জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি কবি হেলাল হাফিজ…
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’।- যদি একটু বয়সী কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় প্রথম কোথায় পড়েছেন এই লাইন দু’টো, আমি নিশ্চিত অধিকাংশরই উত্তর হবে দেয়ালে। সত্তর, আশি এবং নব্বই-তুমুল এই তিন দশকের তো ছিলই, বর্তমানের এবং ভাবীকালের যৌবনের হিরন্ময় উচ্চারণ এই লাইন দু’টো। একসময় দেয়ালে দেয়ালে ‘চিকামারা’ হয়েছে এবং এখনো যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবি হেলাল হাফিজের কালজয়ী এই লাইন দু’টো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, প্রকাশনায় ‘ব্যানারপোস্ট’ করা হয়।
‘নিউট্রন বোমা বোঝো, মানুষ বোঝো না’। দু’লাইনের ছয় শব্দের মধ্যে দিয়ে মানবিক এক পৃথিবীর এমন ঘোষণা আর কোনো কবি দিয়েছেন কিনা জানিনা!
কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন না, ছিলেন প্রচন্ডভাবে রাজনীতি সচেতন মানুষ। তাই তো অসংস্কৃত রাজনীতির বিরুদ্ধে এভাবেই বলতে পারেন তিনি, ‘ভোলায়া ভালায়া আর কথা দিয়া কতোদিন ঠাগাইবেন মানুষ, ভাবছেন অহনো তাদের অয় নাই হুঁশ।… রাইত অইলে অমুক ভবনে বেশ আনাগোনা, খুব কানাকানি, আমিও গ্রামের পোলা চুতমারানি গাইল দিতে জানি।’
হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৭ অক্টোবর নেত্রকোণায় জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা খোরশেদ আলী তালুকদার আর মা কোকিলা বেগম। নেত্রকোণা শহরেই কেটেছে কবির শৈশব, কৈশোর ও প্রথম যৌবন। শৈশবে মাকে হারিয়ে গভীর এক বেদনাবোধ নিয়ে বেড়ে উঠেছেন হেলাল হাফিজ। তাঁর কবি হয়ে উঠায় অন্যতম প্রভাব রাখে মাতৃবিয়োগ। এ প্রসঙ্গে কবি বলেন, ‘আমি খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছি যে, আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এই মাতৃহীনতার বেদনা। এটা আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়েছে। আজকে যে হেলাল হাফিজকে দেখছো তোমরা, তার এই অবস্থানে আসা এবং তাকে তৈরি করার রাস্তাটা মাতৃহীনতার বেদনাই পরিষ্কার করে গেছে।’
১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন হেলাল হাফিজ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি। সে রাতে ফজলুল হক হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে সেখানেই থেকে যান। রাতে নিজের হল ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক) থাকার কথা ছিল। সেখানে থাকলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হতেন।
১৭ বছর লেখালেখির পর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় হেলাল হাফিজের প্রথম ও সাড়া জাগানো কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। সেই বইয়ের ৫৬টি কবিতা তাঁকে বাংলা কবিতার জগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। একটি মাত্র বইয়ের মাধ্যমে কাব্য সাম্রাজ্যে রাজত্ব করে আসা কবির কপালে বিরলপ্রজ তকমা জোটে।
২৬ বছর পর ২০১২ খ্রিস্টাব্দে বের হয় কবির ‘কবিতা একাত্তর’। এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদের নাম ‘দ্য টিয়ার্স দ্যাট ব্লেজ’। কবিতা একাত্তরে প্রথম গ্রন্থের ৫৬টি কবিতার সঙ্গে ১৫টি নতুন কবিতা যুক্ত হয়। ২০১৯ এর গোড়ায় এর সঙ্গে ১৭টি নতুন কবিতা যুক্ত হয়ে বের হয় দ্বিভাষিক বই ‘এক জীবনের জন্মজখম’। এর ইংরেজি অনুবাদের নাম রাখা হয় ‘বার্থ উন্ড অব ওয়ান লাইফ’। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দেই ৩৪টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় কবির দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’।
