প্রস্তাবনা: এক ফোঁটা জলের আত্মজীবনী
একটি মহাসাগর কীভাবে জন্ম নেয়?
প্রশ্নটি অল্প শব্দের হলেও এর গভীরতা অথৈ।
একটি মহাসাগরের জন্ম কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এর পেছনে লুকিয়ে থাকে কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন, পৃথিবীর অভ্যন্তরের অদৃশ্য শক্তি, ভূত্বকের টানাপোড়েন এবং মহাদেশের ধীর বিচরণ।
যে জলরাশি আজ আমাদের কাছে চিরন্তন বলে মনে হয়, তারও রয়েছে জন্মের গল্প। সেই গল্প লেখা হয়েছে পৃথিবীর বুকের গভীরে, সময়ের অতল অন্ধকারে।
মহাসাগরের জন্ম কি হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণের মতো, নাকি পৃথিবীর বুকের গভীরে কোটি কোটি বছরের নিঃশব্দ টানাপোড়েনের ফল?
আজ আমরা যে নীল পৃথিবীর দিকে তাকাই, তার মহাসাগরগুলোকে মনে হয় যেন চিরকালই এমন ছিল। অথচ তা নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন আজকের পরিচিত মহাসাগরগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ছিল না আটলান্টিক। ছিল না ভারত মহাসাগর। ছিল না আজকের প্রশান্ত মহাসাগরও।
ছিল কেবল এক উত্তপ্ত, অস্থির, সদ্যগঠিত পৃথিবী।
আনুমানিক ৪৫৪ কোটি বছর আগে জন্ম নেওয়া এই গ্রহের প্রথম অধ্যায় ছিল প্রচণ্ড উত্তাপ, মহাজাগতিক সংঘর্ষ, আগ্নেয়গিরি ও ক্রমাগত ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের গল্প। পৃথিবীর পৃষ্ঠ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হলো, ভূত্বক গঠিত হতে শুরু করল, বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হলো। আর পৃথিবীর পৃষ্ঠে তরল জলের স্থায়ী উপস্থিতির পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করল।
সেই প্রথম জলকে কেউ দেখেনি।
তার প্রথম ঢেউয়ের শব্দ কেউ শোনেনি।
তার কোনো মানচিত্রও নেই।
তবু পৃথিবী তার সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কিছু চিহ্ন রেখে গেছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিরকন স্ফটিকের ভেতরে।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার Jack Hills অঞ্চলে পাওয়া প্রায় ৪৪০ কোটি বছরের পুরোনো জিরকন পৃথিবীর প্রাচীনতম খনিজগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব জিরকনের অক্সিজেন আইসোটোপের বৈশিষ্ট্য প্রাচীন তরল জলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়।
২০০১ সালের এক গবেষণায় ৪৪০ কোটি বছরের একটি জিরকনের বয়স নির্ধারণ করা হয় এবং প্রাচীন পৃথিবীর পৃষ্ঠে তরল জলের অস্তিত্বের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
আরও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও প্রাচীন পৃথিবীতে জলীয় পরিবেশের উপস্থিতির পক্ষে প্রমাণকে শক্তিশালী করেছে। তবে বিজ্ঞান এখানে একটি সতর্কবার্তা মনে রাখতে বলে, এই প্রমাণকে পৃথিবীর ‘প্রথম মহাসাগরের নির্দিষ্ট জন্মতারিখ’ হিসেবে ধরা যায় না।
অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রথম জলরাশির গল্পটি অত্যন্ত প্রাচীন; তবে তার সঠিক জন্মমুহূর্ত এখনো অজানা।
এ যেন কোনো পোড়া পাণ্ডুলিপির ছাই থেকে গোটা একটি মহাকাব্য পুনর্গঠনের চেষ্টা।
কিন্তু এই গল্প এখানেই শেষ নয়।
কারণ পৃথিবী শুধু তার প্রাচীন জলভুবনের গল্পই আমাদের শোনায় না; সে আমাদের সামনে ভবিষ্যতের আরেকটি মহাসাগরের সম্ভাবনাও রেখে দিয়েছে।
পূর্ব আফ্রিকার Afar অঞ্চলে পৃথিবীর ভূত্বক ধীরে ধীরে প্রসারিত ও পাতলা হচ্ছে। সেখানে আফ্রিকান প্লেটের বিভিন্ন অংশ এবং আরবীয় প্লেটের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল রিফট ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।
