আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরব আরও একবার উজ্জ্বল করে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কৃতি সন্তান অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান। গবেষণা, উদ্ভাবন ও একাডেমিক উৎকর্ষে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এডি সায়েন্টিফিক ইনডেক্স র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় মালয়েশিয়ায় প্রথম, এশিয়ায় দ্বিতীয় এবং বিশ্বে সপ্তম স্থান অর্জন করেছেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত এডি সায়েন্টিফিক ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি বিভাগের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় বিশ্বের ৩৩ হাজার ৩৭১ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান লাভ করেন অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগের বছর ২০২৫ সালেও তিনি একই র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে ছিলেন–যা তার গবেষণায় ধারাবাহিক উৎকর্ষ, স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
শুধু তাই নয়, স্কলারজিপিএস ২০২৫ অনুযায়ী টেকসই জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণায় তিনি বিশ্বের শীর্ষ বিজ্ঞানী হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একই বছরে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এলসেভিয়ার-এর যৌথ বিশ্লেষণে প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায়, মালয়েশিয়ার বিজ্ঞানীদের মধ্যে এনার্জি গবেষণায়ও তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।
অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সানওয়ে ইউনিভার্সিটি থেকে উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনে উৎকর্ষতা পুরস্কার এবং শিক্ষাদানে শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞতা স্বীকৃতি পুরস্কার লাভ করেন। পাশাপাশি, ২০২৫ সালের মর্যাদাপূর্ণ ওবাদা পুরস্কার-এ তিনি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ক্যাটাগরিতে সম্মানিত হন। বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এই পুরস্কার বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সম্মানজনক; ২০২৫ সালে সারা বিশ্ব থেকে মাত্র ৮ জন বিজ্ঞানী এই সম্মানে ভূষিত হন–যাদের মধ্যে অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান অন্যতম।
গুগল স্কলার-এর তথ্যমতে, অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমানের এইচ-ইনডেক্স ১৪৫ এবং তার গবেষণাকর্মে ৮৬ হাজারেরও বেশি সাইটেশন রয়েছে, যা তাকে বিশ্বের প্রভাবশালী গবেষকদের শীর্ষ কাতারে স্থান দিয়েছে। তিনি ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের চরনিয়ামত গ্রামের সন্তান। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সাবেক শিক্ষার্থী অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান বর্তমানে মালয়েশিয়ার স্বনামধন্য সানওয়ে ইউনিভার্সিটি-তে অধ্যাপনা করছেন।
২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নিজ গবেষণা ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ গবেষক হিসেবে অবস্থান করায় তিনি ক্ল্যারিভেট অ্যানালিটিক্স কর্তৃক বিশ্বসেরা গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তার গবেষণা কার্যক্রম মালয়েশিয়ার উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃকও স্বীকৃত।
এমএক্সিন-ভিত্তিক ন্যানোম্যাটেরিয়াল গবেষণায় স্কোপাস ডেটা বিশ্লেষণে মালয়েশিয়ায় প্রথম স্থান এবং ন্যানোফ্লুইড গবেষণায় ওয়েব অব সায়েন্স অনুযায়ী বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি গবেষণাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
তরুণ গবেষকদের অনুপ্রাণিত করতে অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান তার ২৮ বছরের গবেষণা অভিজ্ঞতা নিয়মিতভাবে অনলাইন সেমিনার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও একটি ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে শেয়ার করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
নিজ উদ্যোগে ১৫ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি ব্যয়ে তিনি সানওয়ে ইউনিভার্সিটিতে একটি অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপন করেছেন। যেখানে জ্বালানি প্রযুক্তি, উন্নত উপাদান, এনার্জি স্টোরেজ, সৌর শক্তি এবং বিশুদ্ধ পানি উন্নয়নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।
জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার তাকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) সম্মাননায় ভূষিত করে।
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান বলেন, “এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তির নয়। আমার শিক্ষার্থী, গবেষণা দল, সহকর্মী, প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে।”
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও গবেষণাক্ষেত্রে এই অর্জন নিঃসন্দেহে এক গৌরবময় অধ্যায়, যা আগামী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
শাহ্ নাফিউল্লাহ সৈকত 




