‘আমার আর ঘর হলো না, সংসার হলো না…’
দৈনিক ‘প্রথম আলো’র সাথে এক আলাপে তাঁর জীবনপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে এমন তিনটি ঘটনার উল্লেখ করে হেলাল হাফিজ বলেছিলেন, ‘তিনটি ঘটনাই আমার জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে। আমি সফল নাকি ব্যর্থ, হিসাব কষতে বসলেও ওই তিনটি ঘটনা অবধারিতভাবে সামনে চলে আসে। আজ আমার যতটুকু সফলতা, সেই তিনটি ঘটনা তার পেছনে দায়ী। আবার আমার যতটা ব্যর্থতা, তার পেছনেও আছে ওই তিন ঘটনা।
প্রথম ঘটনা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চের। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) থাকি। ওই দিন সন্ধ্যায় নিউমার্কেটের দিকে আড্ডা দিয়ে রাতে হলে ফিরেছি। ক্যান্টিন বন্ধ। খেতে গেলাম মেডিকেল গেটের কাছে পপুলার নামের একটা রেস্টুরেন্টে। খাওয়া শেষে মনে হলো, ফজলুল হক হলে বন্ধু হাবিবুল্লাহ থাকে, ওর সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। গেলাম ফজলুল হক হলে। হাবিবুল্লাহর কক্ষে গিয়ে আমি আড্ডা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর, রাত তখন পৌনে ১০টা হবে, হঠাৎ গোলাগুলির বিকট আওয়াজ। আমরা হলের ছাদে উঠে দেখলাম, নীলক্ষেত, নিউমার্কেটের দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
২৭ মার্চ সকালে ইকবাল হলে গিয়ে দেখি, মাঠের মাঝখানে, এখানে-ওখানে শুধু লাশ আর লাশ। নিজের কক্ষে গিয়ে স্যুটকেস গুছিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। এখান থেকে পালাতে হবে, না হলে বাঁচা সম্ভব নয়। হলের গেটে এসে দেখি নির্মলেন্দু গুণ দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল, ‘আমি ভেবেছি তুমি মারা গেছো, তোমার লাশ নিতে এসেছি।’ বলেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আমিও সজোরে কাঁদতে লাগলাম। তারপর সেখান থেকে আমার বড় ভাইয়ের বাসায় গিয়ে উঠলাম।
এই ঘটনা আমার হৃদয়ে ব্যাপকভাবে ছাপ ফেলল। আমার তখন কেবলই মনে হতো, ওই রাতে যদি আমি ফজলুল হক হলে না গিয়ে নিজের হলে ফিরতাম, তাহলে তো বাঁচতাম না। একটা বোনাস জীবন পেয়েছি-এই উপলব্ধি আমার ভেতর বিরাট বৈরাগ্য এনে দিল। এক ধরনের সন্ন্যাস জীবনযাপন শুরু করলাম আমি।
এর পরের ঘটনা ’৭৩ খ্রিস্টাব্দের জুনের। ১৯ জুন আমার পিতার মৃত্যু হলো। তিন বছর বয়সে মা মারা যাওয়ার পর আব্বাই ছিলেন আমার সবকিছু। তাঁর মৃত্যু প্রবলভাবে ধাক্কা দিল আমাকে। মনে হলো, জগৎসংসার তুচ্ছ। সব অর্থহীন। আমার বৈরাগ্য আরও প্রগাঢ় হলো।
আব্বার মৃত্যুর মাসখানেক পরই ঘটল তৃতীয় ঘটনা। ঘটনা ঘটাল হেলেন, আমার প্রেমিকা। হেলেন হঠাৎ ডেকে বলল, ‘কবি, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।’ আমরা গিয়ে বসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে। সে বলল, ‘আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। বাবা-মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।’
ছোটবেলা থেকে আমি খুব সহনশীল ছিলাম। প্রচন্ড সহ্যশক্তি আমার। তাই ভেতরের ঝড় বুঝতে দিলাম না হেলেনকে। ওখান থেকে উঠে রিকশা নিয়ে সোজা হলে চলে গেলাম। ওটাই হেলেনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা ও শেষ কথা।