এই অঞ্চল এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ নতুন মহাসাগর নয়। তবে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময় ধরে রিফটিং অব্যাহত থাকলে সেখানে নতুন ocean basin গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালের Eos-এর একটি প্রতিবেদনে Afar-কে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ভবিষ্যৎ ocean basin তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জনপ্রিয় ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য ‘ষষ্ঠ মহাসাগর’।
অর্থাৎ, পৃথিবী যেন আবারও নিজের পুরোনো গল্পটি নতুন করে লিখতে শুরু করেছে।
এক: সৃষ্টির রহস্য — যেখানে বিজ্ঞানও নতজানু
পৃথিবীর বয়স আনুমানিক ৪৫৪ কোটি বছর। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম কয়েকশ কোটি বছরের ইতিহাস পড়া সহজ নয়। কারণ সেই সময়ের অধিকাংশ শিলা, ভূত্বক ও ভূতাত্ত্বিক চিহ্ন পরবর্তী আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ, ক্ষয়, রূপান্তর, সংঘর্ষ ও টেকটোনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে হারিয়ে গেছে বা বদলে গেছে।
পৃথিবী কোনো জাদুঘর নয় যে পুরোনো জিনিস অবিকৃত রেখে দেবে।
সে নিজেই নিজের ইতিহাস বারবার মুছে লিখেছে।
এই কারণেই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর আদিম ইতিহাস অনুসন্ধান করেন সরাসরি কোনো প্রাচীন মহাসাগরের তলদেশ খুঁজে নয়, বরং টিকে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূতাত্ত্বিক সূত্রের মাধ্যমে।
জিরকন তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এই ক্ষুদ্র খনিজ স্ফটিকের বয়স নির্ণয় করা যায় অত্যন্ত নির্ভুলভাবে। এর ভেতরের রাসায়নিক ও আইসোটোপীয় সংকেত আবার জানাতে পারে, যে পরিবেশে এটি তৈরি হয়েছিল সেখানে জল ও ভূ-পৃষ্ঠের সঙ্গে কী ধরনের মিথস্ক্রিয়া ঘটেছিল এবং প্রাচীন ভূত্বকের বিবর্তন সম্পর্কে কী ধারণা পাওয়া যায়।
তাই একটি ক্ষুদ্র জিরকন কখনো কখনো হয়ে ওঠে ৪০০ কোটিরও বেশি বছরের পুরোনো পৃথিবীর সাক্ষী।
এখানেই একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কতা জরুরি।
আমরা বলতে পারি না,
“এই তারিখেই পৃথিবীর প্রথম মহাসাগর জন্মেছিল।”
কারণ প্রাচীন তরল জলের প্রমাণ এবং একটি নির্দিষ্ট, পূর্ণাঙ্গ ‘প্রথম মহাসাগর’-এর জন্ম একই বিষয় নয়।
বিজ্ঞান এখানে নিশ্চয়তার চেয়ে সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলে।
আর সেই সতর্কতাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য।
দুই: যে সূত্রগুলো ছাই থেকে গল্প বলে
পৃথিবীর প্রাচীন জলভুবনের সন্ধানে জিরকন ছাড়াও বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন শিলা, খনিজ, আইসোটোপ, আগ্নেয়গিরির নিদর্শন, সমুদ্রতলের চৌম্বকীয় রেখা এবং ভূত্বকের গঠন।
প্রতিটি সূত্র যেন একটি অসম্পূর্ণ বাক্য।
সবগুলোকে একত্র করলে তৈরি হয় পৃথিবীর দীর্ঘ আত্মজীবনী।
পৃথিবীর ইতিহাসের শুরুতে মহাজাগতিক সংঘর্ষ ছিল প্রচণ্ড। উল্কাপাত ও অন্যান্য মহাজাগতিক আঘাতের হার ছিল আজকের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপও ছিল তীব্র। ফলে প্রাচীন পৃথিবীর পৃষ্ঠ বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।
তাই আদিম পৃথিবীর কোনো একটি দৃশ্যকে ধরে বলা যায় না যে, “এটাই ছিল পৃথিবীর চেহারা।”
বরং বলা যায়, পৃথিবী ছিল ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এক গ্রহ।
কখনো উত্তপ্ত, কখনো অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা! কোথাও কঠিন ভূত্বক, কোথাও গলিত শিলা! কোথাও জলীয়বাষ্প, কোথাও তরল জল।
আর এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে সেই পৃথিবী, যেখানে পরে মহাসাগর ও মহাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস শুরু হয়।
জল শুধু পৃথিবীর পৃষ্ঠকে বদলায়নি; শিলা, বায়ুমণ্ডল ও ভূ-অভ্যন্তরের পারস্পরিক ক্রিয়াকেও প্রভাবিত করেছে। পৃথিবীর রাসায়নিক ও জলবায়ুগত বিবর্তনে জল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আর কোনো এক পর্যায়ে সেই জলভুবনেই জীবনের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
