আগামী নির্বাচনে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম টানতে সর্বোচ্চ নজর দেবে বিএনপি। এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম টানতে না পারলে পুরো দেশ ও জাতি সংকটে পড়বে। যে কোনো মূল্যে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি-বাংলাদেশে যদি কেউ দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারে, সেটা একমাত্র বিএনপির পক্ষেই সম্ভব। কারণ, আমরা অতীতে করেছি, ভবিষ্যতেও এই কাজটি করে দেখাতে পারব।
রোববার রাজধানীর ফার্মগেটের খামারবাড়ী কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিজয়ের মাস উপলক্ষ্যে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএনপি। ছাত্রদলের সারা দেশের জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিটের হাজারের বেশি নেতা এতে অংশ নেন।
জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, ‘কোনো কোনো গোষ্ঠীকে ইদানীং বলতে শুনেছি-অমুককে দেখলাম, তমুককে দেখলাম, এবার তমুককে দেখুন। যাদের কথা বলে, তাদের তো দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই দেখেছে। ১৯৭১ সালে তারা নিজেদের স্বার্থরক্ষার্থে কীভাবে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে।’
তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলে, একবার দেখুন না, তাদেরকে দেশের মানুষ একাত্তরেই দেখেছে-নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে লাখ লাখ মানুষকে শুধু হত্যাই করেনি, তাদের সহকর্মীরা কীভাবে মা-বোনদের ইজ্জত পর্যন্ত লুট করেছিল, এ কথাটি আমাদের মনে রাখতে হবে।’
তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের কিছু ব্যক্তি বা বেশকিছু ব্যক্তি বিভিন্ন জিনিসের টিকিট বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন। বিভিন্ন জিনিসের কনফারমেশন (নিশ্চয়তা) দিয়ে বেড়াচ্ছেন। দোজখ, বেহেশত, দুনিয়া-সবকিছুর মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ, যেটার কথা একমাত্র আল্লাহতায়ালাই বলতে পারেন। সেখানে আমার নরমাল দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝি যে, সেটি (টিকিট বিক্রি) হচ্ছে শিরক। সেটি শিরকের পর্যায়ে পড়ে।’
ছাত্রদলের নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে, যারা এসব কথা বলে, তারা শিরক করছে। যারা শুনবেন, তারাও শিরকের পর্যায়ে পড়ে যাবেন।
সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে-এমন সতর্কবার্তা দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘এক বছরের বেশি সময় ধরে আমি বলে আসছি যে, আমাদের সামনের সময়গুলো কিন্তু খুব ভালো নয়। সামনে অনেক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে।’ এসব ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পারে এই দেশের জনগণ। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পারে বিএনপি। এই ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে গণতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্র। আমরা যদি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে অবশ্যই অনেক ষড়যন্ত্রকে আমরা রুখে দিতে পারব।’
২০০১-২০০৬ সালে বিএনপির জোট সরকারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বৈরাচার যেভাবে বিএনপি সম্পর্কে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াত, আমরা ইদানীং লক্ষ করছি-কিছু কিছু ব্যক্তি বা দল ঠিক একই সুরে কথা বলার চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাদেরও তো দুজন ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে সরকারে ছিলেন। তারা এখন পৃথিবীতে আর নেই। দুজনই সিনিয়র রাজনীতিবিদ ছিলেন। কাজেই যে মানুষ নেই, তাদের সম্পর্কে অবশ্যই খারাপ কথা বলা উচিত নয়। তাদের প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান রেখেই বলতে চাই, ওই দুই ব্যক্তির বিএনপির সরকারে শেষদিন পর্যন্ত থাকা প্রমাণ করে দেয়, তাদের পূর্ণ কনফিডেন্স খালেদা জিয়ার ওপরে ছিল; যে খালেদা জিয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। সেজন্যই তারা শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, আমরা দুই মাস পরে একটি নির্বাচন প্রত্যাশা করছি। পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার গত ১৬ বছর এই দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কীভাবে ধ্বংস করে গিয়েছে, এটি আমরা জীবনের পরতে পরতে অনুভব করতে পারি। যেদিন স্বৈরাচার পালিয়ে যায় আমাকে মহাসচিব সাহেব (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) ফোন করলেন। ফোন করে তিনি বললেন যে, জাতীয় সরকার গঠিত করলে ভালো হয় কিনা বা আমরা জাতীয় সরকারে যাব কিনা। আমি তখন বলেছিলাম, আমরা জনগণের রায় মাথা পেতে নেব। আমরা জনগণের কাছে যাব। কাজেই আমি সেই মুহূর্তে মনে করেছিলাম, জাতীয় সরকারে আমরা যাব না। আমাদের লক্ষ্য, আমাদের উদ্দেশ্য-সবকিছু নিয়ে আমরা জনগণের সামনে দাঁড়াব। আমরা স্লোগানে বলি যে, জনগণই আমাদের সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। জনগণই যদি আমাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস হয়ে থাকে, তাহলে কেন আমরা জনগণের সামনে গিয়ে দাঁড়াব না? জনগণ যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা সে সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেব।
তিনি বলেন, বিএনপি বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরও বানাতে চায় না, মালয়েশিয়াও বানাতে চায় না, কানাডাও বানাতে চায় না, যুক্তরাষ্ট্র বানাতে চায় না।
আমরা চাই, একটি স্বাবলম্বী বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকবে। মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকবে, শান্তিতে থাকবে। যেখানে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে আমরা সক্ষম হব, সেরকম একটি বাংলাদেশ চাই।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একটা গোষ্ঠী, একটা মহল ধর্মের নামে বাংলাদেশে একটা বিভাজনের পথ সৃষ্টি করতে চায়। আমরা বাংলাদেশের মানুষ অবশ্যই ধর্মভীরু, অবশ্যই ধর্মকে এখানে আমরা সবাই মেনে চলি। কিন্তু ধর্মকে নিয়ে রাষ্ট্রকে বিভাজন করা বা সমাজকে বিভাজন করা-আমরা এতে বিশ্বাস করি না। আমরা মনে করি যে, বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বাস করবে, একইভাবে থাকবে এবং ১৯৭১ সালে যে স্বাধীনতারযুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল সকলের বাংলাদেশ।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যে পরিকল্পনা, সেগুলোকে বাস্তবায়িত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে সামনের দিকে নিয়ে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হবে। বিএনপি হচ্ছে, সেই দল, যেই দল অতীতে যেমন সব সংস্কার করেছে, রাজনৈতিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক সংস্কার বাংলাদেশের সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে। ঠিক একইভাবে আগামী দিনেও বাংলাদেশ অবশ্যই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নেতৃত্বে অন্যতম একটা সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে, এই বিশ্বাস আমাদের আছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দেশগড়া পরিকল্পনা শীর্ষক কমিটির আহ্বায়ক রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী-খান সোহেলের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন প্রমুখ।
স্টাফ রিপোর্টার 
