এই তিনটি ঘটনা আমাকে চিরস্থায়ীভাবে সংসারবিমুখ করে ফেলল। আমার আর ঘর হলো না, সংসার হলো না, অর্থকড়ি হলো না, প্রতিষ্ঠা হলো না।’
হেলাল হাফিজ রচিত কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়, নিরাশ্রয় পাঁচটি আঙুল, অগ্ন্যুৎসব, দুঃসময়ে আমার যৌবন, অস্ত্র সমর্পণ, বেদনা বোনের মতো, ইচ্ছে ছিলো, প্রতিমা, অন্যরকম সংসার, নিখুঁত স্ট্রাটেজি, আমার সকল আয়োজন, অনির্ণীত নারী, অশ্লীল সভ্যতা, কবিতার কসম খেলাম, পরানের পাখি, বাম হাত তোমাকে দিলাম, উপসংহার, হিরণবালা, দুঃখের আরেক নাম, প্রত্যাবর্তন ইত্রাদি। পাঠকমাত্রই জানেন যে, সংখ্যার হিসেবে খুবই কম লিখেছেন হেলাল হাফিজ। এও জানা যে, সংখ্যা যতো স্বল্পই হোক, এর রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। শুরু থেকেই তাঁর কবিতা তৈরি করেছে যুগোত্তীর্ণতার দাবী।
সাংবাদিক হেলাল হাফিজ
কবি হেলাল হাফিজ সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায়। তখনও তিনি ছাত্র। পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ইকবাল হলে (পরে নাম রাখা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) থাকেন। পূর্বদেশের সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন আ ন ম গোলাম মোস্তফা। শিফট ইন চার্জ ছিলেন ডেস্কের। একাত্তরে তিনি শহীদ হন। তৎকালীন ডাকসাইটে ছাত্রনেতা আসম আবদুর রব একদিন তাঁকে বললেন, ‘দেশ তো স্বাধীন হলো। কবি, তুই কি নিবি বল।’ কবি বললেন, ‘সাংবাদিকতা করতে চাই’।
আসম আবদুর রব পূর্বদেশ-এ কথা বলে দিলেন। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার তখন সম্পাদক ছিলেন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। দেখা করার পর উনি প্রথমে হেলাল হাফিজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার করে দেওয়ার কথা বললেন। পরে তাঁর ব্যাপারে কী করা যায়, তা নিয়ে জরুরি একটা মিটিং হলো। সেই মিটিংয়ে কবিও উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রখ্যাত কবি, অবজারভার ভবনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা আবদুল গনি হাজারী বললেন, ‘যে ছেলে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র মত কবিতা লিখেছে, সে ছাত্র কিনা সেটা বিবেচনা করার দরকার নেই। হায়দার, এখুনি ওকে এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দাও।’ তাঁকে সাহিত্য পাতার দায়িত্ব দেয়া হলো। চার বছর সেখানে কাজ করেছিলেন হেলাল হাফিজ। এরপর একটা বিরতি।
১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে প্রকাশিত হলো ‘দৈনিক দেশ’ নামের নতুন একটা দৈনিক পত্রিকা। সেই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী। দীর্ঘকাল দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক বাংলায় সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি ফটোগ্রাফার মানু মুন্সীকে দিয়ে হেলাল হাফিজকে খবর পাঠালেন উনার সঙ্গে দেখা করার জন্য। ‘৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি দৈনিক দেশ পত্রিকায় যোগদান করেন। ১১ বছর সেখানে কাজ করেন। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে সে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় বারের মতো ছেদ ঘটে সাংবাদিকতা পেশায়। কিন্তু হতাশ হয়ে যাননি কবি। কিছুটা বেকারত্বের সময় পার করে আবার ফিরেছিলেন সাংবাদিকতা পেশায়। এ প্রসঙ্গে হেলাল হাফিজ বলেন, ‘সাংবাদিক হিসেবে আমি সাহিত্য পাতা সম্পাদনার কাজেই নিয়োজিত ছিলাম। সংবাদপত্রে ওই পদ একটাই। একাধিক নেই। আমি যদি ডেস্কে বা রিপোর্টিংয়ে থাকতাম, তাহলে কাজ পাওয়ার স্কোপ বেশি থাকত। সে কারণে অনেকদিন বেকার থাকতে হলো। একরকম বাধ্য হয়েই। কেউ আমাকে ডাকে না। আমার অবশ্য চাকরি করবার কোনো দরকারও নাই। ও, এর মধ্যে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে আমি একটা আমন্ত্রণ পেলাম আমেরিকা সফরের। ছয় মাসের মত ছিলাম আমেরিকায়। মূল অনুষ্ঠান ছিল মাত্র দিন তিনেকের। তবে আমি বেশ কিছুদিন থেকে গেলাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখানে ওখানে ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ালাম। আমেরিকা থেকে ফেরার পর একটা ঘটনা ঘটে গেল। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা যোগ দিলেন দৈনিক যুগান্তরে। সম্পাদক হিসেবে তিনি ওই পত্রিকার দায়িত্ব নিলেন। যুগান্তরে জয়েন করেই তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘কালই আমার অফিসে চলে আসিস’। এসিস্ট্যান্ট এডিটর হিসেবে আমাকে মূসা ভাই নিয়োগ দিলেন যুগান্তরে। কিছুদিন আমি ফিচার সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছি সেখানে। ৭/৮ বছর পর যুগান্তর ছেড়ে দিলাম। তারপর কেউ আর ডাকেনি।’
তাহলে জীবন যাপনের ব্যয় নির্বাহ হয় কি করে, এমন জিজ্ঞাসার উত্তরে তিনি বলেন,‘মিরপুরের সাংবাদিক কলোনিতে আমার এক খন্ড জমি ছিল। সেটা ধরে রাখতে পারিনি। বেচে দিয়েছি। এছাড়া পৈতৃক বাড়ির সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ টাকা, চাকরির কিছু টাকা দিয়ে যেসব সঞ্চয়পত্র কিনেছি, তা থেকে পাওয়া টাকায় কোনোমতে টেনেটুনে চলে। আমি নির্জলা একা একটা মানুষ। ঘর সংসার, দায় দায়িত্ব বলতে কিছু নাই। হোটেল ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া সব মিলে হাজার বিশেক টাকায় চলে যায়। ওষুধপত্র, জামাকাপড়ের খরচপত্রও আছে। তবে শান্তির কথা হলো এই, মোটামুটি চলে যায় আমার। কোনো ধার দেনা করতে হয় না।’
কবিতা লেখার চাইতে Poetic হওয়াটা বেশি জরুরি…
কবিতা সম্পর্কে কবি’র উচ্চারণ, ‘কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচুস্তরের শিল্পমাধ্যম। কবিতা না লিখেও একজন কবি হতে পারে। ভালো ছবি এঁকে, ছবি তুলে, ভালো রাজনীতি কিংবা সিনেমা করেও কবি হওয়া যায়। কবিতা লেখার চাইতে Poetic হওয়াটা বেশি জরুরি। আর কবিতার ব্যাপারটা কি, ধরো প্রথমত বর্ণজ্ঞান থাকতে হবে। তারপর শুধু বর্ণজ্ঞান থাকলেই হবে না, ভালো লেখাপড়াও জানতে হবে। শুধু লেখাপড়া জানলেই হবে না, আগ্রহ থাকতে হবে কবিতার প্রতি। এ কারণেই পাঠককেও অনেকটা তৈরি হয়েই নামতে হবে যে আমি কবিতা পড়বো। কবিতাকে বোধগম্য করা কবির একার কাজ নয় পাঠকেরও কিছু কাজ আছে।’
কবি স্মরণ করিয়ে দেন, Poetry is the mirror, where we can see the whole sky! তাঁর কবিতা পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে। পাঠক তাঁর কবিতাকে তাড়াতাড়ি আপন করে নিতে পারে। এ সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে কবি বলেন, ‘এটা হচ্ছে মুন্সিয়ানা এবং এটা আমার কবিতার একটা বড় Plus point. তুমি রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান ধরো, এতবড় গানের বইটা নিয়ে যদি বসো এবং প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ৩০০০ বা ৩৫০০ গান তুমি করলে। তুমি দেখবে একটি গানও তোমার বোধের অগম্য নয়। সবকটা গান মনে হবে যে, আরে এটা তো আমিও লিখতে পারি!’