জীবনের একেবারে প্রথম উৎপত্তি কোথায় এবং কীভাবে ঘটেছিল, তা এখনো বিজ্ঞানের অন্যতম বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন। মহাসাগর, অগভীর জলরাশি এবং সমুদ্রতলের hydrothermal vent—সবই সম্ভাব্য পরিবেশ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
অর্থাৎ, পৃথিবীর জল শুধু ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের অংশ নয়; এটি জীবনের ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
তিন: মানচিত্র, যা কখনো আঁকা হয়নি — শুধু কল্পনা করা হয়েছে
আজকের পৃথিবীর মানচিত্র দেখে মনে হতে পারে, মহাদেশগুলো যেন চিরকাল এমনভাবেই পাশাপাশি ছিল।
আসলে তারা হাঁটে।
খুব ধীরে।
এত ধীরে যে মানুষের একটি জীবন দিয়ে সেই চলাচল চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে এই সামান্য গতি মহাদেশের অবস্থান বদলে দেয়, মহাসাগরের দ্বার খুলে দেয়, আবার বন্ধও করে দেয়।
এখানেই আসে Wilson Cycle—মহাসাগরীয় অববাহিকার জন্ম, বিস্তার, সংকোচন এবং শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক চক্র।
কোনো মহাদেশের ভেতর ভূত্বক ফাটতে শুরু করলে তৈরি হতে পারে rift। সেই বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকলে ভূত্বক আরও পাতলা হতে পারে। একসময় নতুন সমুদ্রপথ তৈরি হতে পারে। তারপর সমুদ্রতলের বিস্তারের মাধ্যমে একটি নতুন ocean basin গড়ে উঠতে পারে।
আবার অন্য কোনো প্রান্তে oceanic crust subduction zone-এ পৃথিবীর অভ্যন্তরে ডুবে যেতে যেতে পুরোনো মহাসাগর সংকুচিত হতে পারে।
অর্থাৎ,
কোনো মহাসাগরই চিরন্তন নয়।
সে জন্মায়।
বড় হয়।
বদলে যায়।
একদিন বিলীনও হতে পারে।
পৃথিবী যেন নিজেই নিজের মানচিত্র আঁকে।
আবার নিজেই তা মুছে দেয়।
চার: আজকের পাঁচ মহাসাগর যেন একই মায়ের পাঁচ সন্তান
আজ সাধারণভাবে পৃথিবীর পাঁচটি নামাঙ্কিত মহাসাগর—প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর, ভারত মহাসাগর, আর্কটিক মহাসাগর ও দক্ষিণ মহাসাগর।
তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলো পাঁচটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জলরাশি নয়। এগুলো পরস্পর সংযুক্ত একটি বৈশ্বিক মহাসাগরের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল। NOAA-ও পৃথিবীর মহাসাগরকে একটি আন্তঃসংযুক্ত global ocean হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
এই পাঁচটির ইতিহাসও এক নয়।
আটলান্টিক তুলনামূলকভাবে তরুণ মহাসাগরীয় অববাহিকা। এটি Pangaea ভাঙনের সঙ্গে সম্পর্কিত দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, একসময়ের বিশাল Panthalassa মহাসাগর Pangaea-কে ঘিরে ছিল। তার অধিকাংশ প্রাচীন oceanic lithosphere পরবর্তী subduction-এর মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিলীন হয়ে গেছে।
বর্তমান Pacific basin-এর সংরক্ষিত প্রাচীনতম oceanic rocks-এর বয়স প্রায় ২০ কোটি বছর। তাই Panthalassa এবং বর্তমান Pacific Ocean-কে সম্পূর্ণ একই মহাসাগর বলা বৈজ্ঞানিকভাবে অতিসরলীকরণ হবে। NOAA বর্তমান Pacific-কে বিদ্যমান ocean basins-এর মধ্যে প্রাচীনতম বলে উল্লেখ করে।
এখানে সময়ের বিশালত্বটি উপলব্ধি করা কঠিন।
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের।
কিন্তু একটি মহাসাগরের জন্ম-মৃত্যুর গল্প চলে কোটি কোটি বছরের ক্যানভাসে।
এই কারণেই মানুষের ঘড়ি আর পৃথিবীর ঘড়ি এক নয়।
মানুষের কাছে এক হাজার বছর বিশাল সময়।
পৃথিবীর কাছে তা একটি মুহূর্তের মতো। চোখের পলকে চলে উদয়-অস্তের খেলা।
পাঁচ: ‘ষষ্ঠ মহাসাগর’—যাকে হয়তো পৃথিবী জন্ম দিতে যাচ্ছে
এবার আসা যাক সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রশ্নে।
তবে কি পৃথিবীর বুক চিরে জন্ম নিচ্ছে নতুন মহাসাগর?
