।

 

এদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর জনবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সি, গৌরীপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল ইমরান খান এবং গৌরীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রিফাত খানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

 

কেন্দ্রীয় যুবদলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তর) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো ধরনের অপকর্মের দায়-দায়িত্ব দল নেবে না। একই সঙ্গে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নের সিদ্ধান্তে এ আদেশ কার্যকর হয়েছে।

 

গৌরীপুর থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, “এখনও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।”

 

Share this news as a Photo Card

ট্যাগ :
অধিক পঠিত

প্রকাশ্যে এসে খামেনির কফিন ছুঁয়ে কাঁদলেন বিপ্লবী গার্ডের প্রধান

কবি নজরুলকে বর্তমান প্রজন্মের সাথে সম্পৃক্ত রাখতে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে: প্রিন্স

02 July 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.dailybexpress.com

হাতুড়িপেটায় শ্রমিক নেতা হত্যা, যুবদল-ছাত্রদলের তিন নেতা বহিষ্কার

পোষ্টের সময় : ০৮:৩২:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

 

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ও পালকি গাড়িচালক মানিক মিয়া (৪০) হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রদলের আরও দুই নেতাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।

 

এদিকে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, হাতুড়ি দিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার পর ঘটনাটি ‘মাদক ব্যবসায়ীদের গণপিটুনি’ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি অস্ত্রের মুখে মানিক মিয়ার স্ত্রীকে দিয়ে জোরপূর্বক একটি ভিডিও বক্তব্যও ধারণ করা হয়।

 

শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেলে গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

 

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নিহতের স্ত্রী সোমাইয়া আক্তার সেলিনা বাদী হয়ে গৌরীপুর থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সিকে।

 

নিহত মানিক মিয়া গৌরীপুর পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ডের সতিশা রোড এলাকার আজিবুল ইসলামের ছেলে। তিনি গৌরীপুর উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন এবং জীবিকার জন্য পালকি গাড়ি চালাতেন।

 

নিহতের ছোট ভাই সুখ মিয়া জানান, শোয়েব মুন্সির সঙ্গে তাদের পরিবারের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকা অবস্থায় শোয়েব মুন্সির নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল মানিক মিয়ার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে।

 

পরে আহত মানিক মিয়াকে বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে সতিশা রোডে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রী সেলিনার হাতে তুলে দেওয়া হয়। স্বজনরা তাকে প্রথমে গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান।

 

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আহত মানিক মিয়াকে তার স্ত্রীর কাছে হস্তান্তরের সময় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সেলিনা আক্তারকে দিয়ে একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিওতে তাকে বলতে বাধ্য করা হয় যে, তার স্বামী মাদক ব্যবসায়ী এবং মাদক ব্যবসার বিরোধকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজন তাকে মারধর করেছে। একই সঙ্গে তাকে হুমকি দেওয়া হয়, মানিক মিয়া বেঁচে থাকলে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে।

 

এ ঘটনার পর বুধবার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। পরদিন বৃহস্পতিবার বাবার দাফন সম্পন্ন করেই এইচএসসি বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেয় নিহতের ছেলে আদিব মাহমুদ আলিফ। গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে স্বজনদের কান্নার মধ্যে পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ করে সে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ মিনিট আগে পরীক্ষা শেষ করে বেরিয়ে আসে আলিফ।

 

এদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর জনবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সি, গৌরীপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল ইমরান খান এবং গৌরীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রিফাত খানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

 

কেন্দ্রীয় যুবদলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তর) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো ধরনের অপকর্মের দায়-দায়িত্ব দল নেবে না। একই সঙ্গে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নের সিদ্ধান্তে এ আদেশ কার্যকর হয়েছে।

 

গৌরীপুর থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, “এখনও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।”

 

Share this news as a Photo Card