শিল্প মনুষ্যত্বের জয়গান গায়, পৃথিবীর দুঃখের অবসান চায়। কিন্তু তারপরেও এই সমগ্র পৃথিবীর এত এত মহান সব শিল্পী, শিল্পকর্ম, বিশ্বমোড়লদের প্রভাবিত করতে পারেনি বা পারছে না কেন? কেন পৃথিবীতে এখনো অন্ধকারের এতো আগ্রাসন? এমন প্রশ্নের কবি’র সহজ কিন্তু দৃঢ় উত্তর, ‘এইখানে…পুঁজিবাদের প্রভাব আছে।…পুঁজিবাদ তো শিল্পের বিকাশ ঘটতে দেবে না।’ সাথে যোগ করেন, ‘এই পুঁজিবাদতন্ত্রের কারণে আমাদের দাসত্ব বরণ করতে হচ্ছে। এখন আবার আমরাও সেসব মেনে নিচ্ছি। এটাকে অতিক্রম করা দরকার। সমাজতন্ত্রের হাতে আমাদের শান্তি হবে।’
কবি হলো একটা সার্বভৌম সত্তা
হেলাল হাফিজ মনে করতেন, একজন প্রকৃত শিল্পীর ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে থাকাই ভালো। তিনি বলেন, ‘পাওয়ারের সঙ্গে কবির মেশা কখনো ঠিক না। কবি হলো একটা সার্বভৌম সত্তা Sovereign identity. একটা সমাজ বা জনগোষ্ঠী কী অবস্থায় আছে, এটা সেই সমাজের কবিদেরকে দেখে বোঝা যায়। কবি হলো একটি সমাজের ব্যারোমিটার, সমাজটা কি নষ্ট-ভ্রষ্ট না কি ভালো, কতটুকু সভ্য আর উন্নত তা কবিদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। সমাজের কবিরা যদি পোষা পাখি হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে সে সমাজ দ্রুত গতিতে অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। কবি একটি জনগোষ্ঠীকে স্বপ্ন যেমন দেখাবে, তেমনি সেই জনগোষ্ঠীর স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকেও সে চিহ্নিত করে দেবে। কোথায় ভুল-ত্রুটি হচ্ছে তা দেখিয়ে দেয়াও কবির দায়িত্ব। এর অর্থ এই না যে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে। একজন কবির একটি রাজনৈতিক সংগঠন করার যাবতীয় অধিকার অবশ্যই আছে। নিশ্চয়ই করবে সে। কিন্তু আমার ধারণা যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হলে একধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা Automatically-ই আরোপিত হয়ে যায়।’ এর সাথে সাথে অবশ্য এও তিনি উল্লেখ করেন, ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায় তো সক্রিয় রাজনীতিই করতেন। সুকান্ত করতেন। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও।’ তবে এটাও যোগ করতে ভুলেননা যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না হলেও অন্য দশজন কবি’র তুলনায় বেশি রাজনৈতিক কবিতা পাওয়া যাবে তাঁর লেখায়। নতুনদের লেখা ভালো লাগতো কবি’র। নিয়মিত পড়তেন তরুণদের লেখা এবং লিখতে উৎসাহিত করতেন।
নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়, আহমদ ছফা, অতঃপর…
‘সময়বিশেষ কোনো একটি বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করে কবির আনন্দ বেদনা যখন প্রকাশের পথ পায় তখনই কবিতার জন্ম।’ নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতাটিও রচিত হয়েছিল বিশেষ একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। উত্তাল ঊনসত্তরের জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকের ঘটনা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পুরান ঢাকা থেকে রিকশায় হলে ফিরছেন একুশ বছর বয়সী টগবগে যুবক হেলাল হাফিজ। তখন ফুলবাড়িয়ায় ছিল রেলস্টেশন। স্টেশন পেরিয়ে গুলিস্তান চৌরাস্তায় এসে দেখেন বিক্ষোভরত ছাত্রদের বেদম পেটাচ্ছে ইপিআর এবং পুলিশ। তাঁর রিকশার পাশে এক মধ্যবয়সী রিকশাওয়ালা এসে দাঁড়াল। সে এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘মার, মার ওদেরকে। কিছু কিছু পেরেম (প্রেম) আছে মার্ডার করাও জায়েজ।’
রিকশাওয়ালার ওই কথাগুলো হেলাল হাফিজের মধ্যে আশ্চর্য রকম তরঙ্গ তুলল। ভাবনায় আচ্ছাদিত করে ফেলল তাঁকে। কতটা দেশপ্রেম থাকলে একজন সাধারণ রিকশাওয়ালা এমন কথা বলতে পারে! হলে ফিরে ওই কথাগুলো তাঁর কানে ক্রমাগত বাজতে লাগল। ভেতরে নতুন এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে! রিকশাওয়ালার কথাগুলোকে কীভাবে শিল্পে রূপ দেওয়া যায়, সেই যুদ্ধ!