উত্তরটি একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না।
হ্যাঁ। কারণ পূর্ব আফ্রিকার Afar ও East African Rift অঞ্চলে পৃথিবীর ভূত্বক সত্যিই বিচ্ছিন্ন ও প্রসারিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
আবার একই সঙ্গে ‘না’ বলা চলে। কারণ সেখানে এখনো কোনো নতুন পূর্ণাঙ্গ মহাসাগর তৈরি হয়নি।
Afar একটি গুরুত্বপূর্ণ triple-junction অঞ্চল, যেখানে তিনটি রিফট ব্যবস্থা বিভিন্ন পর্যায়ে বিকশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের Nature Geoscience গবেষণায় Afar অঞ্চলের আগ্নেয় নমুনা ও ভূ-রাসায়নিক তথ্য বিশ্লেষণ করে mantle upwelling এবং তার সঙ্গে tectonic plate dynamics-এর সম্পর্ক নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যায়।
এই অঞ্চলে ভূত্বক প্রসারিত হচ্ছে। ফাটল তৈরি হচ্ছে। আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ ঘটছে এবং magma ভূত্বকের ফাটল ধরে ওপরে উঠছে।
২০০৫ সালের Dabbahu rifting episode ছিল এর একটি অসাধারণ উদাহরণ।
সেই ঘটনায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি dyke বা ম্যাগমা-ভর্তি ফাটল তৈরি হয়েছিল এবং satellite radar data-তে ওই অঞ্চলে কয়েক মিটার পর্যন্ত ভূত্বকীয় বিচ্যুতি ধরা পড়ে। ঘটনাটির একটি বড় অংশ কয়েক দিনের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছিল।
ভাবুন!
পৃথিবীর ভূত্বকের একটি বিশাল অংশ কয়েক দিনের মধ্যে কয়েক মিটার পর্যন্ত সরে যাচ্ছে।
মানুষের চোখে এটি প্রায় অকল্পনীয়।
কিন্তু পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক সময়ে এটি তার দীর্ঘ বিচ্ছেদের একটি ক্ষুদ্র দৃশ্য মাত্র।
যদি এই বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, ভবিষ্যতে সেখানে continental crust-এর জায়গায় oceanic crust এবং একটি নতুন ocean basin গড়ে উঠতে পারে।
তবে কবে কী ঘটবে, সে বিষয়ে কোনো নির্ভুল সময়সীমা দেওয়া যায় না।
কয়েক মিলিয়ন বছরের মতো সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও মডেল থাকলেও এটিকে কোনো নিশ্চিত ‘countdown’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। continental rifting থেকে পূর্ণাঙ্গ oceanic spreading-এ রূপান্তরের ধাপ ও সময় নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
২০২৬ সালের Eos প্রতিবেদনে Afar অঞ্চলের বর্তমান ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনকে ভবিষ্যৎ ocean basin তৈরির সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ বিবর্তন যে এখনো গবেষণার বিষয়, সেটিও স্পষ্ট।
তাই ‘ষষ্ঠ মহাসাগর জন্ম নিচ্ছে’—এটি একটি আকর্ষণীয় জনপ্রিয় অভিব্যক্তি।
বৈজ্ঞানিকভাবে আরও নির্ভুল ভাষায় বলা যায়,
একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মহাসাগরীয় অববাহিকার জন্য প্রয়োজনীয় ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ বর্তমানে সক্রিয়।
আর সেই কারণেই Afar পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক গবেষণার এক অসাধারণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার।
ছয়: উপসংহার — যা পার্থক্য গড়ে দেয়
পৃথিবীর ইতিহাস আসলে কোনো স্থির ছবির ইতিহাস নয়।
এটি একটি চলমান চলচ্চিত্র।
প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর আগে যার প্রথম দৃশ্য শুরু হয়েছিল, সেই চলচ্চিত্র এখনো চলছে।
একসময়ের পৃথিবীর পৃষ্ঠে তরল জল ছিল কি না, তার উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা ক্ষুদ্র জিরকনের ভেতর তাকান।
একসময়ের বিশাল Panthalassa-এর হারিয়ে যাওয়া ভূত্বক ও তার উত্তরাধিকার অনুসন্ধান করতে তারা সমুদ্রতলের চৌম্বকীয় রেখা, শিলার বয়স এবং প্লেটের গতিপথ বিশ্লেষণ করেন।
আর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নতুন মহাসাগরের জন্মের গল্প পড়তে তারা তাকান Afar-এর ফাটল, আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প, satellite radar এবং ভূ-অভ্যন্তরের magma-এর দিকে।
কী আশ্চর্য!
