চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আস্থাহীনতায় গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত প্রত্যাহারের মুখে বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়েছে ইসলামী ব্যাংক। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকটিকে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোববার (১৪ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সহায়তার এ অর্থের মধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে আরও ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে সম্প্রতি আবারও অস্থিরতা ও গভীর তারল্য সংকট দেখা দেয়। ব্যাংকটির শীর্ষ নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তন এবং নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। এর প্রভাবে এক সপ্তাহে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নেন গ্রাহকরা।
আমানত প্রত্যাহারের চাপ বাড়তে থাকায় ব্যাংকটির তারল্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকটির ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) উদ্বৃত্ত থাকার কথা থাকলেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত ব্যাংকটির চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ব্যালেন্সও চাপে পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, খুরশীদ আলমের নিয়োগের আগে ইসলামী ব্যাংকের সিআরআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ছিল। ব্যাংকটির সিআরআর যেখানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা, সেখানে টানা আমানত উত্তোলনের ফলে তা কমে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
দৈনন্দিন লেনদেন ও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে থাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করে ইসলামী ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কেন তৈরি হলো এই অস্থিরতা?
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমন অবস্থায় আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে যদি চেয়ারম্যান পদত্যাগ ও গ্রাহক ফোরামের দাবি না মানে তাহলে ওইদিন বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে, গত শুক্রবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, ইসলামী ব্যাংকে সরকার অবৈধ হস্তক্ষেপ করছে না এবং ব্যাংকটির কার্যক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো অনিয়মতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ করেনি।
গভর্নর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামি ব্যাংকে ৫ সদস্যের একটি বোর্ড ছিল। ওই বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংক কারও বদলি বা পদোন্নতির বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে ইসলামী ব্যাংকে সরকার অবৈধ হস্তক্ষেপ করছে। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু হয়নি।

স্টাফ রিপোর্টার 
