কবিতার প্রসব বেদনায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট হেলাল হাফিজ ঘুমাতে পারেন না, ক্লাস করেন না। শরিফের ক্যান্টিন, কলাভবন, ইকবাল হল, নিউমার্কেটে মনিকো রেস্টুরেন্টে ঘুরে বেড়ান তিনি। এভাবে আট-দশ দিনে তিন পৃষ্ঠার একটা কবিতার জন্ম হয়। অতঃপর শরিফের ক্যান্টিনে গিয়ে আহমদ ছফা আর কবি হুমায়ুন কবিরকে কবিতাটা দেখান। কবিতা পড়ে তাঁকে বুকে টেনে নেন তাঁরা। চা-নাশতা খাওয়ান, দুপুরে বিরিয়ানিও! এর পর আহমদ ছফা বললেন, ‘কবিতাটা এত বড় রাখা যাবে না। কিছু জায়গায় ঝুলে গেছে। আমরা কিছুই বলব না; তুমি তোমার মতো করে এডিট কর।’ আরও পনেরো-বিশ দিন সময় নিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ বর্তমান রূপে আনলেন হেলাল হাফিজ। নিয়ে গেলেন আহমদ ছফার কাছে। সেখানে হুমায়ুন কবিরও ছিলেন। পড়ে বললেন, ‘এবার ঠিক আছে।’ তারা তাকে নিয়ে সোজা চলে গেলেন দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তী সময় দৈনিক বাংলা) অফিসে, সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের কাছে।
আহমদ ছফা কবিতাটা আহসান হাবীবের হাতে দিলেন। তিনি নিবিষ্ট মনে পড়লেন। পড়া শেষে তিনি বললেন, ‘আমি এখন যা বলব তাতে ও (হেলাল হাফিজ) কষ্ট পাবে; আমি এই কবিতা ছাপতে পারব না।’ একটু ধাক্কা খেলেন হেলাল হাফিজ। কিন্তু এরপর আহসান হাবীব যেটা বললেন, তাতে আর কোনো কষ্ট থাকল না হেলাল হাফিজের। তিনি বললেন, ‘শোনো তোমরা, এই কবিতাটি ছাপা যাবে না। ছাপলে আমার চাকরিটা চলে যাবে। পত্রিকা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তবে একটা কথা বলি, হেলালের আর কোনো কবিতা না লিখলেও চলবে। অমরত্ব ওর করায়ত্ত হয়ে গেছে।’ প্রসঙ্গটি স্মরণ করে হেলাল হাফিজ বলেছিলেন, ‘‘এখনও কানে বাজে কথাটা। তখন ছফা ভাই এসে হুমায়ুন কবিরকে সাথে নিয়ে, ওনারা তখন লেখক-শিবির করতেন, বাম ঘরানার Underground সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন। দুই রাতে সমস্ত ক্যাম্পাসের দেয়াল ভরে গেলো এই কবিতার পঙক্তিতে। ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। মাঝরাতে ‘চিকা’ মেরে মেরে করেছিলো এসব। পুরো ক্যাম্পাস। কার্জন হল, আর্টস বিল্ডিং। তখন তো এতকিছু ছিলো না ক্যাম্পাসে। এই দুটিই বড়, মূল বিল্ডিং। সমস্ত দেয়ালে চিকা মারার এই কাজের নেতৃত্বে ছিলেন ছফা ভাই। উনি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের শিষ্য।’’
কবিতাই আমার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং প্রণয়ের একমাত্র মাধ্যম…