পৃথিবী তার অতীতের অধিকাংশ স্মৃতি মুছে ফেলেছে, কিন্তু কিছু চিহ্ন রেখে গেছে।
আবার ভবিষ্যতের কিছু দৃশ্যও যেন আগেভাগেই লিখে রাখছে।
আজ আমরা পাঁচটি নামাঙ্কিত মহাসাগর নিয়ে পৃথিবীর মানচিত্র আঁকি। কিন্তু সেই মানচিত্রও চূড়ান্ত নয়। কারণ পৃথিবীর কোনো মানচিত্রই চূড়ান্ত নয়।
মহাদেশগুলো চলছে।
ভূত্বক ভাঙছে।
নতুন সমুদ্রপথ তৈরি হচ্ছে।
পুরোনো মহাসাগর সংকুচিত হচ্ছে।
কোথাও oceanic crust জন্ম নিচ্ছে। কোথাও তা পৃথিবীর গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
আর মানুষ দাঁড়িয়ে আছে এই মহাকালের মাঝখানে—একটি ক্ষুদ্র সময়ের যাত্রী হয়ে।
হয়তো কোটি কোটি বছর পরে পৃথিবীর মানচিত্র সম্পূর্ণ অপরিচিত হবে।
হতে পারে আজকের কিছু স্থলভাগ তখন সমুদ্রের তলদেশে থাকবে।
নয়তো আজকের সমুদ্রের কোনো অংশ তখন আর থাকবেই না।
আর Afar অঞ্চলের কোনো এক ভবিষ্যৎ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে হয়তো আজকের পরিচিত মহাদেশের মাঝখানে নীল হয়ে জেগে থাকবে একটি নতুন মহাসাগরীয় অববাহিকা।
তখন কেউ পৃথিবীর সেই মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ভাববে—
এই মহাসাগরটির জন্ম কোথায়?
তার উত্তর লুকিয়ে থাকবে আজকের ফাটলগুলোর মধ্যে।
আজকের ভূমিকম্পে।
আজকের আগ্নেয়গিরিতে।
আজকের সেই ধীর, প্রায় অদৃশ্য ভূত্বকীয় চলাচলে।
কারণ একটাই—
পৃথিবী থেমে নেই।
তার মহাদেশগুলোও হাঁটছে।
নতুন সমুদ্রের জন্মের অপেক্ষায়।
পুরোনো সমুদ্র বিলীন হচ্ছে।
প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে মানচিত্র।
‘পৃথিবীর প্রথম জলবিন্দু থেকে সম্ভাব্য ষষ্ঠ মহাসাগর’—এটি আসলে একই গল্পের দুই প্রান্ত।
এক প্রান্তে আমাদের অতীত, যার সাক্ষী কয়েকটি প্রাচীন জিরকন।
অপর প্রান্তে আমাদের ভবিষ্যৎ। যে ভবিষ্যতের প্রথম রেখাগুলো হয়তো আজই আঁকা হচ্ছে পৃথিবীর বুকের গভীরে।
বিশ্লেষক—ন. নাহার আনছারী
ন. নাহার আনছারী 



















