ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কার কাজের জন্য দেওয়া সরকারি বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কাজের কোনো বাস্তব চিত্র না থাকলেও বিল উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা উপজেলার ৪৩ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট কেন্দ্র সংস্কার বাবদ প্রায় ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সুহিলা, মহিষতারা, চেচুয়া, বাঁশাটি জগন্নাথবাড়ী, শিমলা, আমির উদ্দিন পৌর, কান্দুলিয়া ও আরফান আলী পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে রাজাবাড়ী, নরকোনা, সৈয়দপাড়া, কান্দাপাড়া, সত্রাশিয়া, আমোদপুর ও সৈয়দগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। আবার মনতলা ১ লাখ ২০ হাজার, মন্ডলসেন ও জয়দা ৯০ হাজার রঘুনাথপুর ও হায়দরপুর ৮০ হাজার, কুতুবপুর ও বন্দগোয়ালিয়া ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। এছাড়া বেশ কিছু বিদ্যালয়ে ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়। সব মিলে ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট কেন্দ্র সংস্কার বাবদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তবে বাস্তবতা ঘুরে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। একাধিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, দেয়াল রং, বেঞ্চ মেরামত, টয়লেট সংস্কার কিংবা শ্রেণীকক্ষ উন্নয়নের কোনো কাজই হয়নি। কিছু কিছু বিদ্যালয়ে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। গাড়াইকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (দক্ষিন) গিয়ে দেখা গেছে, এই বিদ্যালয়ে কোনো কাজই হয়নি। এমনকি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক স্টাফরাও জানেন না এই বিদ্যালয়ে ভোট কেন্দ্র সংস্কার বাবদ দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোরশেদা আজিজ বলেন, টাকা সময়মত উত্তোলন করা হয়েছে। নানা কারনে সংস্থার করা হয়নি তবে কাজ করা হবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বিষয়টি বারবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা তো কোনো কাজই হতে দেখিনি। হঠাৎ শুনি টাকা এসেছে, আবার বিলও তুলে নেওয়া হয়েছে। আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
গারাইকুটি স্কুল এলাকার কয়েকজন দোকানদার বলেন, আমরা আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পারলাম,এই বিদ্যালয়ে সংস্কার বাবদ টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে। তারা বলেন, এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অসংখ্য অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস করেন না।
অভিভাবক সদস্য অভিযোগ করে বলেন, স্কুলের উন্নয়ন নিয়ে সাধারণত কমিটির বৈঠক হয়। কিন্তু এবার কিছুই হয়নি। সব কিছু গোপনে করা হয়েছে। পরে শুনি কাজ নাকি শেষ!
একই তথ্য পাওয়া গেছে আরফান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই বিদ্যালয়ে কাজ না করে সিংহভাগই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সেলিম মিয়া এই প্রতিবেদকে বলেন, এই বিষয়ে নিয়ে খোঁচাখুঁচি করবেন না। আমরা শিক্ষা অফিসারকে দেবি হিসেবে জানি। লেখালেখি করে লাভ নেই। যা হওয়ার কাজ হয়েছে।
স্থানীয় আরেক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের স্কুলে কোনো পরিবর্তনই দেখি নাই। অথচ কাগজে কলমে নাকি সব কাজ শেষ। তাহলে টাকা গেল কোথায়?
পৌর শহরের নায়েব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা খাতুন বলেন, সংস্থার বাবদ ৫০ হাজার বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভ্যাট বাদ দিয়ে ৪০ হাজার টাকা পেয়েছি। তার মধ্যে টাকা তুলতে আরও ১৫শ টাকা সরকারি অফিসে দিতে হয়েছে। আর বাকি টাকা দিয়ে কাঁচিগেট ঠিক করা হবে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ‘পার্সেন্টেজ’ বা কমিশন লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক, শিক্ষা অফিসের কিছু কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী একটি মহল মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
নির্বাচনের আগে, অর্থাৎ ১২ ফেব্রæয়ারির মধ্যেই এসব কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, নির্বাচনী প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত মিলছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবতায় তদন্ত করতে হবে। তারা বলছেন, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। অন্যথায় এই ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।
বিল উত্তোলন বাবদ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তবে তিনি সাংবাদিকদের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। কেউ এর সত্যতা দিতে পারবে না।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কবিতা নন্দী বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতেই বিল সুপারিশ করার কথা ছিলো। আমি বারবার ইউএনও স্যারের কাছে গিয়েছি কিন্তু সে আমার কোন কথাই শোনেনি।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ রবিউল ইসলাম জানান, আমাদের টিম কাজগুলো পরিদর্শন করেছে। তবে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন, কাজ হয়নি কিন্তু বিল উত্তোলন করা হয়েছে, এরকম অভিযোগ আমি পাইনি। বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মো.মনিরুজ্জামান 




















