ঈদের আনন্দ যেখানে প্রতিটি ঘরে খুশির বার্তা নিয়ে আসার কথা ছিল, সেখানে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে আজ শুধুই মাতম আর বুকফাটা হাহাকার। ৪ বছরের শিশু মরিয়মের কাল নতুন জামা-জুতা পরে হাসিমুখে ঘরময় ছুটে বেড়ানোর কথা ছিল। অথচ আজ সেই নিষ্পাপ দেহটি উদ্ধার করা হলো প্রতিবেশীর রান্নাঘরের চুলার ভেতর থেকে। ৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কোলজুড়ে আসা একমাত্র সন্তানটিকে হারিয়ে আজ দিশেহারা এক দম্পতি।
ঘটনাটি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি এলাকার। গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে নিখোঁজ ছিল শিশু মরিয়ম আক্তার। পরিবারের সদস্যরা চারদিকে হন্যে হয়ে খুঁজলেও কোথাও তার সন্ধান মেলেনি। অবশেষে সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে প্রতিবেশী এক কিশোরের বাড়ির রান্নাঘরের চুলার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় মরিয়মের নিথর দেহ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল মরিয়মের গলায় থাকা মাত্র ১২ আনা ওজনের একটি রুপার চেইন।
ঘাতক ইয়াসিন (১৬) একজন মাদকাসক্ত কিশোর। নেশার টাকার জোগাড় করতে সে মরিয়মের গলার চেইনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। শিশুটি ভয়ে কান্না শুরু করলে ঘাতক তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং মরদেহটি লোকচক্ষুর আড়ালে চুলার ভেতর লুকিয়ে রাখে। এরপর সেই সামান্য চেইনটি আঠারবাড়ি বাজারের একটি দোকানে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করে দেয়। একটি অমূল্য জীবনের দাম কি তবে মাত্র বারোশ টাকা?
১৬ বছরের একটি কিশোরের এমন চরম নিষ্ঠুরতা পুরো সমাজকে আজ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নেশা আর টাকার লালসা তাকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছে যে, প্রতিবেশীর একটি অবোধ শিশুকে হত্যা করতেও তার হাত কাঁপেনি। আমাদের প্রশাসনের নাকের ডগায় এই কিশোর অপরাধীরা আজ বেপরোয়া। মাদক আর কিশোর গ্যাং কালচার আজ সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। এই দায় কার?
ঈদের আগের এই বিষাদময় দিনে ঈশ্বরগঞ্জের আকাশে-বাতাসে এখন কেবলই সন্তানহারা মা-বাবার আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যে কোল ছিল পাঁচ বছরের সাধনার ফল, সেই কোল আজ চিরতরে শূন্য। পাড়া-মহল্লায় কিশোরদের এই ভয়ঙ্কর অপরাধপ্রবণতা আর প্রশাসনের নজরদারির অভাব আজ একটি সাজানো পরিবারকে ধ্বংস করে দিল।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আজম জানিয়েছেন, রুপার চেইনের লোভে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত কিশোরকে ইতিমধ্যেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং তার বাবাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এই সমাজ কোথায় যাচ্ছে? আজ মরিয়ম গেছে, কাল হয়তো অন্য কেউ। প্রশাসনের প্রতি আকুল আবেদন, এই ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। নেশার ছোবল আর কিশোর অপরাধের লাগাম এখনই টেনে না ধরলে এমন করুণ মৃত্যু থামানো অসম্ভব। মরিয়মের মা-বাবার এই আর্তনাদ যেন বৃথা না যায়—এটাই এখন এলাকাবাসীর একমাত্র দাবি।





