‘সে আমার শৈশবের কথা, মানুষের নির্মমতায় আহত হয়ে একদিন কবিতার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেই থেকে কবিতার সাথে আমার দারুণ সখ্য আর গেরস্থালি শুরু। তারপর মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে। এখন কবিতাই আমার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং প্রণয়ের একমাত্র মাধ্যম। আজকাল আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না। কি জানি, হয়তো সেও এতদিনে আমার ভেতরে খুব নিরাপদ আশ্রম গড়েছে।’ নিজস্ব কাব্যভাবনা নিয়ে এ কথাগুলো হেলাল হাফিজ লিখেছিলেন সেই আশির দশকেই ‘যুগল জীবনী’কবিতায়;-
‘আমি ছেড়ে যেতে চাই কবিতা ছাড়ে না,/ দুরারোগ্য ক্যান্সারের মত
কবিতা আমার কোলে নিরাপদ আশ্রম গড়েছে…’।
‘আত্রেয়ীর মতো অন্তঃসলিলা’ কবি হেলাল হাফিজ
হেলাল হাফিজ খ্যাতিমান হয়েছেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখে, এই কথাটি সত্য হলেও এর মধ্যে সামান্য খটকাও আছে। ব্যাপারটা এরকম যে, ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লেখা না হলে কি তাঁর অন্যান্য কবিতা দিয়ে তিনি খ্যাতিমান হতেন না! আমরা বলব, অবশ্যই হতেন। কারণ তাঁর কবিতা যারা পাঠ করেছেন, তারা অবশ্যই এটি বলবেন যে, ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ ছাড়াও তাঁর অন্যান্য অনেক কবিতা আছে, যেসব কবিতার কারণে বাংলা কবিতার ইতিহাসে কবি’র নাম স্থায়ী হয়ে থাকবে সমভাবে। কবি হেলাল হাফিজকে যারা চিনি-জানি, তারা এ কথা মেনে নেব একবাক্যেই যে, তিনি জন্ম নিয়েছিলেন কবিতা লেখার উদ্দেশ্যেই এবং তিনি লিখেছেনও। তাঁর আপাদমস্তক ঘিরে শুধুই কবিতা। আর যিনি কবি হয়ে উঠবেন তিনি অস্বীকার করবেন নানা প্রথা, প্রচলিত রীতি-নীতি। হেলাল হাফিজ ঠিক তা-ই, ‘বেরিয়ে যে আসে সে তো এভাবেই আসে,/ দুর্বিনীত ধ্রুপদী টংকার তুলে
লন্ডভন্ড করে চলে আসে মৌলিক ভ্রমণে, পথে/ প্রচলিত রীতি-নীতি কিচ্ছু মানে না।’ [কে/যে জলে আগুন জ্বলে]।
হেলাল হাফিজকে নিয়ে আজকের আলাপ শেষ করতে চাই স্বনামখ্যাত শিল্পী ধ্রুব এষ’র অসাধারণ কয়েকটি কথা দিয়ে। ধ্রুব এষ বলেন, ‘হেলাল ভাইকে আমার আশ্চর্য বিষণœ সুন্দর এক পাথর মনে হয়। নদী ছিল, পাথর হয়ে গেছে। সেই পাথর। নদী তার ভেতরে বহমান। আত্রেয়ীর মতো অন্তঃসলিলা।’
২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর ছিয়াত্তর বছর বয়সে ঢাকায় প্রয়াত হন প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ।
সম্মাননা-পুরস্কার
যশোহর সাহিত্য-পরিষদ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার, নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ প্রদত্ত খালেদদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, বাসাসপ এর কাব্যরত্ন প্রভৃতি। কবি হেলাল হাফিজ ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন।
লেখক : স্বপন পাল, প্রাবন্ধিক ও উন্নয়নকর্মী।


